সেই ফুলের দল

আমার সবসময়ের প্রিয় একটা গান-জনি ও ঋত্বিকের গলায়


সেই ফুলের দল

ব্যান্ড -          মহীনের ঘোড়াগুলি 
এলবাম -      (ঝড়া সময়ের গান - ১৯৯৬)
কথা, সুর -   গৌতম চট্টোপাধ্যায়
মূল কন্ঠ  -   ঋতুপর্ণা দাশ এবং চন্দ্রিমা মিত্র


G
রাবেয়া কি রুখসানা,ঠিক তো মনে পড়েনা
G
অস্থির এ ভাবনা শুধু করে আনাগোনা 
Em                                            Am        
ফেলে আসা দিন তার মিছে মনে হয়
Am

নামে কিবা আসে যায়
D                                 C                            G
সোহাগে আদরে জানি রেখেছিল কেউ এই নাম।

আব্বা না আপা নাকি কারো মনে পড়ে তাকি
তোমরা তা জানো নাকি সময় দিয়েছে ফাঁকি।
অভিমানে সে মেয়েটি গেছে হারিয়ে
বুকে ভরসা নিয়ে
সীমান্ত পেরিয়ে সে এসেছিল ছেড়ে তার গ্রাম।

(কোরাস)
F                                C                                             G    
জানি সে কোথায়,এই শহরের কোনো বাগানে সে হয়ে আছে ফুল
F                                C                                             G    
প্রতি সন্ধ্যায় পাঁপড়ি মেলে দিয়ে সে আবার ভোরে ঝরা বকুল।


সেই মেয়েটির মত আরেকটি মেয়ে সে তো সন্ধ্যাপ্রদীপ দিতো
যত্নে গান শোনাতো
হালকা পায়ে বেড়াত বেনী দুলিয়ে
কে যে নিলো ভুলিয়ে?
খেলার সাথীরা তার খুঁজতে আসেনা আর রোজ।

লক্ষী নামের মেয়ে আজও তার পথ চেয়ে
ফেলে আসা তার গাঁয়ে, মা কাঁদে মুখ লুকিয়ে
সন্ধ্যেবেলায় শাঁখ বাজে নাতো আর
এতে আছে কি বলার?
আজো কেউ জানেনাতো কোথায় সে হয়েছে নিখোঁজ

জানি সে কোথায়, এই শহরের কোনো বাগানে সে হয়ে আছে ফুল
প্রতি সন্ধ্যায় পাঁপড়ি মেলে দিয়ে সে আবার ভোরে ঝরা বকুল

লক্ষী রুখসানারাআরও যত ঘরছাড়া
ত্রস্ত দিশেহারা তখনই জাদুকরেরা
নিমিষে বানিয়ে দেয় বাগানের ফুল
ঠিক নির্ভুল
এভাবে মেয়েরা সব একে একে ফুল হয়ে যায়

নতুন বাগানে এসে,নিজেকে না ভালোবেসে
ফুলের দলেরা শেষে কথা বলে হেসে হেসে
পদ্ম,গোলাপ,জুঁই,চম্পা, চামেলী
কুল (?), টগর, শেফালী
পোড়ার মুখিরা তোরা ফুল হয়ে রয়ে গেলি হায়

জানি সে কোথায়এই শহরের কোনো বাগানে সে হয়ে আছে ফুল
প্রতি সন্ধ্যায় পাঁপড়ি মেলে দিয়ে সে আবার ভোরে ঝরা বকুল।
------------------------------------------------------------------

দোতলার রেলিং এ চুপ করে বসে আছে সময়

বিকেল চারটে।
একটা ফোন এলো।

সকালেও এসেছিলো।

দোতলার রেলিং এ
চুপ করে বসে আছে সময়।
একা পড়ে আছে মনোভূম,

শত অবসাদের দেয়াল।

আজকাল প্রায় বিকেলগুলো
আমার এভাবেই কাটে।
যেন কিছু একটা'র অপেক্ষায় থেকে থেকে
অ-নে-ক বিটোফেন মন,
একটা নিঃশব্দ ট্রেনে চেপে এলে
তার দীর্ঘ, নরোম ছায়া দেখে দেখে
নির্জন সিঁড়িতে আর দোতলার রেলিং এ

যখন বিকেল চারটে......



তখন একটা ফোন এলো।


সকালেও এসেছিলো।
-------------------------








হাসপাতালে একদিন



হাসপাতালে একদিন

হাসপাতালে যে রোগীগুলো একটানা অনেকদিন ধরে এডমিটেড থাকেতাদের আত্মীয়দের চেহারায় বেশ একটা নির্লিপ্ত ভাব লক্ষ্য করা যায়। চারপাশে অসুস্থ মানুষের ভিড়রোগ-শোকদুঃখ-জরা কিছুতেই তাদের আর বিচলিত মনে হয় না। শুধু একুরিয়ামের ভিতর বিবর্ণ মাছগুলোর দিকে তাকিয়ে থেকেই তারা ঘন্টার পর ঘন্টা সময় পার করে দিতে পারে। আমি সকাল থেকে একটা চেক-আপ রিপোর্টের অপেক্ষায় এরকম এক ঝাঁক বোধহীন, নির্লিপ্ত মানুষের মাঝে বসে আছি। যারা সদলবলে ভুলে গেছে সেভলনের উৎকট গন্ধ, ডেস্কে টেলিফোনের অবিরাম আগমনী ধ্বনি। 

যাদের কেউ একবারের জন্যও ভেবে দেখছে না - দীর্ঘাঙ্গী রিসেপসনিস্টের ভ্রুতে বিরক্তির ধনুক আজ কতটা টান-টান? সবাই কেমন অঢেল স্বাচ্ছন্দে মেনে নিয়েছে পাঁচ মিনিট পিছিয়ে চলা দেয়াল ঘড়িটাকে। আশ্চর্য! যেন কারো কোন তাড়া নেই। কেউ হঠাৎ চমকে উঠে বলছে না - নিউজরিডার টিভিতে এ কোন জলপ্রপাতের খবর দিলেন? কোথায় সব যুদ্ধের অবসান হয়ে গিয়েছে বহুকাল? অনেকক্ষণ পরে চেক-আপ রিপোর্টটা হাতে এলে দেখি - রিসেপসনিস্ট মেয়েটির দুয়েকটা জীবানু ছাড়া আমার শরীরে আর বিশেষ কোন রোগ নেই!
--------------------------------- 


  

মহানগর গোধূলি

মহানগর গোধূলি



হিম কামরার নিয়ম অনুযায়ী
গোধূলি ট্রেনের যাত্রীরা বসে আছেন প্রতিবেশীর মত।
অথচ মাঝখানে শুয়ে আছে বিস্তীর্ণ ছায়াপথ,
মৌন এপ্রিল।
একজন উইন্ডো সিটের হরিণী 
ওপরে রাখা সুটকেস থেকে
বের করে আনছেন শাল, আধুনিকতা এবং অস্পৃহা।

কোথাও বিরহী চট্টগ্রাম 
সুদক্ষিণ সরে গেছে
কারুর জানা নাই।
---------------------------

অফিস কলিগ

অফিস কলিগ



আমার কলিগের ফেলে যাওয়া পেন্সিলে
একরাশ শোক জমে আছে।
তার অদ্ভূত খালি টেবিলটা জানিয়ে দিচ্ছে
না-থাকার সবগুলো সিনড্রোম,
আমাদের আলাপের পরিমিতি।

একটা বিরহী কফি'র মগ
আমার একটু বাড়তি সচেতনতা
সবই কি অনায়াসে ডুবে যাচ্ছে সে ভাবনায়!
যেন প্রাক্তন এক দুঃখবোধ
কেবলি উড়ে উড়ে
এই কাচ ঘেরা অফিস ঘরে
অব্যর্থ তীর হয়ে আসে।

আমি তবু প্রাণপনে ভেবে যাচ্ছি
অন্যান্য জরুরী বিষয়।
যতটা নিবিড়ভাবে ভাবলে পরে
নিদেনপক্ষে একটা পরিচিত পারফিউম
ভুলে থাকা যায়।

------------------



মিহিন ভাবনার ট্রেন


মিহিন ভাবনার ট্রেন আসে।
নিরালা কামরায় থেমে আছে সময়,
আমাদের বৃষ্টিপাতের গল্প।
একটা দুঃখী সেলফোন নাম্বারে
তোমাকে ভালো লাগার কথা ছিলো।
কথা ছিলো অফিস ছুটির পরে
রুমাল হাতে দাঁড়াবে 
ফ্লেক্সি-লোডের সামনে।
অপেক্ষার মোহর কুড়িয়ে 
বেজে উঠবে পিয়ানোর মত।
রেস্টুরেন্ট তোমার ভাল্লাগে না।
তাই, তৈরী হলো টং-এর দোকান-
‘ভালোবাসি। কানে যায় না?’
একে একে নভোচারী হলো
তোমার সবক’টা এসএমএস।
মিহিন ভাবনার ট্রেন আসে তবু।
ভূলোক দ্যুলোক গোলক পেরিয়ে
মনঘাতী হুইসেলে
একান্তই তোমার ধারনা নিয়ে।
-------------------------------------------------

ইনানি

তোমার সাথে পৃথিবীর দীর্ঘতম সৈকত ভ্রমণের সাধ জাগে
দূর-পাহাড়ি ঘুমের চোখ
জমা রাখে প্রবালের পলি,
সমন্বিত দ্বিধা'র বাগান।
সমুদ্র ফেরত ট্যুরিস্টের ব্যাগে 
তোমার চুলের ঘ্রাণ
প্রিয় কোন ভদকা'র মত লাগে।


জানি, টেকনাফ ছেড়ে চলে গেলে 

একদিন নিশ্চিত মনে পড়বে 
এই ঘন সেগুনের বন,
বহুদূর হেঁটে এসে তোমাকে 
তুমুল ছুঁতে চাওয়ার প্রবনতা।
আপাততঃ
রিসোর্টের এই নির্জনতম রুমে 
তোমার জন্য বরাদ্দ থাকুক 
আমার সবটুকু প্রিয়তার প্রস্তাব
ঠোঁটে ঠোঁট রেখে পৃথিবীর দীর্ঘতম চুমুর 
একটা অগ্রিম বুকিং।    

ঢাকা টু চট্টগ্রাম

ঢাকা টু চট্টগ্রাম


মুখ মনে পড়ে। 

বহুক্ষণ এইভাবে বসে থেকে থেকে

দূরপাল্লার বাসে। 


যেহেতু আর কিছু করার নেই 
তাই মহিলার শৌখিনতার দিকে তাকিয়ে রইলাম। 
জানলার কাচে চেয়ে দেখলাম নিদ্রিত দুঃখবিথী। 
দেখি দক্ষিণ দিক থেকে জেগে উঠছে মারমেইড,
তার ভেজা চুল থেকে চুঁইয়ে পড়ছে
নদীর ওপরের সেতু,
দুয়েকটি মেরু শামুক।
কোন নির্জন এককের প্রলয়।
-------------------------------------------------------------



ছোটবেলা

আমার ছোটবেলা


পাখির ঠোঁটে চেপে আমার ছোটবেলা নিরুদ্দেশে গেছে।
একটা জলফড়িং এর পিছনে ছুটতে ছুটতে

কেটে গেছে  ঘনদুপুর।
আমার ভয় পাওয়া অবাক চাহনিটা নিয়ে

সার্কাস পার্টির হাতিটাও চলে গিয়েছিলো।

শিববাড়ির মাঠে লাল নীল তাঁবু ফেলে
খুব কুয়াশায় ওদের রঙ মনে পড়ে।
মনে পড়ে আমার ছোটবেলায় একটা বিলম্বি গাছ ছিলো।
পাকঘরের লাগোয়া উঠোনের বাঁ দিকটাতে।
গায়ে তার কালো পিঁপড়ের ঢিবি।
টিয়ে পাতার রঙে যখন গুটিয়ে নামতো বিকেল
আমি আর বাবা একসাথে হেঁটে যেতাম সেই গ্রামে।
পথে দারুন ঘাসের ঘ্রাণ, বিশুদ্ধ ডাহুক ডাকা বাড়ি। 
রাত জাগা সেচ পাম্প 
যেন বিরামহীন শব্দ নিয়ে আসে তার।
তারপর বহুদূর চলে গেছে চাষাবাদের বিল। 
তারও ওপারে শহর, 
সে শহরে পাহাড়ের মত দূরের মানুষ থাকে। 
আমি থাকি। 
আমি ভুলে গেছি নৌকো। 
গহন বর্ষা উঠোনে কাঁঠালী চাপার ঘ্রাণ 
প্রথম খেলার সাথী আমার। 
------------------------------

Breaking News


পর্যাপ্ত পরিমানে দ্বিধা ও সংকোচ বহনের দায়ে
তোমার জন্য জমিয়ে রাখা বারোটি চুমু-কে
একে একে দেউলিয়া ঘোষনা করা হয়েছে।
ফ্রকে মুখ গুঁজে অভিমানী কিশোরীর মত
ওরা এখন বারান্দায় বসে ফুপিয়ে কাঁদছে।
গ্রিল বেয়ে ওঠা অপরাজিতার ফুলগুলো
এই শোকে আরো গাঢ় নীল হয়ে উঠছে।
ছুটির দিনটাকে মনে হচ্ছে মলিন, ফ্যাকাসে।
রবিঠাকুর ক্রমশঃ মিডিয়া প্লেয়ার ছেড়ে
বেরিয়ে আসতে চাইছেন। বার বার বলছেন -
‘মনো চায়, মনো চায়… হৃদয়ো জড়াতে কারো চির ঋণে’ 
সারা দিনভর বুঝিয়ে শুনিয়েও
থামানো যাচ্ছে না এই সংঘবদ্ধ অনুতাপন।
তাই কাল পরশুর মধ্যে জরুরী ভিত্তিতে
তোমাকে বকেয়া চুমুগুলো বুঝে নিতে বলা হচ্ছে।

A Story of tedious sameness : একটা শর্ট ফিল্ম-এর শুরু এভাবেও হতে পারে

গল্পটা মূলতঃ “দাম্পত্য-মনোটনি” নিয়ে এবং বলাবাহুল্য যে,এই গল্পের পেছনে একটা কবিতা মজুদ আছে।
গালগল্পের চরিত্রেরাঃ
১।রেনুঃ
একজন গৃহিনী,বয়স আনুমানিক ৩৫ বছর।সে গত ১০ বছর যাবৎ একজনের স্ত্রী এবং নিঃসন্তান।
২।মোঃ মাঈনুল ইসলামঃ
রেনুর স্বামী,একজন কর্পোরেট চাকুরে।তার ৮-৫টা’র ছকে কাটা জীবন।তাদের মধ্যবিত্তের সংসার।
গল্পের গরু কবে,কোন গাছে?
গাছ নং ১
একটা ভোরে আমাদের গল্পের শুরু।মাঈনুলের প্রাত্যহিক নিয়মে ঘুম ভাঙে,টেবিল ঘড়িতে সময় দেখে,পাশ ফিরে শোয়। সাদা বিছানার চাদর এবং বালিশ,খানিকটা এলোমেলো,যেখানে একটু আগেও কেউ শুয়েছিলো।বালিশে দুটো দীর্ঘ চুল পড়ে আছে। আঙুলে পেঁচিয়ে সে একটা চুল হাতে নেয়।দু’হাতে টেনে চুলে ফোকাস করতে গিয়ে সে একটা অদ্ভুত জিনিস আবিষ্কার করে।রেনু সম্পর্কিত সমস্ত তৈজস ও আসবাব সে সাদা কালো দেখছে!এসময় লাগোয়া বারান্দা বেয়ে বেডরুমে সকালের রোদ আসে।সে রোদ দেখে।জানলার পর্দার ওড়াওড়ি এবং সেই সাথে বাতাসের যাওয়া আসা ও তার শব্দ।বারান্দায় মেলে দেয়া রেনুর শাড়ি।অলস শুয়ে থেকে সে রুমের আসবাব দেখে।ড্রেসিং টেবিল,দেয়ালের পোট্রেট,বক্স খাটে লাগোয়া হাসিমুখ দম্পতির ছবি,ওয়ার্ডড্রব ইত্যাদি ইত্যাদি।সব মিলিয়ে খুব কালারফুল একটা বেডরুম।কিন্তু রেনু বিষয়ক সবকিছু দৃষ্টিকটূভাবে সাদাকালো।এসময় পাশের কিচেন থেকে রেনুর উপস্হিতি টের পাওয়া যায়।জল পড়ার শব্দ,ডিম ফ্রাই করার শব্দ,গুনগুনিয়ে গাওয়া কোন রবীন্দ্র সংগীতের কলি।মাঈনুল অফিসের জন্য রেডি হয়।আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে টাই বাঁধে। পিছনে রেনু বলে যায়, “শুনছো, তোমার নাস্তা রেডি”।মাঈনুল ডাইনিং টেবিলে বসে। রেনু নাস্তা দিয়ে যায়।টেবিলে আজকের পত্রিকা রাখে।দুইজন মুখোমুখি বসে। রেনু হাতে কফির মগ,চোখ পত্রিকায়। মাঈনুলের সামনে সকালের নাস্তা,যার মধ্যে চোখে পড়ার মত একটা সুন্দর প্লেটে সাজানো অমলেট।সে প্রতিদিন এটার দিকে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে।পত্রিকার পাতায় চোখ দেয়।রেনু দু’একটা খবরের শিরোনাম পড়ে নাগরিক উদ্বেগ প্রকাশ করে, যেটা স্পষ্টতই একটা প্রাত্যহিক নীরবতা দূরীকরন প্রক্রিয়া বলে বোধ হয়।টেলিকমের একটা হাফ পাতা এড্যে মাঈনুলের চোখ যায়।এড্যের সুহাসিনীর সাথে সামনে বসা রমনীর একটা তুলনামূলক মানচিত্র তাকে ভাবিয়ে তুলে।
গাছ নং ২
মাঈনুল বসে আছে তার অফিস রুমে।সামনের মনিটরের ব্রাউজারে ফেসবুক ওপেন করা।তার ভার্সিটি ফ্রেন্ডের (মেয়ে)এলবাম দেখছে এবং তার সাথে চ্যাট করছে।এমন সময় রেনুর নাম্বার থেকে একটা এসএমএস আসে সেল ফোনে-
“Ma khub osustho, ami ronju k nie bikeler train e ctg. Jacchi”
কিছুক্ষণ নাম্বারটার দিকে তাকিয়ে থেকে ফোন করতে গিয়েও কি ভেবে সে আর ফোন করে না।বরং ফেসবুক চ্যাটে মনোনিবেশ করে।
গাছ নং ৩
এরপরের দিন ভোর।যেন ঠিক একইরকম।মাঈনুল টেবিল ঘড়িতে সময় দেখে।পাশ ফিরে শোয়।সাদা ধবধবে বালিশ।সেখানে আজকে চুলের অনুপস্হিতি তাকে যেন একটু বিষণ্ন করে তোলে।আগেকার মত ভোরের রোদ,জানলায় পর্দার ওড়াওড়ি।বাতাসের শব্দ। কিন্তু রেনুর কোন একটা স্পেসিফিক আসবাব যেটা কিনা আগে সে ফ্যাকাসে সাদা কালো দেখতো, সেটা তার এখন রঙীন মনে হতে থাকে।এমনকী বারান্দায় রোজগের মত শুকোতে দেয়া শাড়ির অনুপস্হিতিও তার চোখ এড়ায় না।এমনকী কিচেনের নীরবতাও।মাঈনুল অফিসের জন্যে রেডি হয়ে ডাইনিং টেবিলে বসে।উঠে গিয়ে হকারের রেখে যাওয়া পত্রিকা নিয়ে আসে।পেপারে ইতস্ততঃ চোখ বুলায় আর সামনের খালি চেয়ারের দিকে অপলক তাকিয়ে থাকে।তার সামনে টেবিলের বিশেষ জায়গাটার দিকে তাকায়, যেখানে প্রতিদিনকার অমলেটটা থাকার কথা।তো এইসব কিছুই যখন তাকে রেনু বিষয়ে বেশ কাতর করে তোলে,তখন সেল ফোনে রেনুর কল আসে।রেনু তার প্রাতঃরাশের খবর নেয় এবং মাঈনুল খুব আগ্রহের সাথে কথা বলে, তার শ্বাশুড়ির খবর নেয়। রেনু কবে ফিরবে জানতে চায়।রেনু জানায় মা’র অবস্হা খারাপের দিকে।কবে ফিরবে এই মুহুর্তে ঠিক বলা যাচ্ছে না।এসময় মাঈনুল আরো কিছু বলতে চাইলেও লাইন কেটে যায় এবং পরে কয়েকবার ট্রাই করেও লাইন পায় না।তখন সামনে রাখা পেপারে টেলিকমের একটা হাফ পাতা এড্যে সুহাসিনীর দিকে চোখ যায় এবং সে বিরক্তি প্রকাশ করে।
গাছ নং ৪
এরপর আমরা আরো কয়েকটি ভোর দেখবো।যেখানে রেনু সম্পর্কিত
বিষয়গুলো আরো প্রকট রঙীন হয়ে উঠবে।কোন একদিন ভোরে সে রেনুর গুনগুনিয়ে গাওয়া রবীন্দ্র সংগীতটা খুঁজে বের করবে এবং সিডি প্লেয়ারে চালাবে।ওয়ার্ডড্রব ঘেঁটে একটা হলুদ কিংবা লাল শাড়ি বের করে ওটা বারান্দায় মেলে দিবে।সকালের রোদ সেই শাড়ির রঙ মেখে সমস্ত বেডরুমে আক্রান্ত হবে।বাসায় নাস্তা তৈরী না থাকলেও,ডাইনিং টেবিলে নাস্তা করতে বসবে এবং উঠে গিয়ে সামনের চেয়ারটা টেনে দিবে। সে নিজেই রেনুর মত করে শিরোনামগুলো পড়বে এবং মেকি উদ্বেগ প্রকাশ করবে।
                                        কিছুদিন পর………
গাছ নং ৫

রেনু ফিরে আসবে।ডাইনিং রুম থেকে লং শটে দেখা যাবে বেডরুমে রেনু এবং মাঈনুল খুব গল্প গুজবে মত্ত।রেনু তার বাড়ির কথা বলছে, মাঈনুল তার অফিসের গল্প করছে।এক সময় রেনু উঠে এসে ফ্রিজ থেকে বরফ নিতে আসবে।তখন বেডরুম থেকে মাঈনুলের গলায় বেসুরো রবীন্দ্রসংগীত শোনা যাবে। তাদেরকে খানিকটা ড্রাঙ্ক মনে হতে পারে।ফিরে যাওয়ার সময় রেনু বেডরুমের দরজা ভেজিয়ে দিবে।
                                    আরো কিছুদিন পর………
গাছ নং ৬
আমরা আবার ঠিক প্রথম ভোরে ফিরে যাবো।মাঈনুলের ঘুম ভাঙা, টেবিল ঘড়িতে সময় দেখা,রোদ ও বাতাসের যাতায়াত,পাশ ফিরে রেনুর বালিশে চুল খোঁজা কিংবা রেনুর গুনগুন গান গাওয়া ইত্যাদি।এক পর্যায়ে মাঈনুল ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে টাই বাঁধবে। এমন সময় আয়নায় রেনুর প্রতিফলন দেখা যাবে -“শুনছো, তোমার নাস্তা রেডি”। আর মাঈনুল হঠাৎ চমকে গিয়ে লক্ষ্য করবে – আয়নায় যাকে দেখা যাচ্ছে তার সর্বস্ব সাদা কালো!