নীল, উষ্ণতম রঙ

সামনে পুরস্কারের মৌসুম; আসছে ক্রিটিক চয়েস, বাফটা, ইন্ডিপেনডেন্ট স্পিরিট, গোল্ডেন গ্লোব, অস্কার। যে ক'টার নমিনেশন ইতিমধ্যে ডিক্লেয়ার করা হয়েছে তাদের মধ্যে ফরেন ক্যাটাগরিতে একটা কমন নাম হলঃ Blue is the Warmest Color - চলতি বছরে সোদারবার্গ, পোলানস্কি, কোয়েন ব্রাদার্স, ফ্রাঙ্কোয়িস ওজোন, জিম জারমুশ কিংবা আসগার ফারহাদি'র সিনেমার সাথে পাল্লা দিয়ে পাম ডি'অর জিতে নেয়া সিনেমা।

পরিচালক - তুলনামূলকভাবে অখ্যাত আবদেললতিফ। দেখে শুনে যা মনে হচ্ছে আসছে অস্কারে Blue is the Warmest Color is gonna be the next Amour. ভালো করে খুঁজলে হয়তো Amour এর সাথে দুয়েকটা মিলও পাওয়া যাবে। যেমন - দুটো সিনেমারই মূল উপজীব্য হল দুইজন মানুষের মাঝখানে একটা আবেগঘন সম্পর্ক এবং তার টানাপোড়েন। অবশ্য এছাড়া আর কিছু মিল খুঁজতে যাওয়া অবান্তর হবে। কারন একটা হলো বুড়ো-বুড়ির প্রেম আর আরেকটা দুরন্ত লেসবিয়ান প্রেম!

লেসবিয়ান প্রেমের সিনেমা দেখতে ভালোই লাগে। মনে আছে শামীম শরীফের দুইটা সিনেমা দেখেছিলাম অনেক আগে। লিজা রে ছিলো। বেশ লেগেছিলো। কিন্তু একটা পর্যায়ে গিয়ে সিনেমাগুলো কিছুটা সিরিয়াস মেসেজধর্মী হয়ে যায়। লেসবিয়ানিজমের ফাঁক গলে তখন নারী স্বাধীনতা, নারীর অধিকার, নারী মুক্তি ইত্যাদি ঢুকে পড়ে। সিনেমা শিক্ষামূলক হয়ে উঠলে আর ভালো লাগে না। এর'চে ডকু ভালো।

সেই বিবেচনায় - Blue is the Warmest Color অনেক ভালো ছবি। কিন্তু আমার ধারণা - আমার নিজস্ব সাংস্কৃতিক সীমাবদ্ধতার কারনে এখনো সমকামী প্রেমের গল্প আর দশটা প্রেমের গল্পের মত অতো সহজ সাবলীলভাবে নিতে শিখে নি। আমার কাছে এটা বড়জোড় এক রাতের এডভেঞ্চার হতে পারে (আহা Room in Rome)। 


Blue is the Warmest Color -এ নীল রঙের একটা মৌন উপস্থিতি আছে। মৌন বললাম এ কারনে যে এই নীল রঙ নিয়ে সিনেমার কোথাও কোন আলোচনা নেই, কোথাও কোন কথোপকথন নেই। কেউ হঠাৎ বলে উঠে না যে - দেখো আজকের আকাশটা কী নীল! কিংবা জানো? আমার সবচে' প্রিয় রঙ কি?

অথচ পুরো সিনেমা জুড়ে নীল রঙ চোখে পড়ে সবসময়। বাসার দরজায়, দেয়ালে, বিছানার চাদরে, আঙুলের আংটিতে এমনকি প্রেমিকার চুলে! এডেল নামে যে মেয়েটির যৌনতা নিয়ে কাহিনী আবর্তিত হয়েছে নীল রঙের প্রতি তার বিশেষ দূর্বলতা লক্ষ্যনীয়। যদিও সে কখনো মুখ ফুটে সেটা বলে না। কিন্তু স্কুলে যে মেয়েটাকে তার বিশেষ ভালো লাগে সে নীল পাথর বসানো আংটি পড়ে। পরবর্তীতে যার প্রেমে হাবুডুবু খেতে খেতে অনেক ছেলেকে ফিরিয়ে দেয় তার মাথায়ও নীল রঙের চুল।

এডেল তখন সদ্য অষ্টাদশী। ক্লাসের সবচে' সুন্দরী মেয়ে। অনেক ছেলেই তার মনোযোগ প্রার্থী। অথচ পুরুষসঙ্গে তার দুনিয়ার অনাগ্রহ। কোন এক নীল নয়না, নীল কেশবতীকে ভেবে সে একান্তে মাস্টারবেড করে। প্রথমদিক মনে হয়েছিল এটা হয়তো একান্তই প্রথম যৌবনের কিউরিওসিটি প্রসূত ব্যাপার। কিন্তু পরবর্তীতে দেখা যায় - না; She is serious.

এমা'র সাথে এডেলের প্রথম আলাপ হয় একটা লেসবিয়ান বারে। সে আলাপ পরবর্তীতে বিছানা পর্যন্ত গড়ায়। এমা বয়সে বড়, অভিজ্ঞ; পেশায় একজন আর্টিস্ট। দুইজনের বিভিন্ন বিষয়ে কথোপকথন থেকে জানা যায় একমাত্র নারী শরীরের প্রতি আকর্ষন ছাড়া দু'জনের মধ্যে আর কোন বিষয়েই মিল নেই। এডেল পিকাসো ছাড়া আর কোন আর্টিস্টের নামই জানে না। এদিকে এমা কথায় কথায় সার্ত্রে কোট করে; বিভিন্ন দর্শন নিয়ে কথা বলে। এমা'র এই ব্যক্তিত্বের কাছে এডেল সবসময় কেমন যেন ক্ষুদ্র হয়ে থাকে। সে কিছুতেই এমা'র কিংবা এমা'র বন্ধুদের আড্ডায় অংশ নিতে পারে না।

এডেল একসময় ওর বাবা-মা'র বাসা ছেড়ে এমা'র বাসায় উঠে আসে। কিন্তু, তখনো সবার কাছে বিশেষ করে বাবা-মা'র কাছে নিজেকে লেসবিয়ান বলে পরিচয় দিতে সে অস্বস্তিতে ভোগে। একবার তো স্কুলে আরেকটি মেয়ের সাথে প্রায় মারামারিই বাঁধিয়ে ফেলেছিলো যখন মেয়েটি এডেলকে সবার সামনে লেসবিয়ান বলে গালি দেয়। এমা'র বন্ধুরা অবশ্য অনেক খোলামেলা। অধিকাংশই তার মতো আর্টিস্ট কিংবা শিল্পী সাহিত্যিক। তারা এডেলকে খুব স্বাভাবিকভাবেই নেয়।

এমা'র পুরনো প্রেমিকা ফিরে এলে এডেল ও এমা'র মাঝে দূরত্ব তৈরি হয়। এডেল তখন কিছুটা অবহেলিত বোধ করে। যার পরিনতি ঘটে বিচ্ছেদে। শেষপর্যন্ত এডেলকে এমা তার বাসা থেকে বের করে দেয়। এডেল ছোটদের একটা স্কুলে চাকরি নেয়। কিন্তু বিচ্ছেদের বেদনা তাকে পিছু ছাড়ে না। নীলাক্ষী এমাকে সে কিছুতেই ভুলতে পারে না।

সবচে' ভালো লেগেছে এডেলের অভিনয়। তার চোখ-মুখের অভিব্যক্তিতে, উস্কোখুস্কো চুলে সদ্য যৌবনে পা দেওয়া মূল চরিত্রটা প্রায় নিবিড়ভাবে ফুটে উঠেছে। অনেক সমালোচক তো তাকে ইতোমধ্যেই ২০১৩-এর শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর মুকুট পরিয়ে দিয়েছেন।

সিনেমার একটা খারাপ দিক হলো - এডেল এবং এমার শরীরী অন্তরঙ্গতার দৃশ্যগুলোর কোন ভালো ইন্ট্রো নেই; হঠাৎ করে কাটপিসের মত শুরু হয়। তখন দৃশ্যগুলোকে আরোপিত মনে হয়, অপ্রয়োজনীয় মনে হয়। মনে হয় পরিচালক বুঝি বাণিজ্যিক চাহিদা মেটানোর ধান্দা করছেন। আরেকটা দৃষ্টিকটু ব্যাপার হলো - এডেল এবং এমা দু'জনের পুরো শরীরই অত্যন্ত পরিপাটিভাবে waxed দেখানো হয়েছে। পর্নোগ্রাফির আর্টিস্ট ছাড়া এরকমটা সচরাচর দেখা যায় না। এর মধ্যেও তাই সস্তা বাণিজ্যের অনুষঙ্গ খুঁজে পেয়েছি।  

সিনেমাটা দেখার পরে আমার মনে হয়েছে এটা অবলীলায় একটা নারী-পুরুষের প্রেমের গল্প হতে পারতো।পরিচালক মূলতঃ দেখাতে চেয়েছেন - যে কোন সম্পর্কই আসলে টিকে থাকে ইন্টেলেকচুয়াল মিল মহব্বতের উপর। শুরুতে শারীরিক মোহ থাকলেও সেটা হয় ক্ষনিকের জন্যে। তাহলে কেন এই লেসবিয়ানিজম? - জানি না। আখেরে হয়তো এতে কাটতি বাড়ে। ক্রিটিকদের একটু বেশি বাহবা মিলে কিংবা কে জানে হয়তো দুটো পুরস্কারও বেশি জোটে।
------------------------------------------------------


তোমাকে বলিনি কিছুই

তোমাকে বলিনি কিছুই



তোমাকে বলিনি আমি
আমার চোখের কোণে একটা হলুদ অনিদ্রার নদী, 
সারা গায়ে অসহ্য রাতের গন্ধ,   
পায়ে পায়ে জেগে আছে 
নির্ঘুম বনাঞ্চল।
তোমাকে বলিনি অলস ছুটির দিন 
শীত ও কুয়াশার সাথে উড়ে উড়ে 
দেখেছি ঘুমন্ত সারসের মুখ
মাঝরাতে বিছানায় উঠে বসে
দেখেছি দেয়ালের পিঠে ভোর, 
প্রিয় মানমন্দির আমার।
অপত্য স্নেহের ঘুম বলিনি কখনো
জাগ্রত কপালে হাত রেখে 
বলিনি- তিতিরের খুব জ্বর 
কী ভয়ংকর দুঃস্বপ্ন দেখে
দৃষ্টিহীন হয়ে গেছে চোখ!
তোমাকে বলিনি অতল জলের ঘ্রাণ, 
ডুবো জাহাজের মত চুপ করে 
রেণু চলে গেছে 
গত সোমবারে
এই বিষণ্ণ, মলিন ভোরের আলোয়
বাস্তবিক কিছুই বলিনি তোমাকে, 
বলিনি পায়রার খোপে এমন বিরল ঘুম 
বহুদিন আসেনি আমার।

গৌতম হালদারের সিনেমা - ভাল থেকো

গৌতম হালদারের সিনেমা-ভাল থেকো


সিনেমাটা বেশ পুরনো; প্রায় বছর দশ আগের। মাঝে মাঝে হয় না এরকম? - র‍্যানডমলি দেখতে বসে পুরনো একটা সিনেমা হঠাৎ খুব ভালো লেগে গেলো। "ভাল থেকো" আমার কাছে তেমন-ই ভালো লাগা একটা সিনেমা। একটা শুনশান বিকেলে অলস ছুটির দিনে ভাতঘুমের বদলে কানে হেডফোন গুঁজে বিছানায় শুয়ে শুয়ে "ভাল থেকো" দেখা হলো। সিনেমাটার মধ্যেও কোথাও যেন একটা স্নিগ্ধ আলসেমি লুকিয়ে আছে। কিছু মন কেমন করা অনুভূতি সারাক্ষণ তাড়িয়ে তাড়িয়ে বেড়ায়। গৌতম হালদারের আর কোন সিনেমা দেখি নি আগে। কিন্তু "ভাল থেকো"র এক্সপেরিয়েন্স থেকে মনে হয় তাঁর অন্য কাজগুলোও হয়তো খারাপ লাগবে না। "মুক্তি" নামে আরেকটি সিনেমা'র কথা শুনেছি বটে। কিন্তু যথেষ্ট আগ্রহ নিয়েও খুঁজে পাচ্ছি না কোথাও।


ভাল থেকো'র কাহিনী খুব সাদামাটা। লীনা গঙ্গোপাধ্যায়ের উপন্যাস অথবা গল্প - কিছু একটা অবলম্বনে নির্মিত। টিপিক্যাল মধ্যবিত্তের ইন্ট্যালেকচুয়াল টানাপোড়েন। পরিবারের একদা সবার খুব আদরের বড় মেয়ের পয়েন্ট অব ভিউ থেকে দেখা - তার স্যাক্রিফাইস, আপনি এসে পড়া দায়-দায়িত্ব, একা থাকা, অনেক বয়েস অব্দি বিয়ে না হওয়া, অতি ভালো মেয়ে হয়ে থাকার বঞ্চনা ইত্যাদি আবেগঘন অথচ বহুল বিদিত বিষয়। আমরা অনেকদিন আগে "মেঘে ঢাকা তারা"তে এগুলো সব দেখে ফেলেছি। ফিন্যানসিয়াল ক্রাইসিসটুকু বাদ দিলে "মেঘে ঢাকা তারা"র নীতা আর "ভাল থেকো"র - আনন্দী (বিদ্যা বালান) আসলে দুই যমজ বোন। এনারা শিক্ষিতা, বুদ্ধিমতী, দায়িত্ববতী, স্বাধীন নারী।  কিন্তু জীবনের একটা পর্যায়ে এসে তারা বোধ করতে শুরু করেন যে তারা আসলে বড্ড ঠকে গেছেন - সমাজের কাছে, পরিবারের কাছে, দাদা'র মেধাবী বন্ধুর কাছে, পুরনো প্রেমিকের কাছে, এমনকী ছোট বোনের কাছেও। এখানে লক্ষ্য করার মত বিষয় হলো - তাদের ছোটবোন গুলো অধিকাংশ সময় একটু বেপরোয়া গোছের হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায় তারা কোন এক ধনীর দুলাল টো-টো কোম্পানি'র সাথে জুটে গিয়ে ঠিক-ই নিজের জীবন গুছিয়ে নিয়েছেন। এদিকে বড় বোনের কপালে জোটে লবডঙ্কা। মধ্যবিত্ত আদর্শের সাদা ফুল খোপায় গুঁজে তারা রাত জেগে জয় গোস্বামী পড়েন আর রবীন্দ্রনাথ গান। "ভালো থেকো"র আনন্দী অবশ্য পড়েছেন  হুমায়ূন আজাদ। বাকি লেখা পড়তে পড়তে কবিতাটা শুনে ফেলতে পারেন। কথা দিচ্ছি ঠকবেন না।




কাহিনীতে আরো আছে একটা লোক খেদানো পাগল এবং একজন নকশাল কম্যুনিস্ট দাদা! ব্যস হয়ে গেলো! এরপর পশ্চিম-বাংলার একটা গল্প দাঁড় করাতে আর কী লাগে? এরপর তো গল্পের গরু এমনিতেই গাছে গাছে দৌড়ুবে।

কাহিনীর বাইরে সিনেমাতে আর যা যা আছে তার সবই অসাধারন। অধিকাংশ সময়ই পুরো স্ক্রিন জুড়ে থাকে প্রচুর সবুজ রঙ। গঙ্গার ধারে একটা পুরনো দোতলা বাড়ি। জানলার ফাঁক গলে যে বাড়িতে ঢুকে পড়ে নদীর বাতাস। অক্লেশে উড়িয়ে নিয়ে যায় জানলার পর্দা, বিছানার চাদর। শুকনো পাতারা তখন ঝাঁক বেঁধে উড়ে আসে।

কিছুক্ষণ পর পর দূরে কোথাও স্টিমারের শব্দ। কিছুক্ষণ পর পর বৃষ্টি; বাতাস। জানলার খিড়কি সশব্দে খুলে পড়ে। চাতালে অনেক গাছ পালা, ফুল। সবাই বৃষ্টিতে ভিজে একশা।

আবার এক পশলা বৃষ্টির পরে খুব স্নিগ্ধ চারপাশ। খালি পায়ে ছাদের পানিতে হেঁটে হেঁটে যাওয়া। অনেক দূরে নদী..., নৌকা...; দড়িতে মেলে দেয়া মা'র ভেজা শাড়ি- তাকে গায়ে জড়িয়ে ধরে হিমেল স্নেহের পরশ।

উড়ে আসা কৃষ্ণচূড়া ফুলে দোতলার বারান্দাটা ছেয়ে থাকে। বারান্দা থেকে নিচের বাগান দেখা যায়। তার মাঝখানে ছোট রাস্তা এঁকে বেঁকে চলে যায় বাড়ির সদর দরজার দিকে। খুব ভোরে পাখিদের কোলাহল আর জ্যাঠা মশাইয়ের (সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়) রেওয়াজের সুর। আহা!

এইসব কিছু'র নাটের গুরু যিনি, তাঁর নাম - অভীক মুখোপাধ্যায়। তিনি সিনেমাটোগ্রাফার। এই সিনেমার জন্য ন্যাশনাল এওয়ার্ড পেয়েছিলেন। বলে রাখা ভালো - "অন্তহীন"-এর সিনেমাটোগ্রাফারও উনিই ছিলেন। অন্তহীনের সেই সব শট নিশ্চয়ই সহজে ভুলে যাবার নয়। ভালো লেগেছে ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর - মেলানকলিক এবং প্রাসঙ্গিক।

সিনেমাতে বৃক্ষ, গুল্ম   , লতা-পাতা, ফুল সর্বোপরি নিসর্গের উপস্থাপন চমৎকার। গাছ নিয়ে কিছু দার্শনিক আলাপ আছে। ঝিনুক (আনন্দী'র ছোটবোন) যখন ওর বর আর ছেলেকে নিয়ে বাপের বাড়ি বেড়াতে আসে তখন বুড়ি'দি (বুড়ি-আনন্দী'র ডাক নাম) এর জন্য নিউ মার্কেট থেকে একটা চারা গাছ নিয়ে আসে। পরে দেখা যায় গাছটা আসলে আর্টিফিসিয়াল - ঝিনুকের খুব এম্বিশাস জীবনের মত।

ঝিনুকের কবি বন্ধু দীপ (পরমব্রত) যে লুকিয়ে বুড়ি দি'কে নিয়ে কবিতা লিখে, ওর জন্মদিনে ফুল উপহার দেয় সেও গাছ ভালোবাসে, গাছের ছায়া ভালোবেসে, গাছের সঙ্গে কথা বলে।

বুড়ি'র জন্মদিনে সবাই হৈ-হুল্লোড় করে গাছের চারা রোপন করে। সাথে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা।

ছবির নির্বাক দৃশ্যগুলোতে বাতাসে গাছের পাতার শন-শন শব্দ শোনা যায়। সেই শব্দ, ডাল-পালার নড়া চড়া সব মিলিয়ে কেমন একটা জীবন্ত আবহ তৈরী করে। পরে উইকি ঘাঁটতে গিয়ে দেখলাম নদীর ধারে যে বাড়িতে শ্যুটিং হয়েছে সেটা আসলে আচার্য্য জগদীশ চন্দ্র বসু'র বাড়ি! বোঝো অবস্থা!!
-----------------------------





রেইন মেকার

রেইন মেকার


বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা নিয়ে 
উড়ে গেছে বিভল ডানার প্লেন। 
তার উড়ালদৃশ্যের ভেতর শুধু মাশরুম মেঘ। 
বিপন্ন জলবায়ু। 
প্রতারক বৈমানিক ভুলে গেছে দ্রাঘিমার দাগ। 

একজন উইন্ডো সিটের হরিণী খুলে ফেলছে নাকফুল; 
ক্লাউডে-ক্লাউডে গুঁজে রাখছে সব জরুরী আপডেট। 
সবুজ এক্রোফোবিয়া জেগে উঠছে উৎকন্ঠার কোণে।
উচ্চতার প্রসঙ্গে এসে
থেমে আছে আমাদের মৃদু আলাপচারিতা,
বৃষ্টিস্নাত স্মল-টক।
-----------------------------

?

?


তুমি আছো বলে,পানপাত্রের হাতল, 

এখনও মুষ্টিবদ্ধ করার কিছু পাই জীবনে। 

এও তো সুতীব্র অর্জন এক।

আমার মত অনুগত সিটিজেন 

পতাকা আর পেনিস ছাড়া 

কবে কী ধরেছিল মুষ্টিতে? 
------------------------------------------


ক্লাস মিস দিয়ে

ক্লাস মিস দিয়ে


এই যে ক্লাস মিস দিয়ে অন্ধকারে শুয়ে আছি

- এটা ভালো লাগছে। 

ভালো লাগছে আলো-আঁধারি, 

আসি আসি ঘুম, 

হরিণ শিকারের ছবি! 

এই যে ল্যাপটপ থেকে একটা মিহি সাদা আলো 

বেড়ালের মত নিঃশব্দে বেরিয়ে এসে 

শুয়ে পড়েছে আমার গা ঘেঁষে, 

এটেন্ডেন্স শিট থেকে তার নাম কাটা গেছে। 

তার অনুপস্থিতি'র ভেতর কেবল ঝিনুক-এর দোকান;

প্রিয়তমা পর্নস্টার 

বান্ধবী'র প্রক্সি হয়ে আসে।  

ফলে ক্রমশ ওপেন হয়ে পড়ে 

আমার চিন্তার করিডর।

ক্লাস মিস দেয়া এক ঐকান্তিক অন্ধকারে

হাজার মাইল পথ পড়ে থাকে পালাবার। 
-----------------------------------------------
ফুটনোটঃ
মাঝে মাঝে মনে হয়, বর্তমান দিনে কিংবা আগামী দিনগুলোতে আমার কিছু করার নেই, কোথাও যাবার নেই। ফলে অতো তাড়াতাড়ি কিংবা হেঁটে হেঁটে  কোথাও পৌঁছুবার প্রশ্ন নেই। পৌঁছে অনেকক্ষণ বসে অপেক্ষা করার মত কোন ব্যাপার নেই। বিবিধ অত্যাশ্চর্য বিফলতা' কথা না হয় বাদ-ই দিলাম। অথচ এই বিখ্যাত অনুভূতিটার অর্থাৎ ক্লাস মিস দিয়ে অন্ধকারে অলস শুয়ে থাকার কোন একটা নিবিড় জুতসই নাম খুঁজে পেলাম না আর। 
---------------------------------------------


সংবিগ্ন পাখিকুল

মহীনের ঘোড়াগুলি'র অনেক গানের সাথে আমার ভালো সময় কেটেছে। তার মধ্যে 'সংবিগ্ন পাখিকুল'  একটা। যেকোন প্রিয় জিনিসের সাথে যেমন অনেক সুখ-দুঃখের স্মৃতি জড়িয়ে থাকে, তেমনি এই গানটাও সবসময় আমাকে একটা ফেলে-আসা-সময়ের কথা মনে করিয়ে দেয়। 

গানটা'র সবচে' সুন্দর অংশ হল তার ভয়ংকর আধুনিক লিরিক। পাশাপাশি কম্পোজিশনেও কোথাও একটা অদ্ভুত বিষন্নতা লুকানো আছে বলে মনে হয়। একদিন আইবিএ হোস্টেলের রুমে নানাবিধ হট্টগোলের মাঝে গিটার নিয়ে বসা হল ঋত্বিকের সাথেঃ 
  
  

—————————————————————
G                                                                       Dm     
রানওয়ে জুড়ে পড়ে আছে শুধু কেউ নেই শূন্যতা
G                                        Dm
আকাশে তখন থমকিয়ে আছে মেঘ
F                             C         A                                  Dm
বেদনাবিধুর রাডারের অলসতা- কিঞ্চিৎ সুখী পাখীদের সংবেগ।


A                                Dm 
এমন বিশাল বন্দরে বহুকাল
A                                        G
থামেনি আকাশবিহারী বিমান যান
A                                     Dm  
এখানে ওখানে আগাছার জঞ্জাল
A                                  G
শূন্য ডাঙায় বায়ু বীতগতিবেগ
F                                          A
এমন ছবিতে কিশোরী মানায় ভালো
C                A                        Dm
ফ্রকে মুখগুঁজে কাঁদে চুল এলোমেলো।

A                                    Dm
চারণ দেখেছে এই ছবিখানি তাই
A                                   G
হৃদয়ে জমেছে শূন্যতা উড়ু মেঘ
A                                      Dm
চারণ ভোলেনা এই ছবিখানি তাই
F                                     G
বড় মায়া লাগে বড় তার উদ্বেগ
C                                        A
আকাশে তখন ঝড় এসে যাবে বলে
A                      Dm
থমকিয়ে আছে মেঘ।


মিটিং টেবিলের ওপাশে

মিটিং টেবিলের ওপাশে



ওপাশে কেউ নেই
ওপাশে দেরি হবে।
ট্রাফিকে.. ছোট মেয়েটা'র স্কুলে..
ওপাশে আরো সময় লাগবে।
ওপাশে ড্রাইভার ছুটিতে..
তাই দেরি হবে।
মিটিং শুরুর প্রাক্কালে 
ওপাশে ইউথেনেশিয়া।  

অপেক্ষালীন দর্শকের চোখ 
ওপাশে গুলশান গুলশান! 
বাইরে তাকিয়ে দেখে 
পাছা প্যানোরমা।

দক্ষিণ দিকের বায়ুপ্রবাহ এসে
ওপাশে উড়িয়ে দিচ্ছে মিটিং এজেন্ডা।
চেয়ারের হাতলে 
ফুটে আছে মালতীর ফুল, 
থোকা-থোকা অনুপস্থিতি।   
ওপাশের নীরবতা চুরমার করে  
বড়জোড় এক কাপ কফি চাওয়া যায়।
বিরক্তির স্ফুটনাংকে উত্তপ্ত
এক কাপ মেরুন কফি।
-----------------------


এন্ড্রোমিডা



অনন্তকাল এখানে থাকতে আসি নি। 
বিপন্ন রাত পোহালেই চলে যাবো
তোমার বিউটি বোনের বিন্যাস ভুলে, 
লিপি লাবণ্য ভুলে, 
পুরনো বন্ধুর হাত ধরে চলে যাব। 

শিউলি ফুলের হাসি দেখো
ক্যালেন্ডারে লেগে আছে উজ্জ্বল।
বৃদ্ধ টিকটিকি'র দল
এখনো জুতোর বাক্সে খুটখাট।


শিশুর মত অভিমান নিয়ে চলে যাব।


অভিনব চিন্তার সারস ভুলে
এমন উত্থান রহিত হয়ে
অনন্তকাল এখানে থাকতে আসি নি।
তার চে' ভালো অকাল প্রয়াত হবো।
প্রিয় পরিসর ছেড়ে বিজনে, 
আরো বিজনে যাবো। 
------------------------------------------


গভীর সমুদ্র বন্দর

গভীর সমুদ্র বন্দর


'দিন হলো একটা নিঃসঙ্গ গাঙচিল আমাদের ভ্যান্টিলেটরে বাসা বেঁধেছে। সেই থেকে দেখছি তার তীক্ষ্ম নখে আয়না'র মত বিঁধে গেছে শহরের সমস্ত মনোযোগকথোপকথনের জ্যামিতি। বিশেষ করে এমন বর্ষার মৌসুমে যখন অফিস ছুটির পরে কারুরই তেমন কিছু করার থাকে নাতখন এই আগন্তুক গাঙচিলটি যেন সবার জন্যে একটা প্রাঞ্জল উপলক্ষ্য হয়ে ওঠে। ইদানীং অনেকেই যেমন দলবেঁধে তার গল্প শুনতে আসে। অনেকেই আবার আসে না।
শুনেছি নিঃসঙ্গ গাঙচিল প্রতিরাতে একটা গভীর সমুদ্র বন্দরের গল্প বলে। যে গল্পে শালিকের চোখে দীর্ঘ শীতকাল ঘুরে বেড়ায়। যে গল্পে অতল জলরাশি এসে ভিড় করে দরজার কাছে, গহীন ঝাউবনে; মা নীলতিমি ঘুমিয়ে পড়ে শামুকের গহ্বরে। যে গল্পে গভীর সমুদ্র বন্দরেরও পত্রমিতা থাকে। তার নীল খামে লেখা থাকে নির্জনতানভোচারী'র মত একাকী বেঁচে থাকার অনুপম সব মেথডোলজি। 
সমুদ্র পাড়ি দেয়া নিঃসঙ্গ গাঙচিল হায়! তার মুখে এই সব শুনে শুনে আমাদেরও চোখ চকচক করে উঠে। এক আশ্চর্য, দুর্লভ জনহীনতা আমাদের মনে প্রচন্ডভাবে জেগে থাকে। কাউকে কাউকে ডুকরে কাঁদায়। 
-------------------------------------------


বড়ছেলে

বড়ছেলে


মনে রেখো ঘাস-পাতা,
কী বিরলপ্রজ সন্ধ্যায়
এসেছিলো তোমার আত্মীয়রা।
আড়িপেতে বসেছিলো
এখানে সেখানে
আমাদের প্রত্যহ
মন-কেমনে'র পাশে।
মনে রেখো ভাত ঘুম
প্রিয় ইষ্টি-কুটুম
এসেছিলো...
এইতো গত বুধবারে।
মিষ্টি(?) সব অনুযোগ সাথে করে
এনেছিলো অবেলায়।
বলেছিলো উচিত কথা
টেলিফোনে এটা সেটা -
বড়ছেলে,
তুমি কবে বিদেশ যাবে?
অনেক তো বয়েস হলো
একশো, দু'শো?
না কি সহস্র বছর?
তুমি আর কবে বিদেশ যাবে?
সহপাঠী যারা ছিলো
সবাই যে গেছে;
চুলোয় তো আর যায় নি
যা হোক একটা বিদেশ গেছে।
তুমি দেবালয়ে না যাও,
বিদ্যালয়ে না যাও,
মিছিল, মিটিং
কোন যুদ্ধে না যাও
অন্ততঃ একটা বিদেশ তো যাও!
শুন্য মাঠের মাঝখানে
স্থবির দাঁড়িয়ে থেকে
আর কতকাল কাটাবে, বড়ছেলে?
দ্যাখো কার্নিশে চড়াই নেচে নেচে বলে,
বৃষ্টি'র রিনিঝিনি বলে;
তোমার ফালতু কবিতা'র বই বলে-
"বড়ছেলে, তুমি কবে বিদেশ যাবে?
কবে?
কবে?
কবে?" 




-------------------------------








এলবাট্রস

এলবাট্রস


আমি তোমার অপরিচিত হতে চাই।
খুব অপরিচিত কেউ।
হঠাৎ কোথাও দেখা হয়ে গেলে 
কিছুতেই মনে পড়বে না এমন। 
ক্যাফেতেআড্ডায়ঝুল বারান্দায়
তোমার সুদূরতম দেজাভুঁ-তে
আমি নিছক অপরিচিত হতে চাই।

হয়তো আমাদের অহরহ প্রথম দর্শন হবে।
প্রথম দর্শনে প্রতিবার 
নতুন করে প্রেম হবে,
নিশ্চুপে দৃষ্টি বিনিময় হবে।
আগ বাড়িয়ে প্রথম কথাটা 
দু'জনের-ই খুব বলতে ইচ্ছে হবে।
তবুও সারাটাদিন রোদমাখা টই-টই শেষে
দীর্ঘ, ক্লান্ত চুম্বনের প্রাক-মুহুর্তে
আমি তোমার অপরিচিত-ই হতে চাই।

তুমি হয়তো একবার আলিয়াঁস ফ্রঁসেজে ভর্তি হবে।
একবার আমার প্রতিবেশী হবে।
আরেকবার ফেসবুকে 
অথবা জানি না 
হয়তো কোন বন্ধু'র ছোট বোন হবে।

তবুও ঐ দূরগামী জাহাজের কাছে 
জলছুট এলবাট্রসের মতন
আমি তোমার অপরিচিত-ই হতে চাই।

খুব অপরিচিত কেউ।
----------------------------

তোর হাসির শব্দে

তোর হাসির শব্দে


তোর হাসির শব্দে প্রায়ই SMS আসে।

গ্রামীনফোনের নেটওয়ার্কে ঢুকে পড়ে 

এক ঝাঁক প্রসন্ন পেঙ্গুঈন।

একটা দুঃখী সেলফোন নাম্বারে 

রাজধানী উড়ে উড়ে 

তোর কথা'রা ভেসে আসে।

নিমীল ভিড় করে আমার দেয়ালে,

আঙুলের ফাঁকে,

ফিসফাস বইয়ের পাতায়।

দেখি, তোর খেয়ালি নখের দাগ আমার হাতে

কেমন স্মাইলি'র মতন লেগে থাকে!

দেখি, তোর টুক-টাক ঈশিতায় 

কেমন ডুবে যেতে চায়

আসমুদ্রশহর!
 ------------------------


স্কাই-লাইনে

স্কাই-লাইনে


'দিন ধরে জ্বর। 

সিগারেট খেতে পারছি না। 

তেতো মুখ।  

বিস্বাদ। 

বাসায় আসবে 

ঝুমকো লতা ডাক্তার।

থার্মোমিটারে তাপ নিয়ে যাবে

রেখে যাবে নিক্কন

মিষ্টি সুঘ্রাণ

দেখে যাবে মেঘ

স্কাই-লাইনে

দূরে।



আহা ঝুমকো লতা ডাক্তার

ঠিক ঠিক জেনে যাবে 

কোথাও হয়তো বৃষ্টি হচ্ছে।


খুব বৃষ্টি হচ্ছে। 
--------------------





মেসোকিস্ট

মেসোকিস্ট


কোন এক রৌদ্র মুখরিত দিনে
তুমি দেখোআমি ঠিক-ই আগুন লাগাবো বনে।
ভার্মিলিয়ন লাল নিয়ে তোমার চারধারে
এঁকে দেবো লক্ষন-রেখা।
মহাশূন্যের সাথে বিচ্ছিন্ন করে দেবো সমস্ত যোগাযোগ।

তুমি জানবে না,
তোমার শাড়ির ভাঁজে লুকিয়ে রাখবো মাইন;
খোপায় গুঁজে দেবো ককটেল।
তোমাকে ছুঁতেই বিস্ফোরিত হবে চরাচর।
পুড়ে খাক হবে ছায়া সুনিবিড় পতিগৃহ।

বিশ্বমন্দায় চাকরি হারাবে তোমার বর।
সাতাশটি শ্রাবণ বুকে নিয়ে তুমি শুধু অনুতাপী হবে।

তুমি জানবে না
তোমার স্তনাগ্রে লেপে দেবো এমন তরল বিষ।
নাভিমূলে ফোটাবো ভেনাস ফ্লাই-ট্র্যাপ।
কোন রৌদ্র মুখরিত দিনে, তুমি দেখো? 
আমি ঠিক-ই আগুন লাগাবো সংসারে।
সাতাশটি শ্রাবণ বুকে নিয়ে তুমি খুব অসুখী হবে

একা হবে।
--------------



Womb

Womb নানা দিক থেকে একটা বাজে সিনেমা। Womb এর কাহিনী-বয়ান চোখে পড়ার মত ধীর গতির। কাহিনী যা আছে তাও Incest এর চূড়ান্ত। IMDB Womb কে রেটিং করেছে 6.2/10. পচা টমেটো বলছে 3.1/5. আমি Womb কে রেটিং করেছি যথাক্রমে 9 এবং 4.5/5. তার মানে দেখা যাচ্ছে আমার কোন সিরিয়াস সমস্যা আছে। আমি যা উপভোগ করছি, এই পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ তা করছে না। হয়তো পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ যা উপভোগ করছে, আমি তা করছি না।
-Womb এ ভালো লাগার এমন কী আছে?
-আমি জানি না।
-কিভাবে বুঝলেন যে ভালো লাগছে?
- এ পর্যন্ত Womb আমি প্রায় আড়াই বার দেখছি। সাধারনত যে সিনেমাগুলো আমি খুব আগ্রহ নিয়ে একাধিকবার দেখি, আমি ধরে নিই সেগুলো আমার ভালো লাগছে। অপ্রসঙ্গে বলা যায় – আমার সবচে বেশি বার দেখা সিনেমা Kill Bill. একটানা পুরোটা না দেখলেও এখনো অবসরে আমার একটা প্রিয় কাজ হল Kill Bill দেখা। সাম্প্রতিকসময়ে দেখা এরকম আরেকটি সিনেমা হল কিয়েস্লাউস্কির- A short film about love. অনেকদিন আগে দেখলেও Womb এর কথা আমার এখনো স্পষ্ট মনে আছে। অনেক সিনেমা দেখলে যেটা হয়, গড়পড়তা সিনেমা গুলোর কথা মনে থাকে না। যেহেতু আমি Womb এর কথা এখনো ভুলি নাই, তার মানে Womb আমার ভালো লেগেছিল। Womb এর ডিরেক্টর বেনেডিক-এর আর কোন সিনেমা আমি দেখি নাই। আমি খুব অবাক হবো না যদি দেখি তার কোন ফাইন আর্টসের ব্যাকগ্রাউন্ড থাকে। ক্রেডিট লাইন থেকে শুরু করে সিনেমার সবকিছু-সিনেমাটোগ্রাফি/ দৃশ্যবয়ান ইত্যাদি মারাত্মক নান্দনিক, স্মার্ট এবং সংযমী। বোঝা যায় অনেক যত্নের ছোঁয়া আছে।
প্রিয় ডিরেক্টর, প্রিয় অভিনেতা, প্রিয় অভিনেত্রীর সিনেমাগুলো সবসময় ওয়াচ লিস্টের উপরের দিকে থাকে। যথারীতি Womb দেখতে বসেছিলাম Eva Green এর জন্যে। আমার একটা প্রকট সমস্যা হলো – যাবতীয় প্রিয় বিষয়াদির ব্যাপারে আমি অত্যন্ত পক্ষপাতদুষ্ট। এবং সচেতনভাবে আমি এটাকে কাটিয়ে ওঠার কোন চেষ্টা করিনা। Loser আর কাকে বলে? তাই, ইভা গ্রিনের সিনেমা আমার ভালো লাগবে না এটা হতে পারে না। আহা! Perfect Sense!
Womb এ প্রচুর লং শট আছে। বিউটিফুল ল্যান্ডস্ক্যাপ আছে। কোন বাড়তি চরিত্র নাই। সব দৃশ্য আশ্চর্যরকমভাবে মেদহীন এবং নির্জন। রেবেকা (ইভা গ্রিন)আর থমাস (ম্যাট স্মিথ) এর ছোটবেলার বয়ানটা ইন্টারেস্টিং। যে নির্বাক দৃশ্যগুলোর মাধ্যমে তাদের মধ্যকার প্লেটনিক (আসলে কি তাই?) মিথস্ক্রিয়া দেখানো হয়েছে তা ইউনিক এবং মনে দাগ কেটে যায়। কিশোরী রেবেকার আকস্মিক টোকিও গমন মনে বেদনা জাগায়। থমাস ম্যাচের বাক্সে লুকিয়ে রাখা শামুক হাতে বিহ্বল চোখে তার গমন পথের দিকে তাকিয়ে থাকে। সমুদ্রের আল বেয়ে রেবেকাকে বহনকারী জাহাজ দিগন্তে মিলিয়ে যায়।
পরবর্তীকালে, ওই নিঝুমপুর গ্রামে যুবতী রেবেকার প্রত্যাবর্তন ঘটে এবং এ পর্যায়ে, আমি নড়েচড়ে বসি। সে সাইকেলে চড়ে থমাসকে খুঁজতে বেড় হয়। বহুবছর পর দুজনের দেখা হয়। প্রথম দর্শনে কেউ কাউকে চিনতে না পারলেও অল্প সময়েই বরগ-গলন সেশন শেষ হয় এবং তাদের এডোলেসেন্ট আলো-আঁধারির ভালোবাসা যৌবনে এসে শরীর ও মনের ভাষা খুঁজে পায়। ঝামেলাটা হয় এক্সিডেন্টে থমাস মারা যাবার পর। এখানে বলে রাখা ভালো – এরকম অদ্ভুদ রোড এক্সিডেন্ট সচরাচর সিনেমাতে দেখা যায় না। কিন্তু রেবেকা তার ভালোবাসার মানুষকে হারাতে চায় না। তাই, থমাসের ক্লোনিং করিয়ে নিজের গর্ভে ভ্রুণ নেয় এবং থমাসের ক্লোনের জন্ম দেয়।
মূলতঃ এই জায়গা থেকে সিনেমাটা তার মূল চ্যাপ্টারে প্রবেশ করে। ছোট থমাসের সাথে তার মায়ের সম্পর্কটা কি হবে এটা একটা বিশাল নৈতিক দ্বন্দ্ব তৈরী করে। দেখা যায়, রেবেকা তার সন্তানের মাঝে তার মৃত প্রেমিককে বেড়ে উঠতে দেখে যার চেহারা, ব্যবহার, পচ্ছন্দ-অপচ্ছন্দ সব সেই ছোটবেলার থমাসের মত। দেখা যায়, সে রেবেকাকে মা না বলে নাম ধরে সম্বোধন করে। পাড়া প্রতিবেশীর সমালোচনা থেকে বাঁচতে রেবেকা ছোট থমাসকে নিয়ে সমুদ্রের পাড়ে একটা নির্জন বাড়িতে গিয়ে উঠে এবং একটা একাকী জীবন যাপন করে। বিস্তর জলরাশির মাঝে ছোট্ট কাঠের বাড়ি এবং তৎসংলগ্ন অপরূপ দৃশ্যাবলি কিম-কি-দুকের সিনেমার কথা মনে করিয়ে দেয়। এদিকে ছোট থমাসের খেলার সাথী জোটে, বান্ধবী জোটে। মাঝে মাঝে মনে হয়, রেবেকা বুঝি এসব দেখে কষ্ট পায়, জেলাসিতে ভোগে। একটা সময়ে থমাস বড় হয় এবং তার একজন শয্যা সঙ্গিনী জোটে। রেবেকার কষ্ট বাড়ে। ইতিমধ্যে রেবেকা আর থমাসের মাঝে বেশ কিছু অস্বস্তিকর মুহুর্ত দেখানো হয়। শেষদিকে, ঘটনাক্রমে রেবেকা পুরো কাহিনী থমাসকে খুলে বলে এবং আরো অস্বস্তিকর একটা বেডসিনের মাধ্যমে সিনেমার ইতি ঘটে।
একজন নারী তার মৃত প্রেমিককে গর্ভে ধারন করে জন্ম দিচ্ছেন। তার মা ভূমিকায় অভিনয় করে সব দায়িত্ব পালন করছেন। আশায় বুক বাঁধছেন একদিন সে বড় হয়ে তার ভালোবাসা ফিরিয়ে দেবে। সন্তানের ভালোবাসা নয়, একজন প্রেমিকের ভালোবাসা! একে তো চটকদার কাহিনী, তার উপর শৈল্পিক দৃশ্যায়ন, তার উপর ইভা গ্রিন। পৃথিবীর পাবলিক এ ছবি খায় না কেন? ওদের কিসের এতো তাড়া?

আসগর ফরহাদি’র যত সিনেমা

আসগর ফরহাদি’র যত সিনেমা


আসগার ফরহাদি তৃতীয় প্রজন্মের ইরানি পরিচালকদের মধ্যে একজন যারা মেইন স্ট্রিম সিনেমা থেকে বের হয়ে অভিনব-নতুন ধারার সূত্রপাত করেছিলেন; প্রায় চল্লিশ বছরেরও অধিক সময় ধরে যে ধারাটি সমৃদ্ধ থেকে সমৃদ্ধতর হয়েছে এবং উৎকর্ষতার গুনে ইউরোপিয়ান সিনেমাকেও প্রভাবিত করেছে। অথচ, পৃথিবীর সবচে’ বড় কলেবরের (যশ ও প্রতিপত্তি অর্থে) পুরস্কারটি তাদের ঘরে উঠে মাত্র ক’দিন আগে। আসগার ফরহাদি’র A Separation ২০১২ সালের অস্কারে প্রথম বারের মত ইরানি সিনেমা হিসেবে সেরা ভিনদেশির স্বীকৃতি পায়। আজকের লেখাটা এই আসগার ফরহাদি’র সিনেমা নিয়ে।
একটা সময়ে আমার ধারনা ছিলো (এখনও যে নাই তা বলবো না) – ইরানি রেভোলিউসন পরবর্তী সময়ে, মানে ১৯৮০’র দশক থেকে ইরানে যে এন্টি-আমেরিকান মনোভাব এবং কট্টর সেন্সরসিপ চালু হয়, ইরানি সিনেমার উপর তার একটা পজিটিভ ইমপ্যাক্ট আছে। হ্যাঁ, যে কোন ধরনের সেন্সরসিপ কিংবা নিষেধাজ্ঞা সিনেমার’র জন্যে খারাপ – এ ব্যাপারে কোন দ্বিমত নেই। কিন্তু, এই নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়ে ইরানি সিনেমায় একটা অদ্ভুত স্বাতন্ত্র্য তৈরী হয়েছে বলে আমি মনে করি। আর কিছু না পেয়ে তারা তখন স্কুল বালকের জুতো নিয়ে সিনেমা বানানো শুরু করে। অত্যন্ত ছোটখাট বিষয় যেগুলো হয়তো আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের একান্ত অনুষঙ্গ সেগুলোকে তারা নতুন ভাবে আবিস্কার করে এবং সিনেমার দর্শককে নিবিড় ভাবিয়ে তোলে। আমার ধারনা- অবাধ আকাশ সংস্কৃতির উপর খোমেনি’র টেনে দেয়া সামিয়ানা ইরানি পরিচালকদের এত গভীরে ভাবতে বাধ্য করেছে, যার ফলশ্রুতিতে আমরা-আমদর্শক পেয়েছি অনন্য কিছু সিনেমা যেগুলো পৃথিবীর আর কোথাও তৈরী হওয়া অসম্ভব ছিলো। এই বিষয়টা অবশ্য নিশ্চিতভাবে আরো পড়ালেখার দাবী রাখে।
দিনের শেষে একজন দর্শক হিসেবে আমার কাছে বৈচিত্র্যটা খুব জরুরী। আমি চাই – বাংলা সিনেমা, বাংলা সিনেমা’র মত থাকুক; হিন্দী সিনেমা হিন্দী সিনেমার মত থাকুক, মেক্সিকান সিনেমা মেক্সিকান সিনেমার মত থাকুক। তথ্য প্রযুক্তির অবাধ জোয়ারের কারনে এরা যেন মিলে মিশে না যায়; বৈচিত্র্য না হারায়। এখনো দেখা যায়- ইরানি সিনেমার অভিনেত্রীরা সিনেমায় ঘুমানোর দৃশ্যেও মাথায় কাপড় পেঁচিয়ে রাখেন। ক’দিন আগেও কিয়ারোস্তামি’র ছবিতে জুলিয়েট বিনোশের সামান্য চুম্বন দৃশ্য বিপুল সমালোচনার ঝড় তোলে। সাম্প্রতিককালে, জাফর পানহি’র This is not a Film দেখে অবশ্য মনে হয়েছে তাদের দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। তারা এখান থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছেন। সৃষ্টিশীল মানুষদের চিন্তার শেকল পড়ানোর বিরোধিতা করি। কিন্তু, একই সাথে, আমার খুব একটা ভালো লাগবে না যদি দেখি আজ থেকে দশ বছর পর, ইরানি সিনেমাতে অবাধ যৌনতা ঢুকে গেছে; হলিউডি কিংবা বলিউডি আগ্রাসনে পড়ে তার স্বাতন্ত্র্য হারাতে বসেছে।
about-elly-dvd
যাই হোক, কথা হচ্ছিলো আসগার ফরহাদি’র সিনেমা নিয়ে। Fireworks Wednesday, About Elly এবং A Separation – এই তিনটি সিনেমা ২০০৬ থেকে ২০১১ এর মধ্যে বানানো। সব পরিচালকের নিজস্ব একটা স্টাইল থাকে, সিগনেচার থাকে। সেটা হিচকক-ই হোক কিংবা অনন্ত জলিল-ই হোক। এটলিস্ট, দুটো সিনেমা দেখলেই একটা আন্দাজ করা যায়। স্পিলবার্গ অবশ্য দাবী করেছেন – তার কোন স্টাইল নেই। জানি না এটা কিভাবে সম্ভব? ঋতু’দা হয়তো এব্যাপারে একটু আলোকপাত করবেন। স্যরি, আবার টপিক থেকে দূরে সরে যাচ্ছি।
একটু আগে যেমন বলছিলাম ইরানি পরিচালকরা খুব ছোটখাট বিষয় নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করেন, তেমনি আসগার ফরহাদি’র সিনেমার মূল উপজীব্য হলো – ‘ডিলেমা’; অবচেতনে করা সামান্য ভুল থেকে এই ডিলেমা’র সূত্রপাত ঘটে এবং এক পর্যায়ে তা একটা বিশাল অনর্থের জন্ম দেয়। এই ভুল এতোই পরিহার্য যে এর জন্য নির্দিষ্ট কাউকে দায়ীও করা যায় না, আবার মেনেও নেয়া যায় না। তখন একটা অদ্ভূত, বিব্রতকর সিচুইয়েশন তৈরী হয়, মনে হয় যেন এর থেকে মুক্তি পেলেই বাঁচি।
ফরহাদি’র সিনেমায় দুই বা ততোধিক দম্পতি থাকে যাদের মধ্যে খিটমিট লেগেই থাকে। এই খিটমিট প্রয়োজনে ডিভোর্স পর্যন্ত গড়ায় (A Separation)। অধিকাংশ চরিত্রকে দেখা যায় সবসময় শশব্যস্ত। কেউ একটু বিশ্রাম করছে কিংবা আয়েশী ভঙ্গিমায় ডায়ালগ দিচ্ছে – এরকম দৃশ্য ফরহাদি’র সিনেমাতে দেখা যাবে না। ক্যামেরার মুভমেন্টেও বিষয়টা বোঝা যায় – সবাই খুব অস্থির, যেন একটা বিশাল ঝামেলার মধ্যে আছে। অবশ্য ঝামেলা না থাকলেও, খুব যে ডিফারেন্ট তা নয়। যেমন – About Elly তে শুরুতে সবাই যখন সমুদ্রের পাড়ে বেড়াতে যায় তখন কোন ঝামেলা ছিল না। কিন্তু তাও দেখা যাবে, কোন স্টিল শট নাই আর যথারীতি সবাই খুব মুভিং। ব্যক্তিগতভাবে আমি স্টিল, সুন্দর, লং শটের ভক্ত। তাই, এই অস্থিরতা আমার ভালো লাগে না। তবে, এর ভালো দিকটা হলো ওই ক্যজুয়াল মুভমেন্টের কারনে খুব অনায়াসে দৃশ্যগুলোর সাথে রিলেটেড হওয়া যায়। মনে হয় যেন আমার চোখ-ই ক্যামেরা।
ফরহাদির পুরুষ চরিত্রগুলো বেশ অস্থির, রাগী আর আনপ্রেডিকেটবল। তারা চান্স পেলেই বউ পিটায় (About Elly, Fireworks Wednesday) আবার পরক্ষণেই ভুল বুঝতে পেরে ক্ষমা-টমা চায়। আমি ফরহাদি’র বায়োগ্রাফি পড়ি নাই। খুব একটা অবাক হবো না যদি দেখি ছোটবেলাতেই তার বাবা-মা সেপারেটেড হয়েছিলেন। ফরহাদি’র মেয়ে চরিত্রগুলো মাঝেমধ্যে মিথ্যে বলে কিংবা আরো স্পষ্ট করে বললে সত্যটা আড়াল করে। যখন মিথ্যেটা বলে তখন মনে হয় যেন – ভালো’র জন্যই বলেছে। মাঝে মাঝে আরেকজনের ভালো’র জন্যে মিথ্যে তো বলতেই হয়। কিন্তু, একটু পরে দেখা যায় ঐ সত্যটা আড়াল করার জন্য আরো মিথ্যে বলতে হচ্ছে এবং এভাবে, একটা পর্যায়ে ঘটনা তার নিয়ন্ত্রনের বাইরে চলে যায়। তখন মনে হবে যেন – হারামজাদি, প্রথমেই সত্যি কথাটা বলে দিলে কি হতো? আবার, তার উপর পুরো দোষও চাপানো যায় না। তখন একটা সাইকোলজিক্যাল ডিলেমার মধ্যে পড়ে দর্শক হাঁস-ফাঁস করতে থাকে। “ভালো”-”মন্দ” -এর নিপাতনে সিদ্ধ সংজ্ঞা নিয়ে একবারের জন্য হলেও তার মনে ?-চিহ্ন উঁকি দেয়।
ফরহাদি’র আরো পেইন আছে। কোন ছবিই সে ঠিকমত শেষ করে না। মানলাম, এটা কুল! কিন্তু বেশি কুল করতে গিয়ে, শেষে আর কোন ক্লু-ই সে দেয় না। যার কারনে সিনেমা শেষে নিজেকে কেমন বোকা বোকা লাগে। মনে হতে পারে, কিছু একটা বোধহয় মিস করেছি কিংবা বুঝতে পারি নাই। একমাত্র Fireworks Wednesday ছাড়া বাকি দুটোর ক্ষেত্রেই আমার এরকম হয়েছে। Fireworks Wednesday দু’জন প্রতিবেশীর মধ্যে পরকীয়া প্রেমের গল্প। অথচ পুরো সিনেমাতে কোন গোপন অভিসারের দৃশ্য নেই, নেই কোন অগোছালো, তাড়াহুড়ো চুম্বন। ভাবা যায়!
তিনটা সিনেমার মধ্যে আমার সবচে’ প্রিয় About Elly. কয়েক’টি কারনে – ১) ফরহাদি’র টিপিক্যাল তিল’কে তাল করার স্টাইল ২) একদল ভয়ংকর রূপসী রমনী ৩) টেনশন-টেনশন ৪) কনফিউশান ইত্যাদি।
তারপর Fireworks Wednesday এবং তারপর A Separation. ভালো লাগার কারনগুলো বাকি দুটো’র ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। পরিমানে একটু কম-বেশী হতে পারে এই আর কি।

Sex and Lucia

Sex and Lucia

আমার ধারনা – যৌনতা এখানে একমাত্র বিষয় নয়। পুরো সিনেমা জুড়ে একটা না-বলা শূন্যতা আছে; এস্কেইপিজম-এর হাঁ করা খোলা জানলা আছে; একটা চুপচাপ দ্বীপে খুব নির্জন একটা পিচ ঢালা রাস্তা আছে, একটা নীল রঙা সমুদ্র আছে, কোন একটা সুস্পষ্ট, নির্দিষ্ট জাগতিক টানাপোড়েনের অভাব আছে যার কারনে নাক-মুখ চুবিয়ে অনেকক্ষণ ভালো লাগায় ডুবে থাকা যায়।
আমি জুলিও মোডেমের ‘রুম ইন রোম’ দেখেছিলাম। প্রথমবার দেখতে একটু সমস্যা হয়েছিলো, কিন্তু ঘোর কাটিয়ে উঠে পরেরবার বেশ ভালো লেগেছিল। ইনফ্যাক্ট, রুম ইন রোমের সূত্র ধরেই সেক্স এন্ড লুসিয়া দেখতে বসা। বলাবাহুল্য, যৌনতা মোডেমের প্রিয় টপিক। যৌনতাকে মূল মেলডিতে রেখে বেশ নিপুনভাবে  সে আশেপাশে প্লেটনিক মায়া বুনন করে। আবার এই মায়া-টা বেশ এপিলিং হয়; ফলে অন্যান্য যৌন দৃশ্যের চেয়েও এর রেশ থেকে যায় দীর্ঘক্ষণ। একটু আগে দেখে আসা রগরগে যৌন দৃশ্যটার উপর এর প্রভাব পড়ে এবং অনেকক্ষেত্রে ওটাকে ছাপিয়ে যায়। তখন মনে হয় যেন বিষয়টা অ-শরীরী! মোডেমের আর ছবি দেখা হয়ে ওঠে নি এখনো। কিন্তু, এখন পর্যন্ত যা দেখেছি তাতে তার স্টাইলটা আমার কাছে বেশ ইন্টারেস্টিং বা আগ্রহ-জাগানিয়া মনে হয়েছে। এটা ঠিক যে আশেপাশের গভীর প্লেটনিক ভাবনার স্পেসগুলো না থাকলে কিংবা দর্শক কোন ভাবে সেই স্পেসের  প্রপার ইউটিলাইজ করতে ব্যর্থ হলে সেক্স এন্ড লুসিয়া নিঃসন্দেহে উপভোগ্য পর্ণোগ্রাফি।
সেক্স এন্ড লুসিয়া’র গল্প নিয়ে তেমন কিছু বলার নেই। আমি সবচে’ বেশি উপভোগ করেছি রূপবতী লুসিয়া, তার বাইক আর চুপচাপ দ্বীপটাকে। ভিজ্যুয়ালি আর্টিস্টিক সিনেমা দেখার সুবিধা হলো কোন ঘটনা ছাড়াই অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকা যায়;  নিজের মত করে ভাবা যায়। ভাবনাটা বোধ হয় জরুরী। কারন, ওটা ছাড়া নান্দনিক অথচ সিম্বলিক দৃশ্যগুলো অর্থহীন হয়ে পড়ে। সিনেমায় সমুদ্রের পানির নিচে বেশ কিছু শট আছে। শটগুলো দৃষ্টিনন্দন এবং রহস্যে মোড়া। দ্বীপটি যে পানির উপরে ভাসমান এটাও পরে জানানো হয়। এটা নিয়ে একটা ফিলোসিক্যাল কপচানি আছে, কিন্তু আমি ঠিক বুঝতে পারি নাই বিষয়টা।
একটা পার্সোনাল অবজার্ভেশন হলো – দ্বীপের দৃশ্যগুলো আশ্চর্য্যরকম ভাবে ফাঁকা ফাঁকা; সিনেমার মূল চরিত্রগুলো ছাড়া সেখানে আর কেউ নেই। এলিনা’র গেস্ট হাউসে ওরা ছাড়া আর কেউ থাকে না। লুসিয়া যে রাস্তা বেয়ে বাইক চালিয়া আসে, সে রাস্তা চোখে পড়ার মত নির্জন। সমুদ্রের কিনারায় লাইটহাউসটাও যথারীতি একা। এলিনা তার গেস্ট হাউসে নিজের অজান্তেই তার খুঁজে বেড়ানো মানুষটার সাথে চ্যাট করে। আপাত অচেনা লোকটা তার জন্য গল্প লিখে পাঠায়। এই গল্পগুলোতে সে বেঁচে থাকার রসদ খুঁজে পায়। এর সমান্তরালে এলিনার জীবনে যৌনতা দেখানো হয়। তার গেস্ট হাউসে থাকতে আসা অচেনা ডুবুরীর সাথে সে সেক্স করে। লুসিয়ার কাছে অচেনা ডুবুরীর দীর্ঘ পুরুষাঙ্গ নিয়ে পুলক প্রকাশ করে। আর লুসিয়া তার প্রেমিক-লরেঞ্জো মারা গেছে ভেবে একটা দুঃসময় অতিবাহন করে। আমার ধারনা – লুসিয়াকে (পাজ ভেগা) আমার অনেকদিন মনে থাকবে। তার আরো সিনেমা দেখার প্রত্যাশায় আছি। লরেঞ্জো’র লেখক সত্ত্বার স্ট্রাগলটা উদ্ভট, ইলজিক্যাল। অবশ্য, পুরো সিনেমায় লজিক্যাল কী-ই বা আছে? 

Not just another ‘Belle de Jour’


Not just another ‘Belle de Jour’

লেখাটা কোন ভাবেই মুভি-রিভিউ নয়। সিনেমা দর্শন পরবর্তী কিছু চিন্তা-ভাবনা শেয়ার বলা যেতে পারে। সিনেমার নাম The Piano Teacher. গেল অস্কারের হট্টগোলে Amour দেখা হয়েছিল। সেইসূত্রে Piano Teacher দেখতে বসা। দুটো সিনেমাতেই পরিচালকের একটা প্রিয় ‘কৌশল’ হল – ওয়েস্টার্ন ক্লাসিক্যাল, গ্র্যান্ড পিয়ানো, শোফিন, শুবার্ট, বিটোফেন ইত্যাদি। ‘কৌশল’ বলছি একারনে যে, এগুলো কোনভাবেই সিনেমা দুটোর মূল বিষয় নয়, কিন্তু দর্শকের কাছে মূল বিষয়টা তুলে ধরতে এইসব এলিমেন্ট ব্যবহার করে একটা আবহ তৈরী করা হয়। এটা অত্যন্ত কার্যকর, অন্তত আমার ক্ষেত্রে। সত্যি বলতে, মিউজিক্যাল এলিমেন্ট গুলো না থাকলে Piano Teacher হয়তো আমার এতটা ভালো লাগতো না। এককথায়, Piano Teacher একজন তীব্র মর্ষকামী মানুষের গল্প। অবশ্য এর বাইরেও সিনেমাটা কিছু ভাবনার স্পেস তৈরি করে, যেমন – মানুষের দ্বৈত সত্ত্বা, গোপন ফ্যান্টাসি, একাকীত্ব, প্রেম, ঈর্ষা ইত্যাদি।

মধ্যবয়স্কা এরিকা সিনেমার মূল চরিত্র। সে মানসিক ভাবে ‘ভিন্ন’/ ‘উদ্ভট’; আমি ‘ভিন্ন’ – শব্দটার পরিবর্তে বলতে পারতাম – অসুস্থ কিংবা পারভার্ট বা অন্য কিছু। কিন্তু পুরোপুরি পেরে উঠছি না। দেখা যাচ্ছে – সে একটা প্রখ্যাত মিউজিক কনসার্ভেটরির অন্যতম প্রধান পিয়ানো শিক্ষিকা। শুধু তাই নয়, সে রীতিমত স্বীকৃত শুবার্ট, শুম্যান বিশেষজ্ঞা। শুবার্টের অত্যন্ত সূক্ষ্ম মুভমেন্ট কিংবা ডিনামিক্স গুলো তার নখ দর্পনে। সে একজন বদমেজাজী, রাগী প্রফেসর। ছাত্র- ছাত্রীরা তাকে ভয় পায়, সমীহ করে। এর সমান্তরালে দেখানো হচ্ছে – এই বয়সেও সে তার বৃদ্ধা মায়ের সাথে থাকে, যিনি নিজেও কিছুটা ডিস্টার্বড এবং পানাসক্ত। এরিকা সেক্স শপে যায়, পর্ন দেখে, লুকিয়ে মিটিং-কাপল দেখে সম্ভোগ করে, ব্লেড দিয়ে কেটে বিশেষ অঙ্গ থেকে রক্তপাত ঘটিয়ে ন্যাপকিন পড়ে থাকে (not sure, she might be at menopause) ইত্যাদি ইত্যাদি। ঘটনা আরো তীব্রতর হয় যখন সুদর্শন পিয়ানিস্ট ওয়াল্টারের আগমন ঘটে। ওয়াল্টার সাথে মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে এরিকা চরিত্রটির খুঁটিনাটি আরো প্রকট হয়ে ওঠে। ওয়াল্টারের প্রতি তার ভালো লাগা জাগে প্রচন্ড ঈর্ষা বোধ থেকে। অথচ দেখা যায় এর আগ পর্যন্ত সে ওয়াল্টারকে নানাভাবে দূরে ঠেলে রাখে। এমন কি, তার অধীনে মাস্টার্স করার জন্য অডিশন দিলে সে “না” ভোট দেয়। ওয়াল্টারের প্রতি তার ভালোবাসার প্রকাশও যথেষ্ট উদ্ভট, যেটাতে ওয়াল্টার নিজেও অস্বস্তিতে পড়ে। পরবর্তীতে, ওয়াল্টার তাকে যৌন নিপীড়ন করে। এই দৃশ্যটা বেদনাদায়ক এবং মনে হবে যেন, এরিকা বুঝি ওয়াল্টারকে আর কখনোই চাইবে না। একদিন পারফর্ম্যান্সের আগে সে ভ্যানিটি ব্যাগে ছুরি নিয়ে ঘুরে। মনে হবে যেন, এরিকা বুঝি বদলা নিবে, খুন করবে ওয়াল্টারকে। কিন্তু, ওয়াল্টারকে কয়েকজন মেয়ে সহপাঠীর সাথে হেঁটে আসতে দেখে শোক ও ঈর্ষার বশবর্তী হয়ে নিজের বুকে ছুরি বসিয়ে দেয়। বোঝা যায়, ওয়াল্টারের যৌন নিপীড়ন তার কাছে কাঙ্খিত ছিল, এটা ছিল তার গোপন ফ্যান্টাসির অংশবিশেষ।
কিছু সিনেমা আছে যেগুলো দেখার পরে একা কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকতে ইচ্ছে করে। ভাবতে ইচ্ছে করে – এটা এরকম হলো কেন? এটা এরকম না হয়ে ওরকম হলে কেমন হতো? এখন আমার কেমন লাগা উচিত? ওরকম হলে কেমন লাগতো? ইত্যাদি… ইত্যাদি। The piano teacher এধরনের একটি সিনেমা। ভাবনা উদ্রেককারী, কনফিউজকারী, সময়নষ্টকারী :P
যারা সিনেমাটা দেখেন নি, তারা হয়তো ভাবছেন, যা শালা! এই বেরসিক তো পুরো হাঁড়িটাই ভেঙে দিল। রাত জেগে কষ্ট করে আর যাত্রা পালা দেখে কি হবে? কিন্তু বিশ্বাস করুন, এটি স্পিলবার্গ-এর ছবি নয়, এখানে কোন ভালো মানুষ হিরো-হিরোয়িন কিংবা খারাপ মানুষ ভিলিয়ান নাই। এটা একান্তই অনুভবের ব্যাপার। এবং আমি নিশ্চিত আপনার অবজার্ভেসন আমার থেকে ভিন্ন হবে; উদ্ভট হবে।