জুনের চিঠি

জুনের চিঠি



একটা চিঠি আসবে এবার।
নিকট ডাকবাক্সে।
যার ভেজা খামে জমা সব অফুরান বর্ষা,
আমাদের শীতল বিষাদ।
স্কুলপথে আকাশ দ্যাখেনি বলে
অভিযোগ ছিলো মলিন মুখে।
যখন থামেনি কোন মেঘ চার্চের চূড়োয়
বিভিন্ন বন্দর হতে এসে
এইখানে নমিত হয়েছে এমন
দীঘল ডানা ভেঙ্গে,
তারই পালক পেয়েছি আমি
স্খলনের বহু আগে।
ছাতাসহ আটক হলো যেবার
নিখিলের মেয়ে
কলেজের পথে যেতে তিমিত বর্ষায়।
আমিও জেনে গেছি ঠিক ঠাক
কোন্ চিঠি আসবে এবার
আমাদের নিকট ডাকবাক্সে
অন্তত: নিখিলের নামে।

-----------------------------

প্রাচীন দেরাজের কোণ

প্রাচীন দেরাজের কোণ



কলমটা খুঁজে পেলাম না আর।
এখানে ওখানে
ন্যাপথালিন উড়ে উড়ে
দেখি শুধু প্রাচীন দেরাজের কোণ পড়ে আছে।
স্মৃতির কপিকল বেয়ে উঠে আসে ফ্যামিলি এ্যালবাম।
হেডিং সমেত বিগত মুখ; বিগত চোখ।
প্রেমালাপের পত্রিকায় চুপসানো মলম হায়
পড়ে আছে কবেকার এখনো আধ খাওয়া
বিষণ্ন সিগারেট।

যেন কোন নবীন যাদুকর ফেলে গেছে ভুল গ্রিনরুমে
মলিন নোটবুক তার;
বিবিধ ম্যাজিক বিষয় পড়ে আছে এমন বিস্তর সরঞ্জামে।

কিন্তু কলমটা খুঁজে পেলাম না আর।
এখানে ওখানে
প্রাচীন দেরাজের কোণে...
-----------

পরমা' র অডিশন

পরমা' র অডিশন



এক চোখে গ্রহণ নামে
আর চোখে অন্ধকার
তবু নখর দেখেছি দারুণ।
কুচযুগে।

তাই জরুরী মুহূর্তে ভুলে গেছি সব।
যা কিছু মনে ছিলো।
ছিলো উইকএন্ডের শিডিউলে।
বিনম্র পোলভল্ট লক্ষ্য করে
হোটেলওয়ালি হেঁটে হেঁটে আসে
এবং ঠোঁট নাড়ে
অথবা নড়ে।
মথিত প্রসঙ্গে সে
শাড়ি খুলে ফ্যালে।
বুক খুলে দেখিয়ে দেয়
চাপা নিকেল পরন।
দেখেছি আঁইশের সিনেট
সেইখানে
প্রতি রোববারে
তার নাভিমূলে যারা যারা
জিভ চেটে গেছে।
আমিও শোভনীয় নই তেমন
পরমার পিঠজুড়ে
ডিম লাইটের আলোয়
অসাবধান হতে গিয়ে
বারবার বলে ফেলি-
আজ তাহলে আসি।
----------------------------

প্রফেসরের চোখ

প্রফেসরের চোখ


এখানে নিলাম হবে চোখের
যদিওবা মামুলি ধরনের
এক বেলেল্লা প্রফেসরের চোখ
অডিটরের মুখে জানা গেলো তাঁর পত্নী প্রসঙ্গে।
যিনি কিনা প্রচুর রূপসী ছিলেন বটে
বিহারী বিমান থেকে চুরি হবার আগে
এশিয়ার পথ ভুলে ছিলো যেবার
নহর দেশের বিমানবালা;
দোহারা গড়ন ছিলো যার

ঠিক তরুণীর মতন!

খুবলিয়ে তুলেছে সে চোখ
নিব্ পেন্সিলে
নভেলের চাপায় আজ মরে গ্যাছে সে
প্রফেসরের বেডরুমে।

----------------------------

বায়োস্কোপ

বায়োস্কোপ



কৃষ্ণচূড়ায় ছেয়ে গেছে রাজপথ
পানশালা মোড়
ফুটেছে এমন জুয়েলারির মতন
বিস্তর মথিত হয়ে
তাই আজ চোখ দেইনি
কোন শহরের ম্যাপে

গাছে গাছে লাল রঙ
ভরাট হয়ে এলে
রুটের বাস ফেলে
হেঁটে গেছি নির্লিপ্ত
একা

বিষন্ন হকার যখন
ডেকেছিলো অফিস পাড়ায়
চালশের লোকেরা
দেখেনি কিছুই
মাড়িয়ে চলে গেছে
মার্বেল লাল রোশনাই।
------------------------------

ওয়েনব্রেনারের জুতো

ওয়েনব্রেনারের জুতো


কত আর? এই ধরেন, মাস ছ'য়েক হবে আমরা একসাথে আছি।
তুমুল বর্ষার তারিখে দূর সম্পর্কের আত্মীয়ের মতন
আমরা প্রায়ই হেঁটে হেঁটে গেছি কোন পার্কের পথ ধরে।
এই সেদিনও অনেক গড়িমসি করে নামা
একটা বিকেলের বেঞ্চিতে বসে ভাবছিলাম এইসব।
ভাবছিলাম শতাংশ,
বিভিন্ন প্রাইজ ট্যাগ,
হয়তো ভাবছিলাম আরো অনেক কিছুই।

অথচ আমি কেমন অমলিন ভুলে ছিলাম
এই সুগভীর সম্পর্কের কথা।
কুয়াশার মাসগুলোতেও
যারা যথেষ্ট উষ্ণতা পায়নি আমার সেল্ফের কোণে,
ভেতরের দরজায় কিংবা সংলগ্ন পাপোশে
যারা নিয়মিত ভিজে গেছে স্নানঘরে
গত মাস ছ'য়েকে ওরা কেমন জেনে গেছে
আমার যাবতীয় অক্ষাংশ দ্রাঘিমাংশ।
নিবিড় জড়িত হয়ে গেছে আমার প্রতিটি পর্যটনে।
--------------------------------------

বোর্ডপিন ও সুরেশের গল্প

বোর্ডপিন ও সুরেশের গল্প


এই গেল রোববারেই শুনছি আবার অবরোধ ছিলো।
শহর ছিলো সচেতন; একটুও হাসেনি এমন সারাবেলা।
দেখেছি অফিসপাড়াতেও আসে নি তেমন কেউই।
সুরেশের ছেলেটি যেমন এসেছিলো গত জুনে;
সুরেশের সাথে।
রিডাকশনে কেনা জুতো পায়ে হেঁটেছিলো এদিক ওদিক।
পেতেছিলো কান আমার টেবিলের পায়ায়,
অফিসের দেয়ালে, আর সব গোছানো ফোল্ডারে।
খেলতে খেলতে কখন যে পেটে পুরেছিলো দু'য়েকটা বোর্ডপিন!
বুঝে উঠতেই কেটে গেলো আমাদের সব পরিপাটি রোদ।
মৃত ঘোষনার।

যদ্দুর মনে পড়ে সেই সুরেশের আর ছেলেপুলে হয় নি কোন।
কিংবা হলেও যথেষ্ট বাঁচেনি ওরা কেউই।
আমি ও আমার বোর্ডপিনগুলো যেমন বেঁচেছিলাম
এক গাদা শীতের ভোরে।
এই গেল রোববারেই যেমন হেঁটে এসেছি অনেক মহাদেশ।
টেবিল থেকে টেবিলে বরাদ্দ ছিল আমাদের অখন্ড অবসর।

-----------------------------------------------------

টিভি অভিনেত্রীর প্রতি

টিভি অভিনেত্রীর প্রতি


আজকের দিনে আর কারুরই জানতে বাকি নেই যে
আমি খুব দুর্মরভাবেই তোমাকে চেয়েছিলাম
সমস্ত টং এর দোকান, তাদের অলস খদ্দের
কিংবা স্টপেজের চৌকস টিকেট বিক্রেতা অব্দি জেনে গেছে
তোমার লিনেনের শাড়ি
প্রচ্ছদের গায়ে তোমার লিপস্টিকের রঙ।
এমনকী তোমার নীল টিপও শিখে গেছে ওরা

শীতের ভোরে অফিসগামী লোকগুলো
ফি বছর কেমন উচ্ছন্নে গেছে তোমাকে দেখে দেখে
বলা যায় সমগ্রভাবে শুধু তোমার চোখ ভেবে
ভুলে বসেছে দু'য়েকটা মহাসমুদ্রের মত জল রাশি।

তুমি কি তখনো হয়ে ওঠো নি
পর্যাপ্ত সেলুলয়েড?
------------------------------------------

বৃষ্টির ট্রাফিকে টিউশনি

বৃষ্টির ট্রাফিকে টিউশনি


তাৎক্ষণিকভাবে বৃষ্টিতে ভেজার কোন প্ল্যান ছিলো না।
বিশেষত এমন ব্যবস্হাপনায়
যখন খুব মিইয়ে গেছে আমার ছাত্রীর মুখ।

বিপুল মিনিটে ক্রমেই দেরি করে ফেলছি আমি
এই পালিশের দোকানে
সেতু নির্মাণে জড়িত
একজন পরামর্শক জানাচ্ছেন
এবার মিনারে মাতম হবে
অতএব, না ভিজে যাবেন কোথায়?

মাননীয়া প্রধানমন্ত্রী এবার জাতিকে কিছু চমক দিয়েছেন বটে।
যারা নাকি প্রত্যেকেই দিকাক্ষের মত আশাজাগানিয়া
এবং যথেষ্ট মেঘমেদুর।
------------------------

রেণু বিষয়ে

রেণু বিষয়ে


বিগত দশকেও রেণু এরকমই ছিলো।
ঘুম ভোরে উঠে গিয়ে কেমন একটা বিষাদে যুক্ত হতো।
আমি বিছানায় শুয়ে শুয়ে
তার অবারিত টুং টাং শুনতাম।
শুনতাম কিচেন থেকে ভেসে আসা জল পড়ার শব্দ।
ধোঁয়া ওঠা কেটলি আর কাপের শব্দ।
আমি তখন দু'কানে বালিশ চেপেও
সহস্র চুড়ির শব্দ পেতাম।
এখনো যেমন আমার সমস্ত দেয়াল জুড়ে থাকে
মৃত প্রজাপতির দল।
এবং গ্রথনে ওদের পৃথিবীর রোদ।
জানালার গ্রিল বেয়ে গোপনে নেমে আসে যখন
রেণুর আলনায়,
ড্রেসিং টেবিলে
কিংবা
খুব এটিকেট মানা শুধু ঘুমের চাদরে।

অথচ তারপর থেকে তেমন কিছুই ঘটেনি রেণু বিষয়ে।
এমনকি বিগত দশকেও রেণু এরকমই ছিলো।
ডাইনিং টেবিলের ভোরে আমার অপেক্ষায় থেকে থেকে
যথেষ্ট বিষণ্ন একটা অমলেট হাতে।
------------------------------------

অনুমোদিত রিসেপশনিস্টের সাথে হোটেল লবিতে

অনুমোদিত রিসেপশনিস্টের সাথে হোটেল লবিতে


চোখ চলে যায় পৃথিবীর শেষ দরজায়।

উড়ন্ত চাবির সহিস হয়ে
যখন প্রমেহ জেগেছিলো মনে।
রিসেপশনিস্ট মেয়েটির গহীন ক্লিভেজে।

দেখা গেলো বহু চাঁদ ঝুলে আছে অবসরে
একটা অনুমোদিত দূরত্ব রেখে
খুব শুনশান হোটেল লবিতে।

------------------------------------

বিষাদ যাপন কেন্দ্র

বিষাদ যাপন কেন্দ্র

বসে আছি পার্কের নির্জনতম বেঞ্চিতে।
মুঠো ভরে নিয়ে তোমার সমস্ত পেলবতা
ক্রমশ: দূরবর্তী হই লেকের জলে ভেসে ভেসে।

যেন বহুকাল আগে
এখানেই হয়েছিলো ছিনতাই।
পায়রার পালকে গেঁথে
এইখানে এই লেকের তীরে
এসেছিলো যারা বিষাদ যাপনে।
বিস্তীর্ণ আকাশ ফুঁড়ে
উড়ে গেছে ওদের রকেট।
পার্কের সব ত্বরণ ভুলে গিয়ে
আরো নির্জন কোন বেঞ্চির খোঁজে।

-----------------------------------

পি-কক সন্ধ্যায়

"পি-কক" সন্ধ্যায়



একজন ওয়েটার এসে
ভুলিয়ে দিচ্ছে বারবার।
কটাক্ষে দেখছে 
এবং বলছে-
কোন কয়েনই অবশিষ্ট নেই আর।

কোন কয়েনই অবশিষ্ট নেই আর
আমাদের টেবিলে,

টেবিল সংলগ্ন ক্লথে।
ক্রমশ: গভীরমান এমটিভির পর্দা জুড়ে
একজন গ্রাফিক্যাল ভিজের সমস্ত সুহাসে।

অথচ কি এক গুহ্যকের মত
শুধু একটা গ্লাস আঁকড়ে পড়েছিলাম আমি।
যেন অদূরে কোন শেরাটনের শহর থেকে 
নেমে এসেছিলো ওরা।
এসেছিলো আমারই টেবিলের ক্লথে।
ঘুম ও ঘোর মদিরে
একদিন ভিজেছিলো এমন বিস্তর।
বুনোট ফেলে রেখে সব
এসেছিলো এমন মদ্যপ সুদূর!

ঋতুগত বিপণন

ঋতুগত বিপণন


মৌসুমি বাতাসে চেপে
এসেছিলো গোধূলির বাস।
দূর-পাল্লার।

ফেলে এসে ভুল পথে
তাহার সমস্ত তেল তৈজস
পেতেছিলো কি অপরূপ! এইখানে
এমন বৈশাখের রাতে।


বিষাদের ঘুড়ি কেটে কেটে
যারা হেসেছিলো অমলিন।
হয়তো আমিও মুখর ছিলাম তখন
ওই সব তীব্র রোদের মত তারিখে।
হাওয়ায় হাওয়ায় অবারণ পুলকে
দেখা হয়েছিলো আমাদের।
প্রচুর সময়ে
ঋতুজ অবসাদের এই প্রখর জ্বরে।

-----------------------------------------

ইজি চেয়ারে

ইজি চেয়ারে


জানা গেল না
কি ছিলো ফার্ণের পাতাদের মনে?
সমস্ত বারান্দা ও তাহার গ্রিল জুড়ে।
পয়মন্ত প্রদোষে।

তবুও শেষ সম্পাদকীয়তে
লেখা ছিলো আমার সব অসুখের কথা।
প্রতিটি পিক্সেলে পিক্সেলে
ফুটেছিলো সুদক্ষিণ।
মৃদু দ্রাঘিমা রেখায়।

এমন অসময়ে কেউ
চায়ের কাপ হাতে হেঁটে এলে
আমি একে একে লুকিয়ে ফেলি
আমার সকল গোলার্ধ;
পর্ণমোচী বিকেল।
--------------------------------

রিকশাযাত্রীর চোখ

রিকশাযাত্রীর চোখ


সিনেমা হলের সবগুলো চৌকসগ্রন্থি মিলে
আজ কোন বিষাদ লিখে রাখেনি।
হোটেল নীলিমা আবাসিক-এর দক্ষিণমুখী জানলা থেকে
উদগ্র নেমে আসেনি
কোন রাত্রিকালীন চুপিসার।
সমস্তটা নীল হয়ে ওঠে নি এখনো
এই সেগুনবাগিচায়।
আমি তবু ঊন মূক বসে আছি
তার বিস্তৃত যানজটে।
গনপূর্ত অধিদপ্তরের সমস্ত গা জুড়ে
স্টাফবাসটা ঘাই মারছিলো বিকট।

আমি অনিমিখে দেখে নিয়েছিলাম
এক জোড়া বিপরীতগামী চোখ।
বহুদূর সিগন্যাল ফেলে এসেও
যা মৃতবৎ লেপ্টে ছিলো
এপ্রিলের পূর্ণিমায়;
আমার বুক পকেটের ভাঁজে ।
----------------------------

বাথটাবে

বাথটাবে


প্রশ্ন উঠতেই পারে এইরূপ স্বমেহনে।
কিছু বুদ্ধ্যাঙ্ক মাফিক সভা কিংবা
প্রস্তাবিত চায়ের কাপ ফেলে
যারা চলে গেছে খুব দীঘল
বিকেল-মনস্ক রাস্তায়
নিরুপম হেঁটে হেঁটে।
হয়তো ভেবেছিলো
গহীন মেনোপজ
অথবা কোন যৌনতা শীর্ষক পাঠে
কারো রতিপ্রিয়তার অজুহাতে
যখন নিশ্চিতভাবে শুয়েছিল বাথটাবে।
----------------------------------------

মূলতঃ অমুদ্রিত ভ্রমন্থন

(১)
তখনো বিশেষ অতিথি লোকটা
চেয়েছিলো বিকট।
অবধারিত পনেরো ডিগ্রীতে কৌণিক সভায়
মুখায়নের তুরি কেটে কেটে
একজন সভ্যতা'র মা মরে গ্যাছে জেনে
আধাগেরস্ত পরিচ্ছেদে।

সে ফিরে গেলেই বাস্তবিক ধারনা করা যায়
মূলত: উগ্রপন্থী বলতে কি বোঝায়?


(২)


বহুবিধ প্রেয়সী হেসে
কখনোই বলবে না আর
সঘন বিনুনিতে এমন সঘন সঞ্চার
এমনই নিরালম্ব ভেবে
এই সব বিভাবরী পাঠ
বিষয়ীভবন মুখে সহিস ও চৌকাঠ
তবুও প্রশ্নমুখিন মেঘে
এতো বিস্তারিত মন্থন
পাহাড়ের আশা করে দুই নীলঘুম স্তন।

--------------------------------------

দুই লাইন

১.

সমস্ত চাদর জুড়ে

ঈষৎ প্রোটিন শৈলী

একহিম ঘুমের পরেও

পড়ে আছে বিস্তর

সঙ্গমে

যোনি কেশরের মূল ঘামে

এবং

চূড়ান্ত শিথিলতায়

ওরা যেন কত রাষ্ট্রীয় গোপন!



২.

অনেক নিমগ্নতার পরে

শুধু এক ফালি ব্যালকনি এলো

যার গভর্নরের ছোট মেয়েটি

আমার ক্লাসমেট ছিলো।

-------------------------

আর্টের স্কুল-বায়োগ্রাফিমূলক ২

মাঠের এক কোনায় দেখি একটা প্রকান্ড আম গাছ কয়েকটা বিল্ডিং এর দোতলা,তিনতলা আর খানিকটা আকাশ আড়াল করে দাঁড়িয়ে আছে।পাশ ঘেঁষে যে আস্তরহীন দেয়ালটা চলে গেছে তার কিয়দংশ এই মহীরুহের প্রতাপে যেন আরো জরাজীর্ণ হয়ে উঠেছে।এমনিতেই সারা গায়ে তার কানা ঘুপচির ঘাটতি নেই,তার উপর প্রতিবেশীর শিকড়ের ক্যাপিটালিস্ট মনোভাবের কারনে বেচারা বড় ভগ্ন হৃদয়।এই দেয়ালের সমান্তরালে অনেক গুলো মাঝারী থেকে ছোট হাইটের ফুল গাছ,তার মধ্যে একটা বোধ হয় রক্তজবা,সনাক্তকারী চিহ্ন হিসেবে কয়েকটা ঢাউস সাইজের লাল রঙা ফুল দেখে বিজ্ঞের মত সিদ্ধান্ত নিলাম।এতো বড় জবা ফুল আমি দেখিনি আগে।বাকি গুলোর ব্যাপারে খুব একটা নিশ্চিত হওয়া গেলো না।তাছাড়া বেশ কিছু পাতাবাহারী মনে হলো।খুব সুন্দর পাতা ওয়ালা গাছে নাকি কখনো ফুল হয় না।অথচ এই পড়ন্ত বিকেলের আবছায়ায় ঐ গাছগুলোকে কি ফুলেল দেখাচ্ছে!প্রতিটা পাতাই যেন একেকটা ফুল।ফুলবাহারী সব গাছের আলাদা ডাক নাম থাকে কিন্তু এই সুন্দর পাতার গাছগুলোর নিজেদের কোন নাম নেই।সবারই একই পদবী-পাতাবাহারী।ফুলঘটিত এই বায়াসড নামকরন প্রথা মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে বেশ।অন্তত: কিছু গাছের পাতার নামে নাম দেয়া উচিত ছিলো। তো এই ফুল আর পাতা নিয়েই একটা ছোটখাটো লম্বা বাগানের মতো।চারপাশে ইট জড়ো করে তার সীমানা নির্ধারন করে দেয়া হয়েছে।ধারনা করা যায় খানিকটা-আকাশ-আড়াল- করা প্রকান্ড আম গাছটাও কোন এক কালে এই বাগানেরই বাসিন্দা ছিলো।যদিও সীমানালঙ্ঘী স্পর্ধায় এখন সে নিজেই একটা গ্লোবালাইজেশনের মডেল হয়ে উঠেছে।
সীমানার এপারে এক চিলতে মাঠ।কোথাও ঘাসের চিহ্ন মাত্র নেই,শুধু ধূলো আর বালি।বালিতে অনেক আসা যাওয়ার ছাপ।একটু আগেও যেন ধূলো উড়ানো খুব ব্যস্ত সময় গেছে তার।তবুও ঐ বেড়ার ঘরগুলো আর খানিকটা-আকাশ-আড়াল-করা আম গাছটার শেষ বিকেলের ছায়ায় মাঠটাকে কেমন যেন বিষন্ন মনে হচ্ছিল।ফ্রকে মুখ গোঁজা "মন ভালো নেই" কিশোরীর মতো একরাশ ধূলো-মলিন বিষন্নতা!
দূরে তাকিয়ে দেখি বিপুল সংখ্যক কাক বাসা বেঁধেছে গাছটাতে।ওদের বিস্তর ডাকাডাকিতে আর সশব্দ পয়: নিষ্কাশনে মাঠের বিষন্ন নীরবতা ভেঙ্গে খান খান হচ্ছে।বেড়া দেওয়া ঘরগুলোর টিনের চালে থেমে থেমে শুকনো ডাল পালা আর কচি আম পড়ার শব্দ শুনছি।টিনের চালের নিচে যারা বসে ছবি আঁকছে ওরাও নিশ্চয়ই খুব বিরক্ত হচ্ছে।নামেই শুধু আম গাছ,কাজেকর্মে তো দেখি আস্ত একটা কাকগাছ!


আজ বহুদিনপর আমার আর্টের স্কুলের একটা বিকেলকে ধরতে গিয়ে এমনি কিছু বিচ্ছিন্ন পুলক জাগছে মনে।সেদিন অবশ্য এই অলস বালকের কোন ভাবেই পুলকিত হবার অবকাশ ছিলো না।বরং সেচ্ছাচারী শুক্রবারের বিকেলগুলোকে এভাবে অফিসিয়ালি মৃত ঘোষনা করার মৌন প্রতিবাদ হিসেবে হাঁড়ি মুখ করে বসেছিলাম দারোয়ানের বেঞ্চিতে।এই শেষকৃত্য অনুষ্ঠানের মূল পুরোহিত যিনি,আমার মা এই হাঁড়ি ভর্তি তীব্র প্রতিবাদকে দিব্যি রসমলাই বানিয়ে দিয়ে হাসিমুখে এক আন্টির সাথে খোশ গল্পে মেতে উঠেছিলেন।খানিক বাদে ঐ আন্টিও দেখি আমার দিকে তাকিয়ে রহস্যময় হাসি দিলেন।বলাবাহুল্য সেই হাসিতে আমি কোন স্বপক্ষ সমর্থন খুঁজে পাইনি,পেয়েছি "কাঁদে না খোকা সব ঠিক হয়ে যাবে" টাইপের সমবেদনা।

আমি যেখানটাই বসে ছিলাম তার বাঁ পাশেই খুব নিচু একটা গেইট।বড়রা সবাই অসহায়ের মত মাথা নিচু করে ঢুকছে কিংবা বেরুচ্ছে।হয়তো ছোটদের স্কুল বলে এই বিশেষ ব্যবস্হা।বড়দের স্কুলে যেমন বড় বড় গেইট, ছোটদের স্কুলে তেমন ছোট ছোট গেইট।পাশে বসা দাড়িঅলা বৃদ্ধ লোকটা কয়েকবার আমার সাথে খাতির জমানোর চেষ্টা করে এখন চুপ মেরে গেছে।কী বাবু?তোমার নাম কি?কোন কেলাসে পড়ো?
এই সব হাবিজাবি সবাই যা বলে আর কি!এমনতেই একটা প্রতিকী অনশনের মত চলছে।এর মধ্যে উটকো ঝামেলা!তাই আমি না শোনার ভান করে খানিকটা-আকাশ- আড়াল-করা আম গাছটার দিকে তাকিয়ে থাকলাম।বেশির ভাগ লোকজনই দেখি আমার নাম আগে থেকে বলে দেয়।যেমন এই দাড়িঅলা কি সুন্দর আমার নাম ধরে ডাকছে-বাবু। জানোই যদি আমার নাম "বাবু",তাহলে আবার জিজ্ঞেস করার মানে কি?লোকটা একটা পাতা কুড়িয়ে আমার সামনে ধরে বলল,

--"কন তো দেহি এইডার রঙ এমন হলুদ হইছে ক্যা?আগে তো সবুজ আছিলো? নাকি?"

--"বুড়ো হয়ে গেছে তো ,তাই হলুদ হয়ে মরে গেছে"

দাড়ির ফাঁকে মৃদু হেসে,
--"আমি তো বুড়া।আমার রঙ হলুদ হয় না ক্যা?"

--"আপনি তো পাতা না।তাছাড়া মরে গেলে আপনিও হয়তো হলুদ হয়ে যাবেন"

লোকটা দেখি এবার শব্দ করে হেসে উঠলো।দাড়ির ফাঁকে পান খাওয়া দাঁত দেখা যাচ্ছে।আমার দিদার দাঁতগুলোও এরকম দেখতে।লোকটার তারপরও শব্দ করে হাসতে থাকে।তার চোখের কোনে বিন্দু বিন্দু পানি জমছে।এ হাসি কান্নার মানে কি?
সশব্দ হাসির লোকগুলোকে আমার বিশেষ পচ্ছন্দ না।এ ব্যাপারে আমার কিছু ভয়ংকর অভিজ্ঞতাও আছে।আমি তাই একটা উঠি উঠি ভাব নিতে যাচ্ছি,এমন সময় দেখি মা বেরিয়ে আসলেন ভিতর থেকে,হাতে একটা খাতা আর রঙের বাক্স।পরে জেনেছি এ লাইনে এটাকে পেস্টেল কালার বলা হয়।তো বিবিধ উপায়ে এই রঙের বক্সের প্রতি আমার আগ্রহ তৈরী করার একটা সাময়িক এবং স্হানীয় প্রচেষ্টা চলল কিছুক্ষণ,এই প্রচেষ্টায় কিছু আগে চোখে পানি জমা হওয়া বৃদ্ধ এবং রহস্যময়ী হাসি-আন্টিও হেসে যোগ দিলেন।তাদের তীব্র চাপের মুখে আমি হাঁড়ি মুখ নিয়েই একটা ক্লাসরুমে প্রবেশ করলাম।এই ক্লাসের নাম নাকি "হাসিখুশি"।

বালকের আকাশদর্শণ-বায়োগ্রাফিমূলক ১

মা কে পাশে রেখে হুডতোলা রিকশায় আমি চোখ পাতি বাইরে।শুক্রবারের আসন্ন বিকেল।রাস্তা তো নয় যেন পিচ ঢালা ফুটবল খেলার মাঠ।তাই রিকশা চলছে দ্রুতলয়ে।এবড়ো থেবড়ো রাজপথ অভদ্রের মতো তার অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে প্রায়শ। ঘুম চোখেও আমি অস্হিমজ্জায় টের পাই তাদের সশব্দ এবং কর্কশ কথোপকথন।দীর্ঘ সাতদিনের এক আপোষহীন রুটিনের পরে এই শুক্রবারের বিকেলগুলো আমার জন্য দেবতার উপঢৌকনের মতো ছিলো।"যা খুশি কর্"-ব্যাপারটার মধ্যেও একটা সুক্ষ কারচুপি আছে বলে আমার বিশ্বাস।দেখা গেল প্রায় আমার এই সাধের ইচ্ছেমতন বিকেলে আমি বাবার কাঁধ জড়িয়ে পরম আনন্দে ঘুমিয়ে আছি।সেই সুত্রে ঘুমও একটা ব্যক্তিগত শখের ব্যাপার হতে পারে।যদি এমন একটা বহুজাতিক কোম্পানির চাকরী পেতাম যেখানে স্যুট-টাই পড়ে নটা-পাঁচটা ঘুমিয়ে থাকার জন্য মাস শেষে কড়কড়ে নোটে মাইনে দেবে।সাথে ফেস্টিভল বোনাস,মেডিকেল কেয়ার,ট্রান্সপোর্ট ফি সহ আরো কতও কী!!-আহা!!কী ঘুমবিলাস। তো এই ঘুম তাড়িত বৈকালিক সৌখিনতা সপ্তাহের অন্যান্য দিনগুলোতে আমার মার যথেষ্ট সৌজন্যবোধের অভাবে হরহামেশাই মুখ থুবড়ে পড়ে।পুত্রের ব্যক্তিগত শখের ব্যাপারে মার হয়তো আপত্তি নেই মোটেও কিন্তু এখনো দ্বিতীয় শ্রেণীতে অধ্যয়নরত নাবালকের ব্যক্তি হয়ে ওঠার ঔদ্ধত্যে তিনি মা হিসেবে কপালে শতকোটি বলিরেখা আঁকবেন,অত:পর প্রয়োজনবোধে নানাবিধ উপকরনসমেত (উদাহরনস্বরূপ-আমার রুলটানার স্কেল,ভাতের চামচ)তেড়ে আসবেন অশনী গতিতে-এটাই প্রচলিত সমাজের চিত্র।বলাবাহুল্য আমার মা এই চলচ্চিত্রের একজন সুদক্ষ কৌশলী।এছাড়া অন্যান্য সময়ে তিনি কলেজে রসায়ন পড়ান।এই রসায়ন বিষয়বস্তুটা যে কি পরিমান রস বিবর্জিত তা বোধকরি দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়ার বহুআগে থেকেই আমি হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করেছিলাম এবং উচ্চ মাধ্যমিক পড়ার সময় পুরাকালের উপলব্ধির সাথে ভুক্তভোগী বাস্তবতার একটা নান্দনিক মেলবন্ধন তৈরীর অবকাশ পাই।রসায়ন শিক্ষার অবসরে মা র নানাবিধ রাসায়নিক কর্মকান্ডে আমরা পরিবারের সবাই (এমনকী ক্ষেত্রবিশেষে বাবাও)বিক্রিয়ক হবার আশঙ্কায় তটস্হ থাকি সারাক্ষণ।বাবা গনিতের লোক।আটপৌরে,সাধাসিধে,কারো সাতে নাই পাঁচে নাই টাইপের বিশেষনগুলোর এক সাক্ষাত মুখপাত্র।সারাদিন দেখি ইংরেজী এ্যালফেবেট নিয়ে কি সব কাটাকুটি!!a আর b যোগ করলে কিভাবে c হয় এই চিন্তায় আমার প্রায় রাতে ঘুম হয় না অবস্হা।মাঝে মাঝে বড়োদের উপর বেজায় রাগ হয়।ওরা নিজেদের বেশি বেশি চালাক ভাবে।রসায়নবিদ হবার সুবাদে মাকে আমি কখনো দেখি নাই লম্বা চুলের বেনী দুলিয়ে সারা ঘরময় আনমনে গুন গুন করে বেড়াতে কিংবা আমার গনিতবিদ বাবাকে নাকের ডগায় চশমা ঝুলিয়ে কোন স্বাস্হ্যবান কবিতার বই হাতে সুনশান প্রশান্তমুখ।এহেন ডেডিকেটেড গনিত আর রসায়নের মিউচুয়াল আন্ডারস্টেন্ডিংএ আমার মতো নচ্ছার অলস মস্তিষ্ক উৎপাদিত হবার প্রবাবিলিটি এতোই ক্ষীণ যে মটরশুটিবিদ্যা অনুসারে আমার প্রপ্র-পিতামহের কাউকে না কাউকে অবশ্যই বাঈজী দলের সর্দার হতে হবে।

তো শুক্রবারের বিকেলে ঘুমানো ছাড়াও আরো একটি সাংঘাতিক গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো --বারান্দায় বসে আকাশ দেখা।সবাই যখন ঘুমিয়ে থাকে তখন আকাশের অনেক নিচে একটা পুকুর।পাড় ঘেঁষা রাস্তা-মানুষ।একটা কাঠমিস্ত্রির দোকান।ওদের অবিরাম ঠুক ঠাক।একটা কাঠের ফ্রেমে খোদাই করা অবিকল মানুষের মুখ।বাবা বলেছে উনি আমাদের দেশের প্রেসিডেন্ট ছিলেন একসময়। প্রেসিডেন্ট ছিলো বলে তার মুখ খোদাই করে রাখতে হবে?প্রেসিডেন্টের তো ভারী মজা!!অথচ লোকগুলো সারাদিন কি কষ্টটাই না করছে এই ফ্রেমের পেছনে?ওদের তো আরো অনেক কাজ থাকতে পারে-খাট পালং চেয়ার টেবিল আলনা শো কেস শেলফ আরো কত কি পড়ে আছে!এসব মন-খারাপে আমারও প্রেসিডেন্ট হওয়ার সাধ জাগে।পরে ওদের সবাইকে ডেকে বলবো-তোমরা তোমাদের কাজ করো।আমার মুখের ফ্রেম বানানোর কোন দরকার নেই!

মাঝে মাঝে অবশ্য শুধু আকাশ দেখেই কাটাতে হয়।আমাদের রেলিংটা আমার মাথার চেয়ে বেজায় উঁচু হওয়ায় পায়ের তলায় মোড়া ছাড়া আমি নিচের পৃথিবী দেখতে পাই না।তখন বাসার অনেকে মিলে টেলিভিশন দেখে,শুক্রবার বিকেলে টিভিতে সাদা কালো ছবি।তাই মোড়া খালি পাওয়া যায় না।অবশ্য আমার আকাশ সবসময় রঙীন থাকে।আমি মেঘ গুলোর যাওয়া আসা দেখি।কারো খুব তাড়া!!এই এলো এই চলে গেলো।কেউ কেউ খুব বড়ো।ওদের অতো তাড়া নেই।অনেকক্ষন তাকিয়ে থাকলে আমি ওদের মধ্যে চেনাজানা জিনিস পত্র দেখি।মনে হয় ওরা ইশারায় কিছু বলছে।কখনো ইশারা সহজ থাকে।কখনো কোন মাথা মুন্ডু খুঁজে পাই না।একটা পিঁপড়ের পেটে আস্ত বাঘ ঢুকে যাচ্ছে এটা নিশ্চয় খুব একটা ভালো ইশারা না।তারপরও আমি সায় দেই--"অ বুঝছি! বুঝছি!"
মেঘমানুষ!!পরে কি না কি মনে করে বসে?

কোন মৌসুমে আকাশে ঘুড়ির মেলা বসে।আহা! সে এক দৃশ্য বটে।এতো এতো ঘুড়ি।অথচ ঘুড়ির মানুষ দেখি না একটাও।কোন কোনটা মনে হয় আমাদের ছাদ থেকেই উড়ছে।আমার মনে হয় এই খেলায় মানুষের চেয়ে ঘুড়িই বেশী মজা পায়।আকাশের কাছ থেকে কেমন লাগে দেখতে?কিংবা মেঘগুলো থেকে আমাদের বাসা কেমন দেখা যায়?ঘুড়ি ওড়ানোর প্রতি আমার খুব একটা আগ্রহ দেখিনা কিন্তু ঘুড়ি হওয়ার খুব শখ আমার।গুনীজনে কি সাধে বলে-অলস মস্তিষ্ক শয়তানের কারখানা?

তো এই অলস মস্তিষ্ককে গতিশীল করতেই মার সহিত আমার দ্রুতগতির এই রিকশাভ্রমণ।আমার ইচ্ছে-বিকেল গুলোকে একটা সামাজিক রূপদানের মা-গত আরেকটি প্রয়াস।আমাদের গন্তব্য আর্টের স্কুল।

জন পেট্রিক শেনলির চলচ্চিত্র "দ্য ডাউট" এবং মেরিলের ঝুলিতে প্রায় তৃতীয়-অস্কার

কি ভেবে আজকে হিসেব কষে দেখলাম, ইহ-জীবনের একটা বৃহৎ অংশ জুড়ে আমি একটা ১৫ ইঞ্চি এলজি মনিটরের দিকে তাকিয়ে থেকেছি।
ভাবতেই কেমন এক বিষন্নতা গ্রাস করলো।আহা! পরিবর্তে কোন রূপসীর পানে এতো দীর্ঘ সময় নিবিষ্ট হলে হয়তো এই ভয়াবহ প্রতিযোগিতামূলক জগৎসংসারে এতো দিনে আমার একটা গতি(কিংবা দুর্গতি) হয়ে যেতো।ফিবছর ভবসংসারের নানাবিধ টানাপোড়েনে পেন্ডুলামের মতো ঝুলে থাকতুম না মোটেও। তো এই হতচ্ছাড়া ক্লীব পদার্থের সান্নিধ্যে আমার প্রিয়তম মূহুর্তগুলো কেটেছে কোন না কোন মুভি দেখে, বিটিভির ভাষায় যাকে বলে পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র।প্রথমেই আমি বলে নিচ্ছি পাঠক আমি আসলে একজন দ্বিতীয় শ্রেনীর সিনেমা দর্শক,যে কিনা এখনো প্রাণপনে প্রথম শ্রেনীতে উঠার চেষ্টা করে যাচ্ছে এবং বার বার ব্যর্থ হচ্ছে তার সাবকন্টিনেন্টাল ইমোশনের কারনে যা হয়তো পুরোটাই জেনেটিক বিদ্যার আশীর্বাদ।দ্বিতীয় শ্রেনীর দর্শক আমি তাদেরকে বলি যারা এখনো প্রিয় অভিনেতা-অভিনেত্রীর লিস্ট ধরে ছবি দেখেন এবং হরহামেশাই ভুলে থাকেন যে ছবিতে "ডিরেক্টর" বা "পরিচালক" বলে একটা মানুষ থাকে।পুরো ছবি জুড়ে যার আসা যাওয়া, পুরো রিল জুড়ে যে পুরোধার কষ্টের ঘাম লেগে থাকে।আমি নিজেও হরহর করে শ খানেক অভিনেতা অভিনেত্রীর নাম বলে দিতে পারি,কিন্তু ডিরেক্টরের বেলায় বারবার হাতের
কর গুনি।সাবকন্টিনেন্টাল ইমোশন হলো আমাদের এই এলাকার জনগোষ্ঠির একটা সানক্তকারী বৈশিষ্ট্য যার কারনে আমরা পর্দার মানুষগুলোকে খুব আপনার লোকজন বলে ভাবতে শুরু করি সে খেলোয়াড়ই হোক কিংবা অভিনেতা-অভিনেত্রীই হোক।পর্দায় ভালো লাগছে ব্যস!যথেষ্ট।তো আমিও নিজেকে এই দোষে দুষ্ট বলে মনে করি এবং প্রায় ঘুম থেকে চোখ মেলে দেখি কেট উইন্সলেট মাথায় ঘোমটা দিয়ে হাসি হাসি মুখ করে আমার সামনে চা হাতে দাঁড়িয়ে আছে।কিংবা আমার সারা ঘরময় গুন গুন করে রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইছে এলিসিয়া সিলভারস্টোন------"আমার মল্লিকা বনে যখন প্রথম ধরেছে কলি আমার মল্লিকা বনে......."ঠোঁটে লেগে থাকে সেই খুনী হাসি!!অথবা অদ্রে তুঁত আপাত দুর্বোধ্য ভাষায় আমার চুলে বিলি কেটে দিচ্ছে,হয়তো বলছে "কি দাড়ি কাটো না কেনো?"


যে ছবি নিয়ে লিখতে বসা তার নাম "দ্য ডাউট"।পাঁচটি বিভিন্ন নমিনেশন আছে এ ছবির নামে এবারের অস্কারে।এটা অবশ্য কোন কাজের কথা না কারন আমি রেফারেন্স ধরে ছবি দেখি না কখনোই।তার উপর এসব পুরস্কারদাতা এবং গ্রহীতাদেরকে প্রায় আমি বাঁকা চোখে দেখি,যেমন এবারো দেখবো চোখের সামনে দিয়ে "স্লামডগ মিলিনিয়ার" ঝুলি ভরে একগাদা অস্কার নিয়ে যাবার পর।কিংবা সেভেন পাউন্ডসের মতো ছবি যেখানে কোন নমিনেশনই পায়না।

"দ্য ডাউট" দেখতে বসা সুন্দর নাকের মানুষ মেরিল স্ট্রিপের খাতিরে যার অভিনয় দেখে প্রথম যৌবনেই মনে হয়েছিলো "কেনো আরো আগে পৃথিবীতে আসলাম না?" কিংবা "আমি যদি বেনজামিন বাটনের মতো সুদীপজামিন বাটন হতাম"।
"জন পেট্রিক শেনলি" এই নামটা আমার পিতৃদেব যেমন কোনদিন শোনেন নাই তেমনি ছবি দেখার আগে আমিও কোনদিন শুনি নাই।অথচ কি ভয়াবহ সুন্দর একটা ছবি উপহার দিলেন!গভীরতম অনুভূতি নিয়ে কি চুলচেরা চলচ্চিত্র!মূল উপন্যাসটা আমার পড়া নাই তারপরেও এরকম মাস্টারপিসের জন্য একটা জোরদার হাততালি পেতেই পারেন।আশাকরি অস্কার কমিটি তাকে নিরাশ করবে না।যদিও এ অভিজ্ঞতা তার নতুন নয়।

আফসোস লাগছে অপরাহ উইনফ্রের জন্য যিনি অনেক চেষ্টা তদবির করেও শেনলির মন গলাতে পারেন নি।মিসেস মিলার সত্যিকার অর্থেই তার জন্য লোভনীয় চরিত্র ছিলো।শেনলি নাকি তাকে স্ক্রিপ্টই পড়তে দেন নি।বেচারি উইনফ্রে!ভাইওলা ডেভিস অবশ্য মাত্র দুই দৃশ্যে অভিনয় করেই মাতিয়ে দিয়েছেন।বোঝেন তাইলে রোলটা কি ছিলো?

"ভেবে ভেবে কুল পেলাম না" অবস্হা হয়েছে নাটালি পোর্টম্যানের কথা চিন্তা করে ,কেন তিনি সিস্টার জেমস হতে রাজি হলেন না?যেখানে অ্যামি এডামস এইবেলা একটা নমিনেশনও জুটিয়ে ফেললেন।

হফমেনের ব্যাপারে আমার একটু এলার্জি আছে আগে থেকেই যেটা এই ছবির পরেও রয়ে গেছে।

আর অনবদ্য মেরিল স্ট্রিপ!বয়সের সাথে পাল্লা দিয়ে অভিনয় করছেন।"বৃদ্ধ বয়সে সৌন্দর্য্যে ভাটা পড়ে"----যতসব গাঁজাখুরি গপ্পো!!পুরো ছবিতে তার ব্যক্তিত্ব যেন ধারালো ছুরির মতো এফোঁড় ওফোঁড় করে দর্শক হৃদয়।শেষ দৃশ্যে তার অসহায় স্বীকারোক্তি----দাগ কেটে থাকবে বহুদিন।

আমি যদি অস্কার কমিটিতে থাকতাম এইবার (কী ছাইপাশ খেয়েছিস বল!!) এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতাম নির্ঘাত।আমার দুইজন প্রিয় মানুষ একই ক্যাটাগরিতে বেস্ট একট্রেস নমিনি।দ্বিতীয় শ্রেনীর দর্শক হিসেবে এক সাংঘাতিক কঠিন কাজ বটে!যদিও রিডারে কেটের পুরনো বদঅভ্যেস বশত: অবলীলায় বস্ত্রবিসর্জন আমাকে বরাবরের মতো বিব্রত করেছে।তদুপরি মন-খারাপ হই পরপর দুটো ছবিতে এমনতর স্যুসাইড দেখবার পর।কিন্তু অভিনয়ে আবারও ঘোর লাগে।আবারও মোহে পড়ি খুব সানন্দ্যে!