গৌতম হালদারের সিনেমা-ভাল থেকো
সিনেমাটা বেশ পুরনো; প্রায় বছর দশ আগের। মাঝে মাঝে হয় না এরকম? - র্যানডমলি দেখতে বসে পুরনো একটা সিনেমা হঠাৎ খুব ভালো লেগে গেলো। "ভাল থেকো" আমার কাছে তেমন-ই ভালো লাগা একটা সিনেমা। একটা শুনশান বিকেলে অলস ছুটির দিনে ভাতঘুমের বদলে কানে হেডফোন গুঁজে বিছানায় শুয়ে শুয়ে "ভাল থেকো" দেখা হলো। সিনেমাটার মধ্যেও কোথাও যেন একটা স্নিগ্ধ আলসেমি লুকিয়ে আছে। কিছু মন কেমন করা অনুভূতি সারাক্ষণ তাড়িয়ে তাড়িয়ে বেড়ায়। গৌতম হালদারের আর কোন সিনেমা দেখি নি আগে। কিন্তু "ভাল থেকো"র এক্সপেরিয়েন্স থেকে মনে হয় তাঁর অন্য কাজগুলোও হয়তো খারাপ লাগবে না। "মুক্তি" নামে আরেকটি সিনেমা'র কথা শুনেছি বটে। কিন্তু যথেষ্ট আগ্রহ নিয়েও খুঁজে পাচ্ছি না কোথাও।
ভাল থেকো'র কাহিনী খুব সাদামাটা। লীনা গঙ্গোপাধ্যায়ের উপন্যাস অথবা গল্প - কিছু একটা অবলম্বনে নির্মিত। টিপিক্যাল মধ্যবিত্তের ইন্ট্যালেকচুয়াল টানাপোড়েন। পরিবারের একদা সবার খুব আদরের বড় মেয়ের পয়েন্ট অব ভিউ থেকে দেখা - তার স্যাক্রিফাইস, আপনি এসে পড়া দায়-দায়িত্ব, একা থাকা, অনেক বয়েস অব্দি বিয়ে না হওয়া, অতি ভালো মেয়ে হয়ে থাকার বঞ্চনা ইত্যাদি আবেগঘন অথচ বহুল বিদিত বিষয়। আমরা অনেকদিন আগে "মেঘে ঢাকা তারা"তে এগুলো সব দেখে ফেলেছি। ফিন্যানসিয়াল ক্রাইসিসটুকু বাদ দিলে "মেঘে ঢাকা তারা"র নীতা আর "ভাল থেকো"র - আনন্দী (বিদ্যা বালান) আসলে দুই যমজ বোন। এনারা শিক্ষিতা, বুদ্ধিমতী, দায়িত্ববতী, স্বাধীন নারী। কিন্তু জীবনের একটা পর্যায়ে এসে তারা বোধ করতে শুরু করেন যে তারা আসলে বড্ড ঠকে গেছেন - সমাজের কাছে, পরিবারের কাছে, দাদা'র মেধাবী বন্ধুর কাছে, পুরনো প্রেমিকের কাছে, এমনকী ছোট বোনের কাছেও। এখানে লক্ষ্য করার মত বিষয় হলো - তাদের ছোটবোন গুলো অধিকাংশ সময় একটু বেপরোয়া গোছের হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায় তারা কোন এক ধনীর দুলাল টো-টো কোম্পানি'র সাথে জুটে গিয়ে ঠিক-ই নিজের জীবন গুছিয়ে নিয়েছেন। এদিকে বড় বোনের কপালে জোটে লবডঙ্কা। মধ্যবিত্ত আদর্শের সাদা ফুল খোপায় গুঁজে তারা রাত জেগে জয় গোস্বামী পড়েন আর রবীন্দ্রনাথ গান। "ভালো থেকো"র আনন্দী অবশ্য পড়েছেন হুমায়ূন আজাদ। বাকি লেখা পড়তে পড়তে কবিতাটা শুনে ফেলতে পারেন। কথা দিচ্ছি ঠকবেন না।
কাহিনীতে আরো আছে একটা লোক খেদানো পাগল এবং একজন নকশাল কম্যুনিস্ট দাদা! ব্যস হয়ে গেলো! এরপর পশ্চিম-বাংলার একটা গল্প দাঁড় করাতে আর কী লাগে? এরপর তো গল্পের গরু এমনিতেই গাছে গাছে দৌড়ুবে।
কাহিনীর বাইরে সিনেমাতে আর যা যা আছে তার সবই অসাধারন। অধিকাংশ সময়ই পুরো স্ক্রিন জুড়ে থাকে প্রচুর সবুজ রঙ। গঙ্গার ধারে একটা পুরনো দোতলা বাড়ি। জানলার ফাঁক গলে যে বাড়িতে ঢুকে পড়ে নদীর বাতাস। অক্লেশে উড়িয়ে নিয়ে যায় জানলার পর্দা, বিছানার চাদর। শুকনো পাতারা তখন ঝাঁক বেঁধে উড়ে আসে।
কিছুক্ষণ পর পর দূরে কোথাও স্টিমারের শব্দ। কিছুক্ষণ পর পর বৃষ্টি; বাতাস। জানলার খিড়কি সশব্দে খুলে পড়ে। চাতালে অনেক গাছ পালা, ফুল। সবাই বৃষ্টিতে ভিজে একশা।
আবার এক পশলা বৃষ্টির পরে খুব স্নিগ্ধ চারপাশ। খালি পায়ে ছাদের পানিতে হেঁটে হেঁটে যাওয়া। অনেক দূরে নদী..., নৌকা...; দড়িতে মেলে দেয়া মা'র ভেজা শাড়ি- তাকে গায়ে জড়িয়ে ধরে হিমেল স্নেহের পরশ।
উড়ে আসা কৃষ্ণচূড়া ফুলে দোতলার বারান্দাটা ছেয়ে থাকে। বারান্দা থেকে নিচের বাগান দেখা যায়। তার মাঝখানে ছোট রাস্তা এঁকে বেঁকে চলে যায় বাড়ির সদর দরজার দিকে। খুব ভোরে পাখিদের কোলাহল আর জ্যাঠা মশাইয়ের (সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়) রেওয়াজের সুর। আহা!
এইসব কিছু'র নাটের গুরু যিনি, তাঁর নাম - অভীক মুখোপাধ্যায়। তিনি সিনেমাটোগ্রাফার। এই সিনেমার জন্য ন্যাশনাল এওয়ার্ড পেয়েছিলেন। বলে রাখা ভালো - "অন্তহীন"-এর সিনেমাটোগ্রাফারও উনিই ছিলেন। অন্তহীনের সেই সব শট নিশ্চয়ই সহজে ভুলে যাবার নয়। ভালো লেগেছে ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর - মেলানকলিক এবং প্রাসঙ্গিক।
সিনেমাতে বৃক্ষ, গুল্ম , লতা-পাতা, ফুল সর্বোপরি নিসর্গের উপস্থাপন চমৎকার। গাছ নিয়ে কিছু দার্শনিক আলাপ আছে। ঝিনুক (আনন্দী'র ছোটবোন) যখন ওর বর আর ছেলেকে নিয়ে বাপের বাড়ি বেড়াতে আসে তখন বুড়ি'দি (বুড়ি-আনন্দী'র ডাক নাম) এর জন্য নিউ মার্কেট থেকে একটা চারা গাছ নিয়ে আসে। পরে দেখা যায় গাছটা আসলে আর্টিফিসিয়াল - ঝিনুকের খুব এম্বিশাস জীবনের মত।
ঝিনুকের কবি বন্ধু দীপ (পরমব্রত) যে লুকিয়ে বুড়ি দি'কে নিয়ে কবিতা লিখে, ওর জন্মদিনে ফুল উপহার দেয় সেও গাছ ভালোবাসে, গাছের ছায়া ভালোবেসে, গাছের সঙ্গে কথা বলে।
বুড়ি'র জন্মদিনে সবাই হৈ-হুল্লোড় করে গাছের চারা রোপন করে। সাথে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা।
ছবির নির্বাক দৃশ্যগুলোতে বাতাসে গাছের পাতার শন-শন শব্দ শোনা যায়। সেই শব্দ, ডাল-পালার নড়া চড়া সব মিলিয়ে কেমন একটা জীবন্ত আবহ তৈরী করে। পরে উইকি ঘাঁটতে গিয়ে দেখলাম নদীর ধারে যে বাড়িতে শ্যুটিং হয়েছে সেটা আসলে আচার্য্য জগদীশ চন্দ্র বসু'র বাড়ি! বোঝো অবস্থা!!
-----------------------------
সিনেমাটা বেশ পুরনো; প্রায় বছর দশ আগের। মাঝে মাঝে হয় না এরকম? - র্যানডমলি দেখতে বসে পুরনো একটা সিনেমা হঠাৎ খুব ভালো লেগে গেলো। "ভাল থেকো" আমার কাছে তেমন-ই ভালো লাগা একটা সিনেমা। একটা শুনশান বিকেলে অলস ছুটির দিনে ভাতঘুমের বদলে কানে হেডফোন গুঁজে বিছানায় শুয়ে শুয়ে "ভাল থেকো" দেখা হলো। সিনেমাটার মধ্যেও কোথাও যেন একটা স্নিগ্ধ আলসেমি লুকিয়ে আছে। কিছু মন কেমন করা অনুভূতি সারাক্ষণ তাড়িয়ে তাড়িয়ে বেড়ায়। গৌতম হালদারের আর কোন সিনেমা দেখি নি আগে। কিন্তু "ভাল থেকো"র এক্সপেরিয়েন্স থেকে মনে হয় তাঁর অন্য কাজগুলোও হয়তো খারাপ লাগবে না। "মুক্তি" নামে আরেকটি সিনেমা'র কথা শুনেছি বটে। কিন্তু যথেষ্ট আগ্রহ নিয়েও খুঁজে পাচ্ছি না কোথাও।
ভাল থেকো'র কাহিনী খুব সাদামাটা। লীনা গঙ্গোপাধ্যায়ের উপন্যাস অথবা গল্প - কিছু একটা অবলম্বনে নির্মিত। টিপিক্যাল মধ্যবিত্তের ইন্ট্যালেকচুয়াল টানাপোড়েন। পরিবারের একদা সবার খুব আদরের বড় মেয়ের পয়েন্ট অব ভিউ থেকে দেখা - তার স্যাক্রিফাইস, আপনি এসে পড়া দায়-দায়িত্ব, একা থাকা, অনেক বয়েস অব্দি বিয়ে না হওয়া, অতি ভালো মেয়ে হয়ে থাকার বঞ্চনা ইত্যাদি আবেগঘন অথচ বহুল বিদিত বিষয়। আমরা অনেকদিন আগে "মেঘে ঢাকা তারা"তে এগুলো সব দেখে ফেলেছি। ফিন্যানসিয়াল ক্রাইসিসটুকু বাদ দিলে "মেঘে ঢাকা তারা"র নীতা আর "ভাল থেকো"র - আনন্দী (বিদ্যা বালান) আসলে দুই যমজ বোন। এনারা শিক্ষিতা, বুদ্ধিমতী, দায়িত্ববতী, স্বাধীন নারী। কিন্তু জীবনের একটা পর্যায়ে এসে তারা বোধ করতে শুরু করেন যে তারা আসলে বড্ড ঠকে গেছেন - সমাজের কাছে, পরিবারের কাছে, দাদা'র মেধাবী বন্ধুর কাছে, পুরনো প্রেমিকের কাছে, এমনকী ছোট বোনের কাছেও। এখানে লক্ষ্য করার মত বিষয় হলো - তাদের ছোটবোন গুলো অধিকাংশ সময় একটু বেপরোয়া গোছের হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায় তারা কোন এক ধনীর দুলাল টো-টো কোম্পানি'র সাথে জুটে গিয়ে ঠিক-ই নিজের জীবন গুছিয়ে নিয়েছেন। এদিকে বড় বোনের কপালে জোটে লবডঙ্কা। মধ্যবিত্ত আদর্শের সাদা ফুল খোপায় গুঁজে তারা রাত জেগে জয় গোস্বামী পড়েন আর রবীন্দ্রনাথ গান। "ভালো থেকো"র আনন্দী অবশ্য পড়েছেন হুমায়ূন আজাদ। বাকি লেখা পড়তে পড়তে কবিতাটা শুনে ফেলতে পারেন। কথা দিচ্ছি ঠকবেন না।
কাহিনীতে আরো আছে একটা লোক খেদানো পাগল এবং একজন নকশাল কম্যুনিস্ট দাদা! ব্যস হয়ে গেলো! এরপর পশ্চিম-বাংলার একটা গল্প দাঁড় করাতে আর কী লাগে? এরপর তো গল্পের গরু এমনিতেই গাছে গাছে দৌড়ুবে।
কাহিনীর বাইরে সিনেমাতে আর যা যা আছে তার সবই অসাধারন। অধিকাংশ সময়ই পুরো স্ক্রিন জুড়ে থাকে প্রচুর সবুজ রঙ। গঙ্গার ধারে একটা পুরনো দোতলা বাড়ি। জানলার ফাঁক গলে যে বাড়িতে ঢুকে পড়ে নদীর বাতাস। অক্লেশে উড়িয়ে নিয়ে যায় জানলার পর্দা, বিছানার চাদর। শুকনো পাতারা তখন ঝাঁক বেঁধে উড়ে আসে।
কিছুক্ষণ পর পর দূরে কোথাও স্টিমারের শব্দ। কিছুক্ষণ পর পর বৃষ্টি; বাতাস। জানলার খিড়কি সশব্দে খুলে পড়ে। চাতালে অনেক গাছ পালা, ফুল। সবাই বৃষ্টিতে ভিজে একশা।
আবার এক পশলা বৃষ্টির পরে খুব স্নিগ্ধ চারপাশ। খালি পায়ে ছাদের পানিতে হেঁটে হেঁটে যাওয়া। অনেক দূরে নদী..., নৌকা...; দড়িতে মেলে দেয়া মা'র ভেজা শাড়ি- তাকে গায়ে জড়িয়ে ধরে হিমেল স্নেহের পরশ।
উড়ে আসা কৃষ্ণচূড়া ফুলে দোতলার বারান্দাটা ছেয়ে থাকে। বারান্দা থেকে নিচের বাগান দেখা যায়। তার মাঝখানে ছোট রাস্তা এঁকে বেঁকে চলে যায় বাড়ির সদর দরজার দিকে। খুব ভোরে পাখিদের কোলাহল আর জ্যাঠা মশাইয়ের (সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়) রেওয়াজের সুর। আহা!
এইসব কিছু'র নাটের গুরু যিনি, তাঁর নাম - অভীক মুখোপাধ্যায়। তিনি সিনেমাটোগ্রাফার। এই সিনেমার জন্য ন্যাশনাল এওয়ার্ড পেয়েছিলেন। বলে রাখা ভালো - "অন্তহীন"-এর সিনেমাটোগ্রাফারও উনিই ছিলেন। অন্তহীনের সেই সব শট নিশ্চয়ই সহজে ভুলে যাবার নয়। ভালো লেগেছে ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর - মেলানকলিক এবং প্রাসঙ্গিক।
সিনেমাতে বৃক্ষ, গুল্ম , লতা-পাতা, ফুল সর্বোপরি নিসর্গের উপস্থাপন চমৎকার। গাছ নিয়ে কিছু দার্শনিক আলাপ আছে। ঝিনুক (আনন্দী'র ছোটবোন) যখন ওর বর আর ছেলেকে নিয়ে বাপের বাড়ি বেড়াতে আসে তখন বুড়ি'দি (বুড়ি-আনন্দী'র ডাক নাম) এর জন্য নিউ মার্কেট থেকে একটা চারা গাছ নিয়ে আসে। পরে দেখা যায় গাছটা আসলে আর্টিফিসিয়াল - ঝিনুকের খুব এম্বিশাস জীবনের মত।
ঝিনুকের কবি বন্ধু দীপ (পরমব্রত) যে লুকিয়ে বুড়ি দি'কে নিয়ে কবিতা লিখে, ওর জন্মদিনে ফুল উপহার দেয় সেও গাছ ভালোবাসে, গাছের ছায়া ভালোবেসে, গাছের সঙ্গে কথা বলে।
বুড়ি'র জন্মদিনে সবাই হৈ-হুল্লোড় করে গাছের চারা রোপন করে। সাথে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা।
ছবির নির্বাক দৃশ্যগুলোতে বাতাসে গাছের পাতার শন-শন শব্দ শোনা যায়। সেই শব্দ, ডাল-পালার নড়া চড়া সব মিলিয়ে কেমন একটা জীবন্ত আবহ তৈরী করে। পরে উইকি ঘাঁটতে গিয়ে দেখলাম নদীর ধারে যে বাড়িতে শ্যুটিং হয়েছে সেটা আসলে আচার্য্য জগদীশ চন্দ্র বসু'র বাড়ি! বোঝো অবস্থা!!
-----------------------------
