গল্পটা মূলতঃ “দাম্পত্য-মনোটনি” নিয়ে এবং বলাবাহুল্য যে,এই গল্পের পেছনে একটা কবিতা মজুদ আছে।
গালগল্পের চরিত্রেরাঃ
১।রেনুঃ
একজন গৃহিনী,বয়স আনুমানিক ৩৫ বছর।সে গত ১০ বছর যাবৎ একজনের স্ত্রী এবং নিঃসন্তান।
২।মোঃ মাঈনুল ইসলামঃ
রেনুর স্বামী,একজন কর্পোরেট চাকুরে।তার ৮-৫টা’র ছকে কাটা জীবন।তাদের মধ্যবিত্তের সংসার।
গল্পের গরু কবে,কোন গাছে?
গাছ নং ১
একটা ভোরে আমাদের গল্পের শুরু।মাঈনুলের প্রাত্যহিক নিয়মে ঘুম ভাঙে,টেবিল ঘড়িতে সময় দেখে,পাশ ফিরে শোয়। সাদা বিছানার চাদর এবং বালিশ,খানিকটা এলোমেলো,যেখানে একটু আগেও কেউ শুয়েছিলো।বালিশে দুটো দীর্ঘ চুল পড়ে আছে। আঙুলে পেঁচিয়ে সে একটা চুল হাতে নেয়।দু’হাতে টেনে চুলে ফোকাস করতে গিয়ে সে একটা অদ্ভুত জিনিস আবিষ্কার করে।রেনু সম্পর্কিত সমস্ত তৈজস ও আসবাব সে সাদা কালো দেখছে!এসময় লাগোয়া বারান্দা বেয়ে বেডরুমে সকালের রোদ আসে।সে রোদ দেখে।জানলার পর্দার ওড়াওড়ি এবং সেই সাথে বাতাসের যাওয়া আসা ও তার শব্দ।বারান্দায় মেলে দেয়া রেনুর শাড়ি।অলস শুয়ে থেকে সে রুমের আসবাব দেখে।ড্রেসিং টেবিল,দেয়ালের পোট্রেট,বক্স খাটে লাগোয়া হাসিমুখ দম্পতির ছবি,ওয়ার্ডড্রব ইত্যাদি ইত্যাদি।সব মিলিয়ে খুব কালারফুল একটা বেডরুম।কিন্তু রেনু বিষয়ক সবকিছু দৃষ্টিকটূভাবে সাদাকালো।এসময় পাশের কিচেন থেকে রেনুর উপস্হিতি টের পাওয়া যায়।জল পড়ার শব্দ,ডিম ফ্রাই করার শব্দ,গুনগুনিয়ে গাওয়া কোন রবীন্দ্র সংগীতের কলি।মাঈনুল অফিসের জন্য রেডি হয়।আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে টাই বাঁধে। পিছনে রেনু বলে যায়, “শুনছো, তোমার নাস্তা রেডি”।মাঈনুল ডাইনিং টেবিলে বসে। রেনু নাস্তা দিয়ে যায়।টেবিলে আজকের পত্রিকা রাখে।দুইজন মুখোমুখি বসে। রেনু হাতে কফির মগ,চোখ পত্রিকায়। মাঈনুলের সামনে সকালের নাস্তা,যার মধ্যে চোখে পড়ার মত একটা সুন্দর প্লেটে সাজানো অমলেট।সে প্রতিদিন এটার দিকে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে।পত্রিকার পাতায় চোখ দেয়।রেনু দু’একটা খবরের শিরোনাম পড়ে নাগরিক উদ্বেগ প্রকাশ করে, যেটা স্পষ্টতই একটা প্রাত্যহিক নীরবতা দূরীকরন প্রক্রিয়া বলে বোধ হয়।টেলিকমের একটা হাফ পাতা এড্যে মাঈনুলের চোখ যায়।এড্যের সুহাসিনীর সাথে সামনে বসা রমনীর একটা তুলনামূলক মানচিত্র তাকে ভাবিয়ে তুলে।
গাছ নং ২
মাঈনুল বসে আছে তার অফিস রুমে।সামনের মনিটরের ব্রাউজারে ফেসবুক ওপেন করা।তার ভার্সিটি ফ্রেন্ডের (মেয়ে)এলবাম দেখছে এবং তার সাথে চ্যাট করছে।এমন সময় রেনুর নাম্বার থেকে একটা এসএমএস আসে সেল ফোনে-
“Ma khub osustho, ami ronju k nie bikeler train e ctg. Jacchi”
কিছুক্ষণ নাম্বারটার দিকে তাকিয়ে থেকে ফোন করতে গিয়েও কি ভেবে সে আর ফোন করে না।বরং ফেসবুক চ্যাটে মনোনিবেশ করে।
গাছ নং ৩
এরপরের দিন ভোর।যেন ঠিক একইরকম।মাঈনুল টেবিল ঘড়িতে সময় দেখে।পাশ ফিরে শোয়।সাদা ধবধবে বালিশ।সেখানে আজকে চুলের অনুপস্হিতি তাকে যেন একটু বিষণ্ন করে তোলে।আগেকার মত ভোরের রোদ,জানলায় পর্দার ওড়াওড়ি।বাতাসের শব্দ। কিন্তু রেনুর কোন একটা স্পেসিফিক আসবাব যেটা কিনা আগে সে ফ্যাকাসে সাদা কালো দেখতো, সেটা তার এখন রঙীন মনে হতে থাকে।এমনকী বারান্দায় রোজগের মত শুকোতে দেয়া শাড়ির অনুপস্হিতিও তার চোখ এড়ায় না।এমনকী কিচেনের নীরবতাও।মাঈনুল অফিসের জন্যে রেডি হয়ে ডাইনিং টেবিলে বসে।উঠে গিয়ে হকারের রেখে যাওয়া পত্রিকা নিয়ে আসে।পেপারে ইতস্ততঃ চোখ বুলায় আর সামনের খালি চেয়ারের দিকে অপলক তাকিয়ে থাকে।তার সামনে টেবিলের বিশেষ জায়গাটার দিকে তাকায়, যেখানে প্রতিদিনকার অমলেটটা থাকার কথা।তো এইসব কিছুই যখন তাকে রেনু বিষয়ে বেশ কাতর করে তোলে,তখন সেল ফোনে রেনুর কল আসে।রেনু তার প্রাতঃরাশের খবর নেয় এবং মাঈনুল খুব আগ্রহের সাথে কথা বলে, তার শ্বাশুড়ির খবর নেয়। রেনু কবে ফিরবে জানতে চায়।রেনু জানায় মা’র অবস্হা খারাপের দিকে।কবে ফিরবে এই মুহুর্তে ঠিক বলা যাচ্ছে না।এসময় মাঈনুল আরো কিছু বলতে চাইলেও লাইন কেটে যায় এবং পরে কয়েকবার ট্রাই করেও লাইন পায় না।তখন সামনে রাখা পেপারে টেলিকমের একটা হাফ পাতা এড্যে সুহাসিনীর দিকে চোখ যায় এবং সে বিরক্তি প্রকাশ করে।
গাছ নং ৪
এরপর আমরা আরো কয়েকটি ভোর দেখবো।যেখানে রেনু সম্পর্কিত
বিষয়গুলো আরো প্রকট রঙীন হয়ে উঠবে।কোন একদিন ভোরে সে রেনুর গুনগুনিয়ে গাওয়া রবীন্দ্র সংগীতটা খুঁজে বের করবে এবং সিডি প্লেয়ারে চালাবে।ওয়ার্ডড্রব ঘেঁটে একটা হলুদ কিংবা লাল শাড়ি বের করে ওটা বারান্দায় মেলে দিবে।সকালের রোদ সেই শাড়ির রঙ মেখে সমস্ত বেডরুমে আক্রান্ত হবে।বাসায় নাস্তা তৈরী না থাকলেও,ডাইনিং টেবিলে নাস্তা করতে বসবে এবং উঠে গিয়ে সামনের চেয়ারটা টেনে দিবে। সে নিজেই রেনুর মত করে শিরোনামগুলো পড়বে এবং মেকি উদ্বেগ প্রকাশ করবে।
কিছুদিন পর………
গাছ নং ৫
রেনু ফিরে আসবে।ডাইনিং রুম থেকে লং শটে দেখা যাবে বেডরুমে রেনু এবং মাঈনুল খুব গল্প গুজবে মত্ত।রেনু তার বাড়ির কথা বলছে, মাঈনুল তার অফিসের গল্প করছে।এক সময় রেনু উঠে এসে ফ্রিজ থেকে বরফ নিতে আসবে।তখন বেডরুম থেকে মাঈনুলের গলায় বেসুরো রবীন্দ্রসংগীত শোনা যাবে। তাদেরকে খানিকটা ড্রাঙ্ক মনে হতে পারে।ফিরে যাওয়ার সময় রেনু বেডরুমের দরজা ভেজিয়ে দিবে।
আরো কিছুদিন পর………
গাছ নং ৬
আমরা আবার ঠিক প্রথম ভোরে ফিরে যাবো।মাঈনুলের ঘুম ভাঙা, টেবিল ঘড়িতে সময় দেখা,রোদ ও বাতাসের যাতায়াত,পাশ ফিরে রেনুর বালিশে চুল খোঁজা কিংবা রেনুর গুনগুন গান গাওয়া ইত্যাদি।এক পর্যায়ে মাঈনুল ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে টাই বাঁধবে। এমন সময় আয়নায় রেনুর প্রতিফলন দেখা যাবে -“শুনছো, তোমার নাস্তা রেডি”। আর মাঈনুল হঠাৎ চমকে গিয়ে লক্ষ্য করবে – আয়নায় যাকে দেখা যাচ্ছে তার সর্বস্ব সাদা কালো!