(১)
কিছুদিন ধরেই মাথার মধ্যে একটা চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছিল। চিন্তাটা টুকে রাখার জন্যেই এই লেখা। চিন্তার সূত্রপাত আসলে একটা র্যানডম প্রশ্ন থেকে- সত্তর/ আশি দশকের বাংলা ব্যান্ডের গান এত বিষণ্ণ কেন? আরেকটু স্পেসিফিক্যলি বলতে গেলে- পশ্চিমবঙ্গের বাংলা ব্যান্ডের শুরুটা এত বিষণ্ণ গান দিয়ে কেন? অরুনেন্দু দাস, মহীনের ঘোড়াগুলি, নগর ফিলোমেল ইত্যাদি যাদের শোনা আছে তারা আশাকরি আমার সাথে একমত হবেন যে এদের মন-ভাল করা কোন গান নেই। বিষয় বৈচিত্র্যে ভরপুর হলেও অধিকাংশ গান শেষ পর্যন্ত মেলাঙ্কলিক। অথচ পশ্চিমের প্রচলিত ধারনা অনুযায়ী ব্যান্ডের গান হওয়া উচিত ছিল তারুণ্যের উচ্ছ্বাসপূর্ণ, উশৃঙ্খল এবং উদ্দাম। তাহলে সত্তর দশকের তরুণদের বেলায় এমন হল কেন? ওদের সমস্যাটা কী? ওরা এত দুঃখী কেন?
এক্ষেত্রে বলে রাখা ভাল- বাংলাদেশের ব্যান্ড গানের শুরুটা কিন্তু এরকম ছিল না। রীতিমত নাচ গানে ভরপুর আর ধুম ধারাক্কা। ইউটিউবে জিঙ্গা শিল্প গোষ্ঠীর বেশ কিছু গানে তার প্রমাণ মেলে। তাছাড়া অন্যান্য যে কয়টা ব্যান্ড ছিল- চিত্র নায়ক জাফর ইকবালের র্যাম্বলিং স্টোনস, আইওলাইটস, উইন্ডিসাইট অব কেয়ার, লাইটনিংস – এদের সবার বিচরণ ছিল মূলত হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল আর ঢাকা ক্লাব কেন্দ্রিক। এই উচ্চকিত জৌলুসের মাঝে খুব একটা দুঃখ বিলাসের অবকাশ ছিল না বোধ করি।
উইকিপিডিয়া বলছে মহীনের ঘোড়াগুলি ভারতের প্রথম রক ব্যান্ড! পঁচাত্তরের দিকে মেবি ওরা প্রথম স্টেজ শো করে এবং প্রচুর পচানি খায়। পত্র পত্রিকায় তীব্র সমালোচনা ছাপা হয় এবং মজা করে নাম দেয়া হয় পেলভিস প্রেসলি! আর হবেই বা না কেন? বাঙালি তখন সলিল, শ্যামল, হেমন্ত আর সন্ধ্যায় মজে আছে। তার উপর রবীন্দ্রনাথের প্রেতাত্মা তো আছেই। কিন্তু মানুষের কটুকথা শুনে মন খারাপ করে কষ্টের গান করেছে এটা মেনে নেয়া বোধহয় ঠিক হবে না। উল্টো যত গালিগালাজ ভরা চিঠি আর পেপার কাটিং ছিল, সব একসাথে করে ওরা পরের এলবামের কাভারে ছাপিয়ে দিয়েছিল। শুরুর দিকে নাকি ব্যান্ডের কোন নাম খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। অনুষ্ঠানের আয়োজকদের বিভিন্ন সময় বিভিন্ন নাম বলা হত। পালের গোদার নাম করে একবার বলা হল – আমাদের ব্যান্ডের নাম ‘গৌতম চট্টোপাধ্যায় বিএসসি ও সম্প্রদায়’! তার মানে এরাতো রসিকতা বোঝে। চিরদুঃখী ক্রাই-বেবি নয় মোটেই। তাহলে সমস্যাটা কোথায়?
পরবর্তী দশকগুলোতে মহীনের ঘোড়াগুলি যতটা না একটা ব্যান্ড তার চেয়ে অনেক বেশি একটা প্ল্যাটফর্ম যেখানে অনেকে এসে কন্ট্রিবিউট করেছে। কিন্তু নিজেদের সিগনেচার টোনটা কখনো আর বদলায়নি। বেছে বেছে সব মেলাঙ্কলিক ধাঁচের গান করেছে। যেন একটা আলাদা জনরা। যার ফলে এরকম অনেক গান আছে যার কয়েক লাইন শুনেই বলে দেয়া যায় এটা মহীনের গান। শুধু ‘ক্রিকেট’ নামে একটা গান আছে ১৯৯৯ সালের এলবামে যেটা একটু খাপছাড়া। শুনলে মনে হয় বাপ্পী লাহিড়ী’র কথা এবং সুর! এছাড়া মহীনের বাকি সব গান আমার অসম্ভব প্রিয়।
হয়তো শুধু মেলাঙ্কলিক সুরই নয়, গানের কথা ও বিষয়ের দিক থেকেও সত্তর দশকের এই যুবক দল অনন্য। এমন সব টপিক নিয়ে গান যা বাঙালি বাপের জন্মে শোনেনি। প্রেম-ভালবাসার গান যেন এদের আসতেই চায় না। ধরুন গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার যখন লিখছেন – “এই রাত তোমার আমার, ওই চাঁদ তোমার আমার, শুধু দুজনের…” কিংবা “এই পথ যদি না শেষ হয়, তবে কেমন হতো তুমি বলোতো?” টোট্যালি মেইক সেন্স- প্রেমিকার উদ্দেশ্যে স্পষ্ট প্রেম নিবেদন। বাক্যের অর্থ পরিষ্কার। ভুল হবার কোন চান্স নেই। প্রেমিকাও খুশি, শ্রোতারাও খুশি। আর সেই শ্রোতাকে যখন মহীন প্রেমিকার উদ্দেশ্যে লেখা এই গান শোনাতে এলো, তখন কী অবস্থা হয়েছিল তা সহজেই অনুমেয়-
কি জানি কী লিখব খাতায়?” [click on lyrics to listen]
বোঝেন অবস্থা? মানে পরীক্ষার আগের রাতে ভয়ের চোটে প্রেমিকাকে ডাকছে। এ যেন ছিঁচ কাঁদুনে, সেলফ- অবসেসড, ভীতু প্রেমিক। যথারীতি, বাঙালি এটা ভালভাবে নেয়নি। অথবা, বাপ্পী লাহিড়ী যখন ব্যালেরিনাদের নিয়ে আহ্লাদী গান বানাচ্ছেন জওয়ানি জানেমান, তখন মহীন এই মেয়েদের নিয়ে গান বানালো-
পুরাই পার্টি পুপার! সবকিছুর মধ্যেই যেন একটা শোক প্রস্তাব ঢুকিয়ে দেয়া। অলস, অকর্মণ্য জাতি হিসেবে আমাদের সুনাম আছে। Procrastination যেন আমদের রক্তে। কিন্তু এটা স্বীকার করতে আবার বড্ড আপত্তি। বীরের জাতি বলে কথা। মহীন যেন Procrastination কেই সেলিব্রেট করল গানে গানে-
তারপর রাজনীতি, কবিতা, সুরিএলিজম- এসব তো আছেই। এমনকি ক্যাফে, চেয়ার-টেবিল, চায়ের দোকান পর্যন্ত। যার রেশ ধরে নগর ফিলোমেলের এই গান –
(২)
যে কোন সৃষ্টিশীল কাজের পেছনে অনুপ্রেরনার প্রয়োজন হয়। সেটা দেশপ্রেম হতে পারে, নর-নারীর প্রেম হতে পারে, ব্যক্তিগত বিরহ ব্যাথা হতে পারে। ক’দিন আগে মহাভারত নিয়ে একটা বিশ্লেষণ পড়ছিলাম। পড়তে পড়তে মনে হচ্ছিল – মহাভারতের ৭০% কাহিনীই কল্পনা প্রসূত। এবং এই সুবিশাল মহাকাব্য সৃষ্টির পেছনে আসলে ইন্ধন জুগিয়েছে আর্য নিপীড়নের বিরুদ্ধে অনার্য মানুষের প্রবল প্রতিশোধ স্পৃহা। শক্তিমত্তা এবং সামর্থ্যে আর্যদের সমকক্ষ হতে না পেরে, নিপীড়িত আদিবাসী কল্পনার আশ্রয় নিয়েছিল। কালো মানুষের জয় হল তাদের কাব্যে। সত্যবতী রানী হল; তার বংশধরেরা ছলে বলে কৌশলে সিংহাসন দখল করল।
সত্তর দশকের তরুণদের এই মনখারাপ রোগের পেছনেও একটা হাইপোথিসিস দাঁড় করানো যায়। আমার ধারণা এর পেছনে মূল অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে বিপ্লবের স্বপ্ন ভঙ্গের বেদনা। নকশাল বাড়িকে ঘিরে যে বিপ্লবের সূচনা হয়েছিল ষাটের দশকে, তার প্রভাব বাংলা সাহিত্যে স্পষ্ট। যদিও এই বিপ্লব করে আখেরে কারো লাভ হয়নি- কয়েকজন সাহিত্যিক ছাড়া। সমরেশ মজুমদারের কালবেলা তো দেড় লাখ কপি বিক্রি হয়েছিল। তারপর সুনীল, শীর্ষেন্দু – এরা তো আছেনই। মজার ব্যাপার হল এরা কেউই বিপ্লবে অংশ নেন নি। শুধু দূর থেকে বিপ্লব দেখেছেন আর গল্প ফেঁদেছেন। হাজার চুরাশির মা অবশ্য এই বিবেচনার বাইরে থাকবে। যেহেতু মহাশ্বেতা দেবী নিজে জড়িত ছিলেন।
নকশাল আন্দোলনের একটা বেসিক গড়ন চোখে পড়ে। সেটা হল বিপ্লবে অংশ নেয়া তরুণরা সবাই ছিলেন মেধাবী ছাত্র-ছাত্রী। আন্দোলনের মূল ঘাঁটি ছিল তাই প্রেসিডেন্সি কলেজ, যাদবপুর ইউনিভার্সিটি, শিবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের মত সামনের সারির শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো। সাধারন গোছের ছেলেমেয়েদের খুব একটা এই পথ মাড়াতে দেখা যায়নি। কলকাতা লিটফেস্টের একটা সেশনে শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় তাই এই আন্দোলনকে বলছেন- কিছু মেধাবী তরুণের ‘রোমান্টিক’ বিপ্লব। বিপ্লবের স্বপ্ন-ভঙ্গের পরে যারা বেঁচেছিলেন তারা অধিকাংশই জার্মানি আর ফ্রান্স পালিয়ে যান। অনেকেই অভিমানে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন।
মহীনের ঘোড়াগুলির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা মনি দা (গৌতম চট্টোপাধ্যায়) প্রেসিডেন্সিতে পড়তেন। বুলা (প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়) পড়তেন শিবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং-এ। রঞ্জন ঘোষাল ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তেন যাদবপুরে। অরুনেন্দু দাস- যদিও তিনি এদের চেয়ে অনেক সিনিয়র- আর্কিটেকচারে পড়তেন শিবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং-এ। বাকিদের সম্পর্কে তথ্য খুঁজে পাই নি। কিন্তু এ ব্যাপারে আমার কোন সন্দেহ নেই যে এরা সবাই কমেবেশি বিপ্লবে অংশ নিয়েছিলেন। মনি দা গ্রেপ্তার ও নির্যাতিত হন। এরপর তাকে রক্তাক্ত অবস্থায় পুলিশ লক-আপে পাওয়া যায়। যদিও এতো নির্যাতনের পরও তিনি কোন প্রকার তথ্য প্রকাশ করেননি।
চারু মজুমদার মারা যান বাহাত্তরে। এর আগেই অবশ্য আন্দোলন চুকে বুকে যায়। সত্তরে দলের ভিতর মত বিরোধ, অতঃপর ভাঙন। তখন মনি দা’র মত বিপ্লবীরা যারা জীবন বাজি রেখে এই স্বপ্নে নাম লিখিয়েছিলেন তারা একটা অস্তিত্ব সঙ্কটে পড়ে যান। এই দিকভ্রান্তি, চাপা অভিমান, বিপ্লবে পরাজয়ের বেদনা তাদের আজীবন তাড়িয়ে বেড়িয়েছে। যার প্রভাব পড়েছে তাদের গানে-
যার যেখানে পৌঁছানোর কথা ছিল, সে সেখানে পৌঁছুতে পারেন নি। ফলে এক অদ্ভুত বিষণ্ণতায় ডুবে গেছেন সত্তর দশকের সাতজন তরুণ- যাদের হাত ধরে পরবর্তীতে বাংলা গানে এল যুগান্তকারী পরিবর্তন এবং তাদের অন্যান্য উত্তরসূরিরা – নগর ফিলোমেল, গড়ের মাঠ, লক্ষ্মীছাড়া, ক্রস উইন্ড, ক্যাকটাস, সুমন চট্টোপাধ্যায়, অঞ্জন দত্ত এবং অন্যেরা।
প্রশ্ন থেকে যায় –
কোন কারণে সিপিএম যদি ভাগ না হত বা নকশাল আন্দোলন যদি ব্যর্থ না হত এবং এই সাত তরুণ যদি নিজেদের স্বাভাবিক জীবন ও ক্যারিয়ার নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন তাহলে বাংলা ব্যান্ডের গান কি অন্যরকম হত?