সত্তর/ আশি দশকের বাংলা ব্যান্ডের গান এত বিষণ্ণ কেন?

(১)
কিছুদিন ধরেই মাথার মধ্যে একটা চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছিল। চিন্তাটা টুকে রাখার জন্যেই এই লেখা। চিন্তার সূত্রপাত আসলে একটা র‍্যানডম প্রশ্ন থেকে- সত্তর/ আশি দশকের বাংলা ব্যান্ডের গান এত বিষণ্ণ কেন? আরেকটু স্পেসিফিক্যলি বলতে গেলে- পশ্চিমবঙ্গের বাংলা ব্যান্ডের শুরুটা এত বিষণ্ণ গান দিয়ে কেন? অরুনেন্দু দাস, মহীনের ঘোড়াগুলি, নগর ফিলোমেল ইত্যাদি যাদের শোনা আছে তারা আশাকরি আমার সাথে একমত হবেন যে এদের মন-ভাল করা কোন গান নেই। বিষয় বৈচিত্র্যে ভরপুর হলেও অধিকাংশ গান শেষ পর্যন্ত মেলাঙ্কলিক। অথচ পশ্চিমের প্রচলিত ধারনা অনুযায়ী ব্যান্ডের গান হওয়া উচিত ছিল তারুণ্যের উচ্ছ্বাসপূর্ণ, উশৃঙ্খল এবং উদ্দাম। তাহলে সত্তর দশকের তরুণদের বেলায় এমন হল কেন? ওদের সমস্যাটা কী? ওরা এত দুঃখী কেন?
এক্ষেত্রে বলে রাখা ভাল- বাংলাদেশের ব্যান্ড গানের শুরুটা কিন্তু এরকম ছিল না। রীতিমত নাচ গানে ভরপুর আর ধুম ধারাক্কা। ইউটিউবে জিঙ্গা শিল্প গোষ্ঠীর বেশ কিছু গানে তার প্রমাণ মেলে। তাছাড়া অন্যান্য যে কয়টা ব্যান্ড ছিল- চিত্র নায়ক জাফর ইকবালের র‌্যাম্বলিং স্টোনস, আইওলাইটস, উইন্ডিসাইট অব কেয়ার, লাইটনিংস – এদের সবার বিচরণ ছিল মূলত হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল আর ঢাকা ক্লাব কেন্দ্রিক। এই উচ্চকিত জৌলুসের মাঝে খুব একটা দুঃখ বিলাসের অবকাশ ছিল না বোধ করি।
উইকিপিডিয়া বলছে মহীনের ঘোড়াগুলি ভারতের প্রথম রক ব্যান্ড! পঁচাত্তরের দিকে মেবি ওরা প্রথম স্টেজ শো করে এবং প্রচুর পচানি খায়। পত্র পত্রিকায় তীব্র সমালোচনা ছাপা হয় এবং মজা করে নাম দেয়া হয় পেলভিস প্রেসলি! আর হবেই বা না কেন? বাঙালি তখন সলিল, শ্যামল, হেমন্ত আর সন্ধ্যায় মজে আছে। তার উপর রবীন্দ্রনাথের প্রেতাত্মা তো আছেই। কিন্তু মানুষের কটুকথা শুনে মন খারাপ করে কষ্টের গান করেছে এটা মেনে নেয়া বোধহয় ঠিক হবে না। উল্টো যত গালিগালাজ ভরা চিঠি আর পেপার কাটিং ছিল, সব একসাথে করে ওরা পরের এলবামের কাভারে ছাপিয়ে দিয়েছিল। শুরুর দিকে নাকি ব্যান্ডের কোন নাম খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। অনুষ্ঠানের আয়োজকদের বিভিন্ন সময় বিভিন্ন নাম বলা হত। পালের গোদার নাম করে একবার বলা হল – আমাদের ব্যান্ডের নাম ‘গৌতম চট্টোপাধ্যায় বিএসসি ও সম্প্রদায়’! তার মানে এরাতো রসিকতা বোঝে। চিরদুঃখী ক্রাই-বেবি নয় মোটেই। তাহলে সমস্যাটা কোথায়?
পরবর্তী দশকগুলোতে মহীনের ঘোড়াগুলি যতটা না একটা ব্যান্ড তার চেয়ে অনেক বেশি একটা প্ল্যাটফর্ম যেখানে অনেকে এসে কন্ট্রিবিউট করেছে। কিন্তু নিজেদের সিগনেচার টোনটা কখনো আর বদলায়নি। বেছে বেছে সব মেলাঙ্কলিক ধাঁচের গান করেছে। যেন একটা আলাদা জনরা। যার ফলে এরকম অনেক গান আছে যার কয়েক লাইন শুনেই বলে দেয়া যায় এটা মহীনের গান। শুধু ‘ক্রিকেট’ নামে একটা গান আছে ১৯৯৯ সালের এলবামে যেটা একটু খাপছাড়া। শুনলে মনে হয় বাপ্পী লাহিড়ী’র কথা এবং সুর! এছাড়া মহীনের বাকি সব গান আমার অসম্ভব প্রিয়।
হয়তো শুধু মেলাঙ্কলিক সুরই নয়, গানের কথা ও বিষয়ের দিক থেকেও সত্তর দশকের এই যুবক দল অনন্য। এমন সব টপিক নিয়ে গান যা বাঙালি বাপের জন্মে শোনেনি। প্রেম-ভালবাসার গান যেন এদের আসতেই চায় না। ধরুন গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার যখন লিখছেন – “এই রাত তোমার আমার, ওই চাঁদ তোমার আমার, শুধু দুজনের…” কিংবা “এই পথ যদি না শেষ হয়, তবে কেমন হতো তুমি বলোতো?” টোট্যালি মেইক সেন্স- প্রেমিকার উদ্দেশ্যে স্পষ্ট প্রেম নিবেদন। বাক্যের অর্থ পরিষ্কার। ভুল হবার কোন চান্স নেই। প্রেমিকাও খুশি, শ্রোতারাও খুশি। আর সেই শ্রোতাকে যখন মহীন প্রেমিকার উদ্দেশ্যে লেখা এই গান শোনাতে এলো, তখন কী অবস্থা হয়েছিল তা সহজেই অনুমেয়-
বোঝেন অবস্থা? মানে পরীক্ষার আগের রাতে ভয়ের চোটে প্রেমিকাকে ডাকছে। এ যেন ছিঁচ কাঁদুনে, সেলফ- অবসেসড, ভীতু প্রেমিক। যথারীতি, বাঙালি এটা ভালভাবে নেয়নি। অথবা, বাপ্পী লাহিড়ী যখন ব্যালেরিনাদের নিয়ে আহ্লাদী গান বানাচ্ছেন জওয়ানি জানেমান, তখন মহীন এই মেয়েদের নিয়ে গান বানালো-
পুরাই পার্টি পুপার! সবকিছুর মধ্যেই যেন একটা শোক প্রস্তাব ঢুকিয়ে দেয়া। অলস, অকর্মণ্য জাতি হিসেবে আমাদের সুনাম আছে। Procrastination যেন আমদের রক্তে। কিন্তু এটা স্বীকার করতে আবার বড্ড আপত্তি। বীরের জাতি বলে কথা। মহীন যেন Procrastination কেই সেলিব্রেট করল গানে গানে-
তারপর রাজনীতি, কবিতা, সুরিএলিজম- এসব তো আছেই। এমনকি ক্যাফে, চেয়ার-টেবিল, চায়ের দোকান পর্যন্ত। যার রেশ ধরে নগর ফিলোমেলের এই গান –



(২)
যে কোন সৃষ্টিশীল কাজের পেছনে অনুপ্রেরনার প্রয়োজন হয়। সেটা দেশপ্রেম হতে পারে, নর-নারীর প্রেম হতে পারে, ব্যক্তিগত বিরহ ব্যাথা হতে পারে। ক’দিন আগে মহাভারত নিয়ে একটা বিশ্লেষণ পড়ছিলাম। পড়তে পড়তে মনে হচ্ছিল – মহাভারতের ৭০% কাহিনীই কল্পনা প্রসূত। এবং এই সুবিশাল মহাকাব্য সৃষ্টির পেছনে আসলে ইন্ধন জুগিয়েছে আর্য নিপীড়নের বিরুদ্ধে অনার্য মানুষের প্রবল প্রতিশোধ স্পৃহা। শক্তিমত্তা এবং সামর্থ্যে আর্যদের সমকক্ষ হতে না পেরে, নিপীড়িত আদিবাসী কল্পনার আশ্রয় নিয়েছিল। কালো মানুষের জয় হল তাদের কাব্যে। সত্যবতী রানী হল; তার বংশধরেরা ছলে বলে কৌশলে সিংহাসন দখল করল।
সত্তর দশকের তরুণদের এই মনখারাপ রোগের পেছনেও একটা হাইপোথিসিস দাঁড় করানো যায়। আমার ধারণা এর পেছনে মূল অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে বিপ্লবের স্বপ্ন ভঙ্গের বেদনা। নকশাল বাড়িকে ঘিরে যে বিপ্লবের সূচনা হয়েছিল ষাটের দশকে, তার প্রভাব বাংলা সাহিত্যে স্পষ্ট। যদিও এই বিপ্লব করে আখেরে কারো লাভ হয়নি- কয়েকজন সাহিত্যিক ছাড়া। সমরেশ মজুমদারের কালবেলা তো দেড় লাখ কপি বিক্রি হয়েছিল। তারপর সুনীল, শীর্ষেন্দু – এরা তো আছেনই। মজার ব্যাপার হল এরা কেউই বিপ্লবে অংশ নেন নি। শুধু দূর থেকে বিপ্লব দেখেছেন আর গল্প ফেঁদেছেন। হাজার চুরাশির মা অবশ্য এই বিবেচনার বাইরে থাকবে। যেহেতু মহাশ্বেতা দেবী নিজে জড়িত ছিলেন।
নকশাল আন্দোলনের একটা বেসিক গড়ন চোখে পড়ে। সেটা হল বিপ্লবে অংশ নেয়া তরুণরা সবাই ছিলেন মেধাবী ছাত্র-ছাত্রী। আন্দোলনের মূল ঘাঁটি ছিল তাই প্রেসিডেন্সি কলেজ, যাদবপুর ইউনিভার্সিটি, শিবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের মত সামনের সারির শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো। সাধারন গোছের ছেলেমেয়েদের খুব একটা এই পথ মাড়াতে দেখা যায়নি। কলকাতা লিটফেস্টের একটা সেশনে শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় তাই এই আন্দোলনকে বলছেন- কিছু মেধাবী তরুণের ‘রোমান্টিক’ বিপ্লব। বিপ্লবের স্বপ্ন-ভঙ্গের পরে যারা বেঁচেছিলেন তারা অধিকাংশই জার্মানি আর ফ্রান্স পালিয়ে যান। অনেকেই অভিমানে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন।
মহীনের ঘোড়াগুলির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা মনি দা (গৌতম চট্টোপাধ্যায়) প্রেসিডেন্সিতে পড়তেন। বুলা (প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়) পড়তেন শিবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং-এ। রঞ্জন ঘোষাল ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তেন যাদবপুরে। অরুনেন্দু দাস- যদিও তিনি এদের চেয়ে অনেক সিনিয়র- আর্কিটেকচারে পড়তেন শিবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং-এ। বাকিদের সম্পর্কে তথ্য খুঁজে পাই নি। কিন্তু এ ব্যাপারে আমার কোন সন্দেহ নেই যে এরা সবাই কমেবেশি বিপ্লবে অংশ নিয়েছিলেন। মনি দা গ্রেপ্তার ও নির্যাতিত হন। এরপর তাকে রক্তাক্ত অবস্থায় পুলিশ লক-আপে পাওয়া যায়। যদিও এতো নির্যাতনের পরও তিনি কোন প্রকার তথ্য প্রকাশ করেননি।
চারু মজুমদার মারা যান বাহাত্তরে। এর আগেই অবশ্য আন্দোলন চুকে বুকে যায়। সত্তরে দলের ভিতর মত বিরোধ, অতঃপর ভাঙন। তখন মনি দা’র মত বিপ্লবীরা যারা জীবন বাজি রেখে এই স্বপ্নে নাম লিখিয়েছিলেন তারা একটা অস্তিত্ব সঙ্কটে পড়ে যান। এই দিকভ্রান্তি, চাপা অভিমান, বিপ্লবে পরাজয়ের বেদনা তাদের আজীবন তাড়িয়ে বেড়িয়েছে। যার প্রভাব পড়েছে তাদের গানে-


যার যেখানে পৌঁছানোর কথা ছিল, সে সেখানে পৌঁছুতে পারেন নি। ফলে এক অদ্ভুত বিষণ্ণতায় ডুবে গেছেন সত্তর দশকের সাতজন তরুণ- যাদের হাত ধরে পরবর্তীতে বাংলা গানে এল যুগান্তকারী পরিবর্তন এবং তাদের অন্যান্য উত্তরসূরিরা – নগর ফিলোমেল, গড়ের মাঠ, লক্ষ্মীছাড়া, ক্রস উইন্ড, ক্যাকটাস, সুমন চট্টোপাধ্যায়, অঞ্জন দত্ত এবং অন্যেরা।
প্রশ্ন থেকে যায় –
কোন কারণে সিপিএম যদি ভাগ না হত বা নকশাল আন্দোলন যদি ব্যর্থ না হত এবং এই সাত তরুণ যদি নিজেদের স্বাভাবিক জীবন ও ক্যারিয়ার নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন তাহলে বাংলা ব্যান্ডের গান কি অন্যরকম হত?

আগাম অস্কার কড়চা

যতই বলিনা কেন সিনেমা দেখার সময় এওয়ার্ড নিয়ে মাথা ঘামাই না, তবু এওয়ার্ডের মৌসুম আসলেই যেন সিনেমা দেখা বেড়ে যায়। বাফটা, গোল্ডেন গ্লোব দেয়া শেষ, সামনের সপ্তাহে অস্কার। তাই ভাবলাম এবারের অস্কারের সিনেমা গুলো নিয়ে কিছু একটা লিখি। আসছে রবিবার মিলিয়ে দেখা যাবে আমার প্রেডিকশন কতটা ভুল বা ঠিক হল। 

গড়পড়তা বিচারে এবারের সিনেমা ২০১৬ এর চেয়ে ভাল। ২০১৭ তে হয়তো ভাল সিনেমা রিলিজ হয়েছে বেশি। ফলে এবার La La Land এর মত অনাকাঙ্খিত কিছু ঘটতে দেখা যায় নি। যদিও অস্কারের নমিনেশন নিয়ে বিতর্ক, গুঞ্জন নতুন কিছু নয়। বিভিন্ন পলিটিকাল, কমার্শিয়াল এজেন্ডাকে সামনে রেখে যেমন কোটা ভিত্তিক নমিনেশন হয়ে থাকে, যার ধারাবাহিকতা এবারো লক্ষণীয়। যার কারণে প্রতিবারই বেশ কিছু ভাল ছবি বেস্ট পিকচার ক্যাটাগরি থেকে বাদ পড়ে যায়। মনে আছে- যে বার Slumdog Millionaire এর জয়জয়কার হল, সেবার নোলানের Dark Knight নমিনেশনই পায় নি। এতই খারাপ ছবি! নমিনেশনে সচরাচর যে কোটা গুলো লক্ষ্য করা যায় সেগুলো হল - নারী কোটা, কালো কোটা, LGBT কোটা, দেশপ্রেম কোটা, মুক্তমনা কোটা, থার্ড ওয়ার্ল্ড বা ভিখারি কোটা, বিশেষ সম্মাননা কোটা ইত্যাদি। পাঠক হয়তো এখন কিছুটা হলেও অনুমান করতে পারছেন যে Dark Knight এগুলোর কোনটাতেই ঠিকমত ফিট করেনি। তাই ভিখারি কোটার ছবি Slumdog Millionaire এর জন্যে জায়গা ছেড়ে দিতে হয়েছিল। 

যাই হোক, ২০১৭ এর সবচে' ওভারহাইপড ছবি মেবি Lady Bird. নারী কোটায় নমিনেশন পেয়ে এই ছবি এবার নারী স্বাধীনতা, উইমেন এমপাওয়ারমেন্ট ইত্যাদির মার্কেট পসার করেছে। ছবির সবচে' আকর্ষণীয় দিক ছিল স্ক্রিন-প্লে। এছাড়া বাদ বাকি সবকিছু অতটা অভিনব মনে হয়নি যতটা না পাবলিক এটেনশন পেয়েছে। এই ধাঁচের ইউরোপিয়ান ছবি হরহামেশাই দেখা যায়। Greta Gerwig নিঃসন্দেহে ভাল লেখিকা এবং অভিনেত্রী। কিন্তু সবমিলিয়ে বেস্ট পিকচার + বেস্ট ডিরেক্টর এ জায়গা পাওয়ার মতন ছবি নয় এটা। Gerwig এর এটাই প্রথম পরিচালনা। এর আগে তার পার্টনার Noah Baumbach'র সাথে বেশ কিছু কাজ আছে। Baumbach ইন্ডি ফিল্মমেকারদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয় মুখ। এই আকালে ইন্ডি ফিল্মমেকার বলতে অনেক ক্ষেত্রে তাদেরকেই বোঝানো হয়, যারা যোগ্যতা থাকা স্বত্বেও টাকার অভাবে বড় ছবি বানাতে পারেন না। Gerwig সেই দল থেকে অনেকটা বেরিয়ে এসে যেন নিজেকে প্রমাণ করলেন। যদিও Lady Bird সম্ভবত নমিনেশন লিস্টে সবচে' কম বাজেটের ছবি। Baumbach এর ছবি আমার ভাল লাগে। অল্প বাজেটের মধ্যে কথোপকথন ভিত্তিক ছিপছিপে ছবি। অনেকটা ছোট গল্পের মত। Baumbach এর সিনেমা যারা আগে দেখেছেন, Gerwig এর ২০১৭ তে বানানো Lady Bird এর মেকিং এর সাথে মিল খুঁজে পেলে আশ্চর্য হবেন না। Gerwig কে অবশ্য এ নিয়ে কোথাও কিছু বলতে শুনি নি। 

নারী কোটায় যে ছবিটা অন্ততঃ একটা-দুটো নমিনেশন পেতে পারত সেটা হল Patty Jenkins এর Wonder Woman. এডাপ্টেড স্ক্রিন-প্লে এমনকি ভিজুয়াল ইফেক্ট কোথাও এর জায়গা হল না। বড় বাজেট বা বক্স অফিস হিট মানেই কি খারাপ ছবি? এটা কি শিল্পের সাথে অর্থের সেই ক্লাসিক দ্বন্দ্ব-এর মত? Wonder Woman এর টাকা দিয়ে Patty Jenkins অন্ততঃ ১৫টা Lady Bird বানাতে পারতেন! একটা না একটা তো শিকে ছিঁড়তোই। একই কথা Logan এর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। Patrick Stewart তো Supporting Actor হিসেবে নমিনেশন পেতেই পারতেন, যেখানে Three Billboards Outside Ebbing Missouri থেকে একই সাথে দুই জন পেয়েছেন! কমিকস গল্পের উপর বানানো সিনেমা অস্কার কমিটি বোধ হয় খুব একটা আমলে নেয় না। উদাহরণ হিসেবে আবার Dark Knight এর কথা বলা যায়। যাই হোক Gerwig যারপরনাই সুলক্ষণা। জীবনের প্রথম ছবি দিয়েই বাজিমাত করেছেন। নোলান, স্পিলবার্গ, পি টি এন্ডারসনদের মত বাঘা বাঘা পরিচালকদের সাথে এক কাতারে জায়গা করে নিয়েছেন। মজার ব্যাপার হল নোলানেরও এটা জীবনে প্রথম বেস্ট ডিরেক্টর নমিনেশন। ভাবা যায়?! 

এবছরের দ্বিতীয় ওভারহাইপড ছবি Phantom Thread। P T Anderson এর ছবিতে Daniel Day-Lewis- স্বভাবিকভাবেই প্রত্যাশা ছিল বেশি। হয়তো Daniel Day-Lewis এর শেষ ছবি বলে দর্শকের আগ্রহ আরো বেশি ছিল। কিন্তু কোন একটা অদ্ভুত কারণে ছবিটা অতটা জমে ওঠে নি। কিছু একটার কমতি ছিল ফর শিউর। দুই জনেই বেস্ট একটর, বেস্ট ডিরেক্টর নমিনেশন পেয়েছেন বটে, কিন্তু আমার ধারনা কেউই শেষ পর্যন্ত এওয়ার্ড পাবেন না। সেই হিসেবে Daniel Day-Lewis এর প্রতি সম্মান স্বরূপ এই ছবিকে 'বিশেষ সম্মাননা কোটা'য় ফেলা যেতে পারে। এই কোটার আরেকজন পূর্বসূরি হলেন নায়করাজ Leonardo DiCaprio 

বেস্ট পিকচার লিস্টে কালো কোটার ছবি আছে Get Out। তরুণ পরিচালক Jordan Peele বেস্ট ডিরেক্টর হিসেবেও নির্বাচিত হয়েছেন। ছবির প্লট, গল্প বলার ধরন সব-ই ইন্টারেস্টিং। কিন্তু শেষমেষ আমার কাছে ব্ল্যাক মিররের একটা গড়পড়তা এপিসোডের চেয়ে আহামরি কিছু মনে হয়নি। ব্ল্যাক মিররের উদাহরণ দিলাম সঙ্গত কারণেই যেহেতু গল্প বলার ঢং এবং বিষয়ে অনেক সামঞ্জস্য আছে। সেই হিসেবে এটাকে তৃতীয় ওভারহাইপড ছবি বলা যায়। বিশেষত ক্রিটিক সম্প্রদায় এটাকে নিয়ে প্রচুর লাফালাফি করছেন। আমি যার কোন তাৎপর্য খুঁজে পাই নি। 

দেশপ্রেম কোটার ছবি আছে দুটি - অগ্নিঝড়া Dunkirk এবং পঞ্চাশের মন্বন্তর খ্যাত পাগলা রাষ্ট্রনায়ক চার্চিলের উপর নির্মিত ছবি Darkest Hour। Dunkirk বড় বাজেটের ছবি- তবে দেখে মনে হয়েছে নোলানের ইয়েট এনাদার কমার্শিয়াল প্রোজেক্ট। Darkest Hour এর স্ক্রিন-প্লে সেই তুলনায় ভাল লেগেছে। Gary Oldman অসাধারণ অভিনয় করেছেন চার্চিল চরিত্রে। এবারে বেস্ট একটর সিলেকশানটা যেন একটু সহজই হয়ে গেল বিচারকদের জন্যে। নোলানের কপালে অবশ্য কিছু জুটবে বলে মনে হয়না। বেস্ট ডিরেক্টর নমিনেশন নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হবে। 

LGBT কোটার ছবি আছে Call Me by Your Name- ইটালিয়ান পরিচালকের ছবি। কাহিনীর পটভূমিও ইটালির এক ছোট ছিমছাম শহর। ছবির দৃশ্যায়ন খুব সুন্দর- চারিদিকে সবুজ গাছপালা ঘেরা নির্জন শহর- সেখানে কোন এক গ্রীষ্মের ছুটিতে সবার দল বেঁধে বেড়াতে যাওয়া, তারপর মূল চরিত্রের সাথে তার অধ্যাপক বাবা'র রিসার্চ এসিটেন্টের অদ্ভুত প্রেম। সতের বছরের মূল চরিত্রে Timothée Chalamet এর অভিনয় খুব প্রশংসিত হয়েছে। মাত্র ২২ বছর বয়সে অস্কার নমিনি! Gary Oldman না থাকলে হয়তো এবার অস্কার পেয়েও যেত। Lady Bird এর নায়িকা Saoirse Ronan এরও একই অবস্থা- মাত্র ২৪ বছর বয়সে ৩ বার অস্কার নমিনি! এরা বাকি জীবনে আর করবেটা কী?

এবার মুক্তমনা কোটার ছবি হল - The Post। বানিয়েছেন শ্রীমান স্পিলবার্গ। মেরিল স্ট্রিপের সাথে ছবিতে আরো আছেন ধৃতিমান টম হ্যাংক্স। কিভাবে প্রেসিডেন্ট নিকসনের হুশিয়ারির তোয়াক্কা না করে ওয়াশিংটন পোস্টের একদল দুর্ধর্ষ সাংবাদিক ভিয়েতনাম যুদ্ধের গোপন নথি ফাঁস করে দিয়েছিল তার উপর ভিত্তি করেই এই কাহিনী। এই ছবি পুরষ্কার-টুরষ্কার না পেলেও অস্কারের স্টেজে জোকস সাপ্লাই এর কাজে দিবে নিশ্চিত। মিডিয়ার স্বাধীনতা, ফেইক নিউজ, ফক্স- রুপার্ট মারডগ ইত্যাদি প্রাসঙ্গিক টপিকে বলির পাঠা হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে পচানো হবে আর হলভর্তি দর্শক মদ খেতে খেতে মুহুর্মুহু হাততালি দিয়ে উঠবে।

অনেক বছর আগে থার্ড কি ফোরথ ইয়ারে পড়ার সময় Martin McDonagh এর In Bruges দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম। তারপর প্রায়ই আমরা কয়েক বন্ধু মিলে বার বার In Bruges দেখতাম আর হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খেতাম। যদিও মোটেই কমেডি ধাঁচের ছবি নয়- চোখের সামনে খুন খারাপি, রক্তা রক্তি হচ্ছে- অথচ না হেসে থাকা যেত না এমন ডার্ক হিউমার। কলিন ফ্যারেলকে সবসময় দ্বিতীয় শ্রেণীর অভিনেতা বলে মানতাম সবাই। কিন্তু এই সিনেমা দেখার পর থেকে তাকে বিশেষ মর্যাদা দেয়া হত। গল্প বলায় McDonagh এর একটা নিজস্ব স্টাইল আছে। কখনো কখনো মনে হতে পারে কিছুটা টারানটিনোর প্রভাব, কিন্তু তার স্ক্রিনপ্লে অনন্য। Three Billboards Outside Ebbing Missouri এবছর দেখা আমার সবচে প্রিয় ছবি। অনেকদিনপর McDonagh এর কারুকাজ দেখে আপ্লুত। ছবিতে কাহিনীর চেয়েও তার মেকিং, ডায়ালগ, চরিত্রগুলোর নাটকীয় কর্মকাণ্ড মুখ্য হয়ে ওঠে। McDonagh এর একটা প্রিয় কাজ হল মৃত্যু নিয়ে অদ্ভুত সব হিউমার করা। দেখা গেল একটা খুব সিরিয়াস শক্তিশালী চরিত্র মনে হচ্ছে বুঝি সিনেমার নায়ক- তারপর মাঝপথে সামান্য বোকামির কারণে হুট করে মরে গেল। McDonagh বেস্ট ডিরেক্টর নমিনেশন পাননি। তবে আমার ধারনা Three Billboards Outside Ebbing Missouri বেস্ট পিকচার এওয়ার্ড পাবে। Frances McDormand হয়তো বেস্ট একট্রেস পাবেন।  

Guillermo del Toro এর প্যান্স ল্যাবিরিন্থ খুব প্রিয় ছবি। The Shape of Water যদিও অতটা ক্লাসিক হয়ে উঠে পারে নি, তবুও বেস্ট ডিরেক্টর এওয়ার্ডটা হয়তো তার ঝুলিতেই যাবে। 

অস্কার নমিনেশনে এবছরের সবচেয়ে আন্ডাররেটেড ছবির তালিকায় থাকবে নেটফ্লিক্সের ছবি Mudbound. বেস্ট পিকচার ক্যাটাগরিতে Lady Bird, Phantom Thread কিংবা Get Out এর তুলনায় অনেক ম্যাচুরড মেকিং। অথচ কোন মেজর ক্যাটাগরিতে নমিনেশন জুটল না Dee Rees এর কপালে। একাডেমী চাইলে কিন্তু Mudbound দিয়ে কালো কোটা এবং নারী কোটা এক সাথে ফিল আউট করতে পারত। যেহেতু নারী ডিরেক্টর। তাহলে করলো না কেন? পরে গত বছরের কান ফেস্টের এক ঘটনা মনে পড়ল। সেবার কানে নেটফ্লিক্সের একটা সিনেমা Okja নিয়ে খুব শোরগোল হয়েছিল। বিচারক প্যানেলের কয়েকজন এবং অন্যান্য বোদ্ধারা দাবি করে বসল এই সিনেমা প্রকৃত সিনেমা নয়। কেন? কারণ এটা আগে টিভিতে রিলিজ হয়েছে। সাধারণত নেটফ্লিক্স তাদের প্রযোজনার ছবিগুলো রেগুলার কন্টেন্ট হিসেবে টিভিতে রিলিজ করে দেয়। সিনেমার প্রথাগত ডিস্ট্রিবিউশন পদ্ধতি এটা সাপোর্ট করে না। তাদের মতে সিনেমা প্রথমে হলে রিলিজ করতে হবে। দর্শক হলে এসে সিনেমা দেখবে। তারপর যা খুশি করে করুক। তো নেটফ্লিক্স বা এমাজন প্রাইম এর সাথে অন্য ডিস্ট্রিবিউশন চ্যানেলের এই বিবাদ এখনো চলমান। তাই একাডেমী হয়তো ঝামেলা এড়ানোর জন্যে Mudbound কে খুব একটা হাইলাইট করতে চায় নি। Mudbound নেটফ্লিক্সের প্রযোজনা না হলে, নিশ্চয় আরো বেশি নমিনেশন পেত। 

সিনেমাটোগ্রাফির জন্যে দেখতে সুন্দর লেগেছে Blade Runner 2049. বেস্ট সিনেমাটোগ্রাফার এওয়ার্ড তাই অবধারিত ভাবেই পাচ্ছেন Roger Deakins। কিন্তু ছবিতে গ্যালাক্সি নোটবুক খ্যাত হলিউডের রনবীর কাপুর এমনই জঘন্য অভিনয় করেছেন যে নানা সম্ভাবনায় পরিপূর্ণ থাকা স্বত্বেও ছবিটি শেষমেষ আর কোন মেজর নমিনেশন পেতে ব্যর্থ হয়েছে। 

প্রধান কয়েকটি ক্যাটাগরিতে যে নামগুলো আসতে পারে এবারের অস্কার বিজয়ীর তালিকায়ঃ    

১। বেস্ট পিকচারঃ Three Billboards Outside Ebbing Missouri

২। বেস্ট ডিরেক্টরঃ Guillermo del Toro

৩। বেস্ট একটরঃ Gary Oldman

৪। বেস্ট এক্ট্রেসঃ Frances McDormand

৫। বেস্ট সিনেমাটোগ্রাফারঃ Roger Deakins

৬। বেস্ট এডাপ্টেড স্ক্রিন প্লেঃ Call Me by Your Name

৭। বেস্ট অরিজিনাল স্ক্রিন প্লেঃ Lady Bird

-- 

27/2/2018 

একা হতে হতে গাছ হয়ে যাই

একা হতে হতে গাছ হয়ে যাই




একা হতে হতে গাছ হয়ে যাই

অলস সময়ের পাড়ে পড়ে থাকি বেওয়ারিশ। 

গিটার ও ফুল বিষয়ক প্রবন্ধ পড়ে সকাল হয় 

ঘুমফোনে আনোখা আঙুল 

ত্রস্ত জেগে ওঠে। 

যেন উপস্থিত মৃত্যু বলে কিছু নেই

বিষণ্ণতা শুধু কালো বেড়ালের নাম। 

অনেক সম্ভাবনা নিয়ে বাইরে যাই, 

আবার ফিরে আসি। 

কোথাও শুশুকের পথ বেঁকে গেছে দূরে। 

কোথাও মৃদু বর্ষায়

ডুবে গেছে সাবমেরিন। 

--