তোমার নিশ্চয়ই মনে পড়ছে অ্যাক্রিলিক


তোমার নিশ্চয়ই মনে পড়ছে অ্যাক্রিলিক।

ভ্রমণের সিগন্যাল।

তোমার নিশ্চয়ই মনে পড়ছে প্রবণতা।

নৌসময়ের আগে

তুমি নিশ্চয়ই মনে করে নিচ্ছো ঠিকঠাক

চুম্বনের যাবতীয় খসড়া

অমোঘ হয়ে ওঠার

সবগুলো শ্রাবণ শৈলী!

বালকের পৃথিবী ভাবনা - বায়োগ্রাফিমূলক ৩

আমার চোখে রাজ্যের ঘুম আর ডান কাঁধে একটা শান্তি নিকেতনি। দৈর্ঘ্যে এবং গাম্ভীর্যে আমাকে ছাড়িয়ে গিয়ে পায়ের গোড়ালি ছুঁয়ে দিচ্ছে বারবার। মা'র কিনে দেওয়া। শান্তি নিকেতনি ঝুলিয়ে ছেলেকে আর্টিস্ট বানাবে। ভিতরে একটা নতুন কেনা খাতা, একটা প্যাস্টেলের বক্স। প্যাস্টেলের বক্সের মলাটে টম এন্ড জেরির ছবি। ছবির কাহিনী খুবই ইন্টারেস্টিং। জেরি ন্যাংটো হয়ে সাওয়ার নিচ্ছে আর টম তলোয়ারের মত গোঁফগুলো দু'দিকে বাড়িয়ে দিয়ে পিছন থেকে উঁকি দিচ্ছে। কিন্তু এতো মজার বিষয়েও আমি আজ কোন আগ্রহ পাচ্ছি না। আমার কাঁধ থেকে ঝোলানো শান্তি নিকেতনি যে হেলেদুলে, বাতাসে উড়ে আমার পার্শ্ববর্তী রাস্তাঘাট পরিস্কারের দায়িত্ব নিয়ে নিয়েছে ওদিকেও খুব একটা ভ্রুক্ষেপ নেই।

ছুটির দিনে ঘুম হারানোর চেয়ে শোকাতুর বিষয় আর কিইবা হতে পারে? আমার এই এলোমেলো, ইতস্তত পদক্ষেপের মূল উদ্দেশ্য আসলে মা'র প্রতি একটা মৌন স্মারকলিপি লেখা। শান্তি নিকেতনির ঝাড়ু হয়ে ওঠা এই স্মারকলিপির একটা অংশ মাত্র। মা ছোটবেলা থেকেই খুব বুদ্ধিমতী ছিলেন। অধিকাংশ কথাবার্তা আমার মুখ ফুটে বেরুবার আগেই অনায়াসে বুঝে ফেলতেন। এবারও তার অন্যথা হলো না। আমার ঝাড়ুদার হয়ে ওঠার প্রবৃত্তি তার চোখে ধরা পড়ে গেলো। "ছেলে ঝাড়ুদার হতে চাইছে" এটা নিশ্চয় কোন মা'ই সজ্ঞানে মেনে নিবেন না। আমার মাও নিলেন না এবং তৎক্ষণাৎ আমার শান্তি নিকেতনির কাঁধের ঝুলে একটা বড় গিট্টু মেরে দিলেন। ওবেচারা দৈর্ঘ্যে ও গাম্ভীর্যে ছোট হয়ে গিয়ে গোঁড়ালি থেকে আমার হাঁটুতে উঠে এলো। আমিও ঝাড়ুদার থেকে আর্টিস্ট বনে গেলাম।

সামনে একটা ছোট মাঠ। মাঠ পারলেই ক্লাসরুম। ক্লাসের নাম-হাসিখুশি। আমার মত যেসব ছোট্ট বাচ্চা চোখ কচলে, হাঁড়িমুখ করে বাসা থেকে একগাদা মন খারাপের দিস্তা নিয়ে প্রতি সপ্তাহে এখানে ছবি আঁকতে আসে, মূলত: ওদের জন্যেই এই ক্লাস।

ক্লাসের বেঞ্চিগুলো বেঢপ সাইজের। বসে থেকে টেবিল নাগাল পেতে আমার বেশ কষ্ট হচ্ছে। কিছু আর্টিস্ট দেখি হাত পা ছড়িয়ে দিয়ে টেবিলের উপরেই বসে পড়েছে। কি সাংঘাতিক অভদ্র লোকজন! আমি কিছুক্ষণ জানলার বাইরে তাকিয়ে থাকি। মা'কে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। খানিকটা আকাশ আড়াল করা আম গাছটাকে দেখা যাচ্ছে। আম গাছে অনেক কাকের বাসা দেখা যাচ্ছে।

হঠাৎ দেখি একটা ইয়া বড় গোঁফ ওয়ালা ব্যস্ত ভঙ্গিতে ক্লাসরুমে এসে ঢুকলো। হাসি হাসি মুখ। কিন্তু গোঁফের আড়ালে তার হাসি বারবার চাপা পড়ে যাচ্ছে।

- আপনারা সবাই একটু ঠিকঠাক হয়ে বসেন তো দেখি। তারপর আসেন আমরা একটু গল্প গুজব করি।

চুলগুলো ঘাড় ছুঁই ছুঁই। খুব শীর্ণকায় দেহে বেখাপ্পা ঢোলা একটা প্যান্ট। সরু কোমর। দেখে মনে হচ্ছে একটা জীবন্ত বালুঘড়ি সারা ক্লাসময় হেঁটে হেঁটে বেড়াচ্ছে। উনি বিভিন্নভাবে আমাদের সাথে সুসম্পর্ক তৈরী করার চেষ্টা করলেন। তার মধ্যে একটা হলো এই "আপনি আপনি" করে বলা। ছোটরা সবসময় নিজেদের বড় ভাবতে পচ্ছন্দ করে। বালুঘড়ির এটা ভালোই জানা আছে। তার আরো কিছু মনভোলানো কথার শেষে আঁকিবুকি শুরু হলো। আঁকার বিষয় আমাদের চারপাশের পৃথিবী। আমি খানিকটা মাথা চুলকে খাতাটা বের করে গালে হাত দিয়ে বসে থাকলাম। চারপাশে তো অনেক জিনিসপত্র। কোনটা ফেলে কোনটা আঁকি। তাছাড়া পৃথিবীর তুলনায় খাতাটা অনেক ছোট।

- কি আপনি আঁকছেন না কেন? মন খারাপ?
- না।
- তাহলে?
- কি আঁকবো ঠিক বুঝতে পারছি না?
- কেনো? পৃথিবী আঁকবেন। পৃথিবী দেখেছেন কখনো?
- দেখেছি।
- কোথায় দেখেছেন?
- আমাদের বাসায়। ড্রইং রুমে।
- বাহ্! তাহলে ওটাই আঁকেন।
- গোল তো আঁকতে পারি না।
- আজকে তো প্রথম দিন। তাই পুরো গোল না হলেও সমস্যা নেই।

বালুঘড়ির কথা মত কালো প্যাস্টেলটা বের করে একটা গোল আঁকলাম। এবার চারপাশের জিনিসত্র আঁকতে হবে। জিনিসপত্রের কথা ভাবতেই প্রথমেই মনে এলো মাটি। মাটি ছাড়া তো পৃথিবী সম্ভব না। গোলের ভেতরে সব মাটি। মাটির উপরে আমরা দাঁড়িয়ে থাকি। কিন্তু. . . কিন্তু . . . কিন্তু নিচের দিকে যারা আছে ওদের তো ধপাস্ করে যাওয়ার কথা। তাহলে?

তাহলে কি নিচে কেউ থাকে না? মেটে রঙটা হাতে নিয়ে দাগ দিতে যাব, এমন সময় মনে পড়লো সমাজ বইয়ের কথা - পৃথিবীর তিনভাগ জল, একভাগ স্হল। মা বলেছে - স্হল মানে মাটি, জল মানে পানি। এইরে! তাইলে তো পানিও দেয়া লাগবে। গাঢ় নীলটা বের করি। গোলটার তিনভাগ এই রঙ দিতে হবে। কিন্তু পৃথিবীর সাথে পানিটা লেগে আছে কিভাবে? মাটি নাহয় লেগে আছে বুঝলাম, কিন্তু পানি তো ঝপাস্ করে পড়ে যাওয়ার কথা। তাহলে?

তাহলে আর কি? পৃথিবীটা আসলে পানির উপরে ভেসে আছে। একটা অনেক বড় সমুদ্র। সমুদ্রের ভিতরে পৃথিবীর তিনভাগ ডুবে থাকে। আর উপরের একভাগে আমরা দাঁড়িয়ে থাকি। মাঝে মধ্যে আমারা হেঁটে হেঁটে সমুদ্রে বেড়াতে যাই। মাছ ধরি। উপরের দিকে কিছু পাহাড়। খয়েরি রঙ এর। নীল রঙের আকাশ। আকাশে সূর্য। একটা সবুজ আম গাছ। তার নিচে আমি। তারপর এই স্কুল। বাহ! নিজের বুদ্ধিমত্তায় নিজেই যেন চমকে উঠলাম।

এই করতে করতে দেখি অনেকের আঁকা শেষ হয়ে গেছে। বালুঘড়িকে মাঝখানে বসিয়ে সবাই জটলা করে ছবি দেখাচ্ছে। একেকজন পৃথিবী সম্পর্কে নিজস্ব ধারণা ব্যক্ত করছে। লাল রঙের চশমা পড়া একটা মেয়ে বললো পৃথিবীতে নাকি কাকের সংখ্যা অনেক বেড়ে গেছে। এ নিয়ে তার দু:শ্চিন্তার কোন শেষ নেই। সে নিজেও এঁকেছে একটা মস্ত কাকের ছবি। পাশে একটা ছোট্ট পৃথিবী। কাকটা খুব আগ্রহ নিয়ে পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে আছে। যেন আরেকটু হলেই খেয়ে ফেলবে।

আমি খানিকটা ভয়ে ভয়ে আমার খাতাটা এগিয়ে দিলাম। সবাই আগ্রহ নিয়ে দেখতে শুরু করলো। একজন জিজ্ঞেস করলো, "কালো মতন জিনিসটা কি?" আমি বললাম, "ঐটা আমি। আম গাছের নিচের দাঁড়িয়ে আছি।" তখন লাল রঙের চশমা পড়া মেয়েটা বললো, "আম গাছের নিচে আর কখনো দাঁড়িয়ো না। কাকে পু করে দিবে।" আমি মাথা নেড়ে সায় দিলাম। বুঝানোর চেষ্টা করলাম যে আমার মস্তবড় ভুল হয়ে গেছে।

বালুঘড়ি তার চুলে আঙুল চালাতে চালাতে বললো, "তা, আপনি পানিতে ভেসে ভেসে কোথায় যাচ্ছেন?" আমি বললাম, "পৃথিবী যে দিকে যাচ্ছে ঐদিকে।" কে যেন জিজ্ঞেস করলো, "এতো পানি কোত্থেকে এলো?" আমি তখন সমাজ বইয়ের তিন ভাগ একভাগ ব্যাপারটা খুলে বললাম। এটা শুনে দেখি বালুঘড়ি জোরে জোরে হাসতে শুরু করলো। এবারও গোঁফের নিচে তার হাসি চাপা পড়ে গেলো। কোন একটা অদ্ভুত কারনে লোকটাকে আমার খুব ভালো লেগে গেলো। তার হাসি আড়াল করা গোঁফটাকেও। আরো কয়েকজনের ছবি দেখার পরে বালুঘড়ি বললো, "আমাদের এখানে একটা লাইব্রেরি আছে। আপনারা চাইলে ওখানে ঘুরে দেখতে পারেন। আর এখন আপনাদের ছুটি!"

ছুটি শব্দটার সাথে সবসময় একটা মন ভালো করা ব্যাপার থাকে। যথারীতি আমারও
মন ভালো হয়ে গেলো। কিন্তু বাইরে বের হতেই দেখি চারপাশে ঘুটঘুটে অন্ধকার। ঝড়ো বাতাসে মাঠের ধুলো উড়ছে। গেটের কাছে আঙ্কেল আন্টিদের জটলা। কিন্তু মা'কে কোথাও দেখতে পেলাম না। একটু পরেই ঝম ঝমিয়ে বৃষ্টি নামল। আমি তবু বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকলাম। মা আসলে যেন দূর থেকে আমাকে দেখতে পায়। ক্লাসরুমের টিনের চালে তুমুল শব্দ হতে লাগলো। আমি এতো জোরে বৃষ্টির শব্দ আগে কখনো শুনিনি।

জিতু ও রেণু

জিতুর সাথে প্রথম কিভাবে পরিচয় হয়েছিলো মনে নেই। সে পরিচয়ে হয়তো মনে রাখার মত তেমন কিছু ছিলো না, কিন্তু এরপরে কোন এক সময়ে এসে আমরা খুব ভালো বন্ধু হয়ে গেছি। তার আগে একই ছাদের নিচে টানা দু'বছর ক্লাস করেছি। একই ইউনিভার্সিটিতে আলাদা ডিপার্টমেন্টে প্রায় পাঁচ বছর পড়েছি। ক্যালেন্ডারের হিসেবে নি:সন্দেহে বেশ দীর্ঘ সময়।

কিছু মানুষ আছে যাদের হাসি দেখলেই মনে হয় "বেঁচে থাকা ব্যাপারটা নেহাৎ মন্দ নয়"। জিতু তাদের মধ্যে একজন। জিতুর হাসিতে প্রায় আমাদের মন ভালো হয়। হতাশা কাটে। দুরারোগ্য ব্যাধি সারে।

যে বিষয়টা আসলে বলার জন্যে এতক্ষণ ভণিতা করছি সেটা হলো ক'দিন আগে জিতু আমাকে একটা আবৃত্তি শুনিয়ে বিনা মেঘে টাস্কি খাইয়েছে। জিতুর অনেক গুন। তার উপরে সে যে এতো মসৃণ আবৃত্তি করে এটা আমার জানা ছিলো না। আবেগে ঘি ঢালার কারনটি আরো চাঞ্চল্যকর। জিতু আমারই লেখা একটা ছাইপাশ আবৃত্তি করেছে!

এমনিতেই আমার নিজের লেখা নিয়ে সংশয়ের কোন সীমা পরিসীমা নেই। কিন্তু জিতু'র আবৃত্তি শুনে মনে হয়েছে যাক কিছু একটা বোধ হয় দাঁড়িয়েছে। নইলে কেউ আবৃত্তি করবে কেন? জিতুকে কখনো মুখোমুখি ধন্যবাদ দেয়া হয়নি। কিছু বন্ধুত্ব ধন্যবাদ আদান প্রদানের ফরমালিটির মধ্যে আটকে থাকে না। এক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে। দেখা হলেই হয়তো আমাদের সম্বোধণ শুরু হচ্ছে কোন জন্মপরিচয় সংশয়কারী গালি দিয়ে যেখানে কবিতার মত বিষয় আসতে একটু সময় লাগে। তাই উপায়ান্তর না দেখে আমি এই বিকল্প ব্যবস্হার দারস্থ হয়েছি এবং বলছি - জিতু তোকে অনেক থ্যাঙ্কস্।

আগেই একবার বলেছি আমাদের বন্ধুত্বের বয়স প্রায় সাত বছরের মত। এই সাত বছর বয়েসী বন্ধুত্বের এখন ভরা যৌবনকাল। আমি এর চিরযৌবন কামনা করি। আরো একশ বছর পরেও এবন্ধুত্ব চিরযুবক থাকুক।

Get this widget | Track details | eSnips Social DNA

তোমার পক্ষে একটা শ্রেষ্ঠ কবিতা যোগ করা যায়

তোমার পক্ষে একটা শ্রেষ্ঠ কবিতা যোগ করা যায়




তোমার পক্ষে একটা শ্রেষ্ঠ কবিতা যোগ করা যায়।

বিমনা বর্ষায় আমার ভিজে যাওয়া কবিতার থেকে

তোমার চিহ্নেরা জমা থাকে বহুদিন।

বহুদিন তুমি লাল জলগামছায় এক দুপুর ভেজা চুলে

জন্ম দিয়েছো এমন অজস্র চিহ্নের।

টবগাছে, ফুলগাছে,

আমাদের এক চিলতে বারান্দায়

ওরা কেমন আস্পর্ধায় বেড়ে ওঠে!

ইদানীং আমার অফিসেও যেমন দেখছি ওদের প্রভূত যাতায়াত।

লিফটের আয়ানায়, অপরাহ্ণের কফিমগে,

তোমাকে চিহ্নিত করি খুব অনায়াসে।

আমি চিহ্নে চিহ্নে তোমার আঙ্গিক দেখি।

কবিতার খাতায় নভেরা'র মা নামে

তোমার গোপন লিখে রাখি।

তোমাকে ভাবার সময়েরা চলে গেলেও

বহুদিন এইসব পেলবতার পলি জমে থাকে।

আমার কেবলই মনে হতে থাকে -

তোমার পক্ষে একটা শ্রেষ্ঠ কবিতা যোগ করা যায়।

বিমনা বর্ষায়...

-------------------------------------------------------------------------------

এ জার্নি বাই বাস

এই রাত্রিকালীন মহাসড়কের সাথে আমার সখ্যতা বহুদিনের। স্পেসেফিকলি বলতে গেলে সেই কলেজে পড়ার সময় থেকেই। তখন এমনও দিন গেছে প্রতি সপ্তাহান্তে আমি একবার করে যাতায়াত করেছি এই মহাসড়ক ধরে। তখন আমার অলস দেহ কিংবা সে দেহের ক্লিষ্ট গতি, কোনটাই না থাকলেও গৃহের প্রতি একটা দুর্বার টান ছিল। এখনো যে নেই তা বলা যায় না। তবে বয়েসের টানে তানপুরার সুর এখন অনেক পাল্টে গেছে। মনে আছে সেদিন গলা কেমন কেঁপে কেঁপে উঠেছিলো, যেদিন আমি প্রথম শহর বদল করি। ফেলে আসা শহরটাকে আমি বহুদিন বুক পকেটে নিয়ে ঘুরেছি। নতুন শহরের দালান কোঠায়, মানুষের মুখের রেখায় উপযোজনের অনুপ্রেরণা খুঁজেছি এবং এরপর একদিন হঠাৎ আবিষ্কার করেছি আমার শার্টে আর কোন বুক পকেট নেই! এ শহরে থাকতে হলে বুক পকেট রাখতে নেই। মূলত: তখন থেকেই আমার ঘরমুখী যাতায়াত গুলো উল্লেখযোগ্য হারে কমে এলো। যদিও এই রাত্রিকালীন ভ্রমণের প্রতি আমার আকর্ষণ এখনো সমান দুর্নিবার রয়ে গেছে।

দূর পাল্লার বাসের জানলায় প্রায়শই একটা বৈরাগ্যের সুর লেখা থাকে। আমার পক্ষে এর লোভ সামলানো দায়। তাই জানালার পাশের সিটটার ব্যাপারে আমি বরাবরই আপোষহীন থেকেছি। প্রয়োজনবোধে ঘন্টাখানেক কাউন্টারে কাটিয়ে দিয়েও পচ্ছন্দসই জায়গাটা না পেলে আমি বাসে উঠিনি। আজও যেমন তার অন্যথা ঘটে নি। একরাশ অন্ধকার আর মৃদু চন্দ্রালোক পাশে রেখে আমি ছুটে চলেছি পরিচিত প্রকান্ড মহাসড়ক ধরে। এসময় বাস জুড়ে থাকা ঘুমের প্রলেপ আমি স্পষ্ট টের পাই। বাসটাকে তখন একটা গহিন ঘুমপুরী মনে হয়। জানলার ফাঁক গলে শীতল বাতাস ঢুকে পড়ে। আমার শরীর জুড়োয়। আইপড্ শাফলের সাথে আমার মুডও শাফলড্ হয়, বিভিন্ন ভাবনারা দল বেঁধে আসে। মুড শাফলড্ হয়েও অবশ্য বেশি দূরে যাওয়ার উপায় থাকে না। কারন ট্র্যাক গুলো খুব যত্ন করে আমারই সিলেক্ট করা। যাত্রাকালীন বৈরাগ্য সাধনে এটা এক অপরিহার্য অনুষঙ্গের মত।

অধিকাংশ সময় ধরে আমি জানলার দিকে তাকিয়ে থাকি। কখনো একটা জঙ্গলের মতন, কখনো ক্ষেত, কখনো সেতু, কখনো একটা থমকে থাকা বিস্তীর্ণ মেঘ আমি পলকে পেরিয়ে যাই। অথচ আমার যে খুব তাড়া আছে এমন নয়। অন্ধকার ফুঁড়ে আসা ছোট ছোট আলো চোখে পড়ে। সাথে ছোট ছোট ছাউনির ঘর, পুকুরের পাড়। একেকটা দ্বীপের মত বাড়ি। কখনো একটা সরু মেঠো পথ যেন আলগোছে নেমে হঠাৎ হারিয়ে গেলো। পাশে একটা টিনের ছাউনি, বসবার বেঞ্চি। চায়ের দোকান। এবং আরো আরো অস্পষ্ট ঘুমন্ত জনপদ। আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে ওদের। কোন এক অজানা কারনে আমার কেবলই মনে হতে থাকে এরা পৃথিবীর সবচে' সুখী মানুষের দল। কি আশ্চর্য নৈ:শব্দে ঘুমিয়ে আছে। নাগরিক সব জটিলতা ভুলে কি সাধারন থেকে গেছে। এমন ভাবনা আমাকে প্রায় কাতর করে তোলে। আমি তখন বাসে বসে বসে অনেক শূন্যতা ভাবি আর একটা কিছু না পাওয়ার বেদনায় ক্রমশ: বিলাসি হই।

"মহাসড়কের সাথে সখ্যতা" ব্যাপারটা আসলে আমার ক্ষেত্রে পুরোপুরি প্রযোজ্য নয়। কারন আমি এর পার্থিব দিক গুলোর ব্যাপারে বরাবরই উদাসীন থেকেছি। আমার কখনোই জানতে ভালো লাগে নি - বাস এখন কোন এলাকায় চলছে, কিংবা এই জায়গাটার নাম কি? বা সচরাচর অন্যান্য ভৌগলিক বিষয়। আমি এই পথে প্রচুর নদী উপভোগ করেছি সত্যি। কিন্তু খুব সচেতনভাবে তাদের নামটা জিজ্ঞেস করতে ভুলে গেছি। নদীর উপর জোনাকির মত বিন্দু বিন্দু আলো। নৌকার সংসার। দূরবর্তী জাহাজের আভাস, বালি তোলার ডিঙ্গি আর সেতুর সারি বাঁধা সোডিয়াম আলোয় আমি মেকি রহস্য বুনি। বহু আগে শোনা একটা রবীন্দ্রনাথের গানে নতুন করে বিভোর হই।

অবশেষে তুমি এক সুপেয় সিগারেট

সমুদ্রচারী ডুবুরীরা নেমে দেখছেন স্নানের সঞ্চালন

এবং তাহার নদীরূপ।

দেখছেন স্থির জলরাশিতে নিমগ্ন মারমেইড।

রাতের রুমালে উড়ে গেছে যাদের সামুদ্রিক ঘুম

অন্য কোন সমুদ্রে,

আর কোন নাবিকের কাছে।


প্রিয় পাপ মনে রেখে তুমিও যৌন হয়ে ওঠো এমন।

বেঁচে থাকো বহুদিন পতনের অবসাদে।

দ্যাখো টেবিল ঘড়ির কাঁটায় আমাদের সব যৌনতা লেখা আছে।


যার অবশেষে তুমি এক সুপেয় সিগারেট।
-------------------

মৌনতা হনন

মৌনতা হনন


বিমান বন্দরেরও একটা পরিমিতি আছে কোথাও
নৌকো বিদ্যা সমেত মেখলা মরে গেলে
একদিন চোখে পড়ে যাবে সব
পাখিদের প্রতিলিপি।

আমাদের জানা হবে
উড্ডয়নের সমস্ত কৌশল
শূন্য থেকে ততোধিক শূন্যে
বিপুল জেগে উঠবে সব মৌনতা হনন।

পতঙ্গ ঘুমের ক্যাম্পেইন তুমি
রানওয়ে জুড়ে পড়ে থেকো পতঙ্গের মতন।
----------------------------------------

সমুদ্রে গেলে তার ব্যাপারে কথা হয়

সমুদ্রে গেলে তার ব্যাপারে কথা হয়



সমুদ্রে গেলে তার ব্যাপারে কথা হয়।
হেলানো বেতের চেয়ারে বসে
আমরা যূথবদ্ধভাবে তাকে মনে করি।
তখন আমাদের মধ্যেই কেউ একজন বলে ওঠে -
সে ছিলো মূলতঃ একটা শামুক।
কেউ বলেছিলো, একটা ইটালিয়ান ছবি।
কেউবা স্কচের বোতল।
আবার এমনো শোনা গেছে
বন্ধ্যা নীল তিমিটা'র মত
সে ছিলো অনেক নি:সন্তান।
অথচ সেই সূত্রে সমুদ্রে গেলেই
আমাদের তার কথা মনে পড়ে।
ঠান্ডা শীতের রাতগুলোতে
আমরা যাকে কখনোই পাইনি পানীয় বাটোয়ারায়,
কফিন ভর্তি করে সমস্ত হিম নিয়ে
যে চলে গেছে যোজন দূরে,
আজ এই নীহার নীহার আবহাওয়ায়
সে ক্রমাগত আমাদের বিষয়বস্তু হয়ে ওঠে।

--------------------------------------------------------------------------------

আঙুলে অসুখ

আঙুলে অসুখ


অতি নিকটের মৃত সংবাদেও
আমি আজ কুশল বিনিময় করছি।
নির্মোহে দেখছি বাড়ি ভর্তি সব লোকজন।
বিভিন্ন ভাবে যারা আজ
খুব বিষণ্ন হয়ে উঠেছেন
মুখপাত্র হয়ে উঠেছেন
একেকটা শোকের
কিংবা শবের।

সে তুলনায় আমার কোন কাজ নেই আজ।
নেই কোন ভঙ্গিমা উল্লেখিত বিষাদের।
আমার কেবলই মনে হতে থাকে একটা আঙুল
ও তার অসুখের কথা।
নখেদের ঘর বাড়ি রোদে
হারানো গিয়েছে যে মসৃণতা
সেখানে খুন হলো যেন
বিপুল শোক প্রবণতা।
---------------------------------------

নৌভ্রমণ

নৌভ্রমণ


মুখবই জুড়ে গঠিত হয়েছে

সহস্র ঘুম।

কিটারোর মৌন অবসাদ।

আমাকে জড়িত করে তোলে এমন

প্রিয় মুখে পাখির মত রাত

বিশ্রাম খোঁজে চোখ।

রচিত করে

ঘুমের নৌভ্রমণ!

-------------------

আমি বিষাদ দেখেছি এমন মনলোভা নীল

আমি বিষাদ দেখেছি এমন মনলোভা নীল


আমি বিষাদ দেখেছি এমন মনলোভা নীল।
যদিও সেদিন তুমি হেসেছিলে প্রচুর।
সেই সোমবার বর্ষায় অনন্য নীলক্ষেতে
মুখে আর অবয়বে
কি ভীষণ অবগত ছিলে তুমি।

একটা বিষাদের মেঘ সম্পর্কে
ট্রাফিকের শহর
যখন বেলুন গাড়িতে চাপে
অনেক মেদুর হতে চেয়েও
আমাদের জানা হলো না কোন বিস্তারিত ঘুম।
ফলে তোমার সমস্ত গহন জুড়ে
আমি শুধু বিষাদ-ই ধারণা করি, জল কেলি।

---------------------------

The Three Bushes

The Three Bushes

১.

আপাত ম্রিয়মাণ থেকেও
হাওয়ার বেগে চলে গেছে
নিদ্রাবাহী ম্যাটাডর।
ফলে গোলাপের আশা করে
কেউ মিলিত হচ্ছে না আর।
চোখের সংকেতে জাগছে না
কোন বিশেষ ঘুমের লেপন।
পাহাড়ের মত নির্ঘুম কেটে যাচ্ছে
একেকটি বিশ্বস্ত রাত!

নদীপথে পানসি আসবে জেনেও হায়
আমাদের রাতগুলো আর ঘুমন্ত হচ্ছে না মোটেই।
------------------------------------------

২.

রোদ সম্পন্ন কেবিন থেকে সমুদ্র দেখা যায়।
চিলপাখির নখে হেলে পড়া পোর্সিলিন
দুপুরের জাহাজে বয়ে আনে সঙ্গীত
আরো দূরবর্তী বন্দরে
যেন আমিও শুনেছি কত
এই হাওয়ার বায়েন
কোন এক উত্তুরে বাতাসে
আমার চুল থেকে বিষাদেরা খসে পড়ে
ঢেউয়ের মত এসে যারা
পুনরায় জড়ো হল পায়ে
খুব উত্তাপের খাতিরে ওরা
আর ভেসে গেলো না কেউই।
-------------------------

৩.


প্রিয় পাপ মনে থাকতেই
এসো গহীন গোলাপ হই।।
বাগানের পথে মৃত চোখ হই সমূহ চুম্বনে।
আমাদের স্পর্শেরা জমা থাক রূপসী দরজায়।
দেখো আহত পাখির পালক
দাগ রেখে গেছে কারো ময়ূর বিষাদে।
এই মাংস মুখ্য বেডরুমে
তাই প্রজাপতি মরে গেলেই
এসো পায়ে পায়ে জলীয় হই।
-------------------------

আমাদের জানলার পাশে একটা আকাশ ঢাকার তোড়জোড় চলছে



আমাদের জানলার পাশে
একটা আকাশ ঢাকার তোড়জোড় চলছে।
সেখানে অবিরাম বেড়ে উঠেছে দালান।
সশব্দ নির্মাণ কাজ।

পাখিদের মৌনতা ভেঙে দিয়ে
শ্রমিকের আনাগোনা।
দ্যাখো, সবদিক কেমন মুখর মুখর!

ভাবছি ভোরগুলোকে নিয়ে।
প্রায় পাথর হবার আশঙ্কায়
দাগ ফেলছি কপালে,
টেবিলে,
কবিতার খেরোখাতায়।

জানি এই শীতে রোদ পড়বে না আর।
পড়ন্ত বিকেলে চশমার ছায়া
দীর্ঘ হবে না মোটেই ।

নারিকেলের পাতায় ইদানীং মন বসছে না আর।
অন্তত: কিছু একটা লিখবার আগে
আগেকার মত।
----------------------

খুব রোদ

খুব রোদ


শহরে খুব রোদ।
রোদের দরুন গলে গেছে বিলবোর্ড;
প্রসাধনের বিজ্ঞাপন।

সচরাচর ভিড় নেই তেমন।
চত্বরে কিংবা খোলা ময়দানে
চিমনির মত ঋজু দাঁড়িয়ে থাকে
ফ্ল্যাটবাড়িগুলো;
গলনের আশঙ্কায় ফুটন্ত ফুটপাথ।
আর সব অবসন্ন দুপুরে
সকলে কেমন চুপচাপ
রোদবন্দী হয়ে থাকে শুধু।
গোলাপী ছাতার যুবতী
মসৃণ ভ্রু বেয়ে তার
বয়ে গেছে তাপের নদী।
----------------------------------

পতঙ্গেরা উড়ে আসুক এই প্রবণতায়

পতঙ্গেরা উড়ে আসুক এই প্রবণতায়


পতঙ্গেরা উড়ে আসুক এই প্রবণতায়
ঘুমহীন কেটে গেছে আমাদের লীন রাত
দেয়ালে মথের মুখ দেখা হবে জেনে
দারুণ জেগেছে আজ।
এই ব্যালকনি-মনস্কতায়
তুমি তো প্রণয়প্রার্থী মথ
ডানার বিলাপে আদর চেয়েছো
বামন নক্ষত্রের কাছে
দেখোনি নিপাট মৃতদের উদাহরণ।
দেখোনি গৃহত্যাগী প্রসঙ্গে
আমিও কেমন যুগপৎ শুয়েছিলাম
নীল টাইলসের ফ্লোরে।

পতঙ্গের পাহাড়ে!
------------------------------

জুনের চিঠি

জুনের চিঠি



একটা চিঠি আসবে এবার।
নিকট ডাকবাক্সে।
যার ভেজা খামে জমা সব অফুরান বর্ষা,
আমাদের শীতল বিষাদ।
স্কুলপথে আকাশ দ্যাখেনি বলে
অভিযোগ ছিলো মলিন মুখে।
যখন থামেনি কোন মেঘ চার্চের চূড়োয়
বিভিন্ন বন্দর হতে এসে
এইখানে নমিত হয়েছে এমন
দীঘল ডানা ভেঙ্গে,
তারই পালক পেয়েছি আমি
স্খলনের বহু আগে।
ছাতাসহ আটক হলো যেবার
নিখিলের মেয়ে
কলেজের পথে যেতে তিমিত বর্ষায়।
আমিও জেনে গেছি ঠিক ঠাক
কোন্ চিঠি আসবে এবার
আমাদের নিকট ডাকবাক্সে
অন্তত: নিখিলের নামে।

-----------------------------

প্রাচীন দেরাজের কোণ

প্রাচীন দেরাজের কোণ



কলমটা খুঁজে পেলাম না আর।
এখানে ওখানে
ন্যাপথালিন উড়ে উড়ে
দেখি শুধু প্রাচীন দেরাজের কোণ পড়ে আছে।
স্মৃতির কপিকল বেয়ে উঠে আসে ফ্যামিলি এ্যালবাম।
হেডিং সমেত বিগত মুখ; বিগত চোখ।
প্রেমালাপের পত্রিকায় চুপসানো মলম হায়
পড়ে আছে কবেকার এখনো আধ খাওয়া
বিষণ্ন সিগারেট।

যেন কোন নবীন যাদুকর ফেলে গেছে ভুল গ্রিনরুমে
মলিন নোটবুক তার;
বিবিধ ম্যাজিক বিষয় পড়ে আছে এমন বিস্তর সরঞ্জামে।

কিন্তু কলমটা খুঁজে পেলাম না আর।
এখানে ওখানে
প্রাচীন দেরাজের কোণে...
-----------

পরমা' র অডিশন

পরমা' র অডিশন



এক চোখে গ্রহণ নামে
আর চোখে অন্ধকার
তবু নখর দেখেছি দারুণ।
কুচযুগে।

তাই জরুরী মুহূর্তে ভুলে গেছি সব।
যা কিছু মনে ছিলো।
ছিলো উইকএন্ডের শিডিউলে।
বিনম্র পোলভল্ট লক্ষ্য করে
হোটেলওয়ালি হেঁটে হেঁটে আসে
এবং ঠোঁট নাড়ে
অথবা নড়ে।
মথিত প্রসঙ্গে সে
শাড়ি খুলে ফ্যালে।
বুক খুলে দেখিয়ে দেয়
চাপা নিকেল পরন।
দেখেছি আঁইশের সিনেট
সেইখানে
প্রতি রোববারে
তার নাভিমূলে যারা যারা
জিভ চেটে গেছে।
আমিও শোভনীয় নই তেমন
পরমার পিঠজুড়ে
ডিম লাইটের আলোয়
অসাবধান হতে গিয়ে
বারবার বলে ফেলি-
আজ তাহলে আসি।
----------------------------

প্রফেসরের চোখ

প্রফেসরের চোখ


এখানে নিলাম হবে চোখের
যদিওবা মামুলি ধরনের
এক বেলেল্লা প্রফেসরের চোখ
অডিটরের মুখে জানা গেলো তাঁর পত্নী প্রসঙ্গে।
যিনি কিনা প্রচুর রূপসী ছিলেন বটে
বিহারী বিমান থেকে চুরি হবার আগে
এশিয়ার পথ ভুলে ছিলো যেবার
নহর দেশের বিমানবালা;
দোহারা গড়ন ছিলো যার

ঠিক তরুণীর মতন!

খুবলিয়ে তুলেছে সে চোখ
নিব্ পেন্সিলে
নভেলের চাপায় আজ মরে গ্যাছে সে
প্রফেসরের বেডরুমে।

----------------------------

বায়োস্কোপ

বায়োস্কোপ



কৃষ্ণচূড়ায় ছেয়ে গেছে রাজপথ
পানশালা মোড়
ফুটেছে এমন জুয়েলারির মতন
বিস্তর মথিত হয়ে
তাই আজ চোখ দেইনি
কোন শহরের ম্যাপে

গাছে গাছে লাল রঙ
ভরাট হয়ে এলে
রুটের বাস ফেলে
হেঁটে গেছি নির্লিপ্ত
একা

বিষন্ন হকার যখন
ডেকেছিলো অফিস পাড়ায়
চালশের লোকেরা
দেখেনি কিছুই
মাড়িয়ে চলে গেছে
মার্বেল লাল রোশনাই।
------------------------------

ওয়েনব্রেনারের জুতো

ওয়েনব্রেনারের জুতো


কত আর? এই ধরেন, মাস ছ'য়েক হবে আমরা একসাথে আছি।
তুমুল বর্ষার তারিখে দূর সম্পর্কের আত্মীয়ের মতন
আমরা প্রায়ই হেঁটে হেঁটে গেছি কোন পার্কের পথ ধরে।
এই সেদিনও অনেক গড়িমসি করে নামা
একটা বিকেলের বেঞ্চিতে বসে ভাবছিলাম এইসব।
ভাবছিলাম শতাংশ,
বিভিন্ন প্রাইজ ট্যাগ,
হয়তো ভাবছিলাম আরো অনেক কিছুই।

অথচ আমি কেমন অমলিন ভুলে ছিলাম
এই সুগভীর সম্পর্কের কথা।
কুয়াশার মাসগুলোতেও
যারা যথেষ্ট উষ্ণতা পায়নি আমার সেল্ফের কোণে,
ভেতরের দরজায় কিংবা সংলগ্ন পাপোশে
যারা নিয়মিত ভিজে গেছে স্নানঘরে
গত মাস ছ'য়েকে ওরা কেমন জেনে গেছে
আমার যাবতীয় অক্ষাংশ দ্রাঘিমাংশ।
নিবিড় জড়িত হয়ে গেছে আমার প্রতিটি পর্যটনে।
--------------------------------------

বোর্ডপিন ও সুরেশের গল্প

বোর্ডপিন ও সুরেশের গল্প


এই গেল রোববারেই শুনছি আবার অবরোধ ছিলো।
শহর ছিলো সচেতন; একটুও হাসেনি এমন সারাবেলা।
দেখেছি অফিসপাড়াতেও আসে নি তেমন কেউই।
সুরেশের ছেলেটি যেমন এসেছিলো গত জুনে;
সুরেশের সাথে।
রিডাকশনে কেনা জুতো পায়ে হেঁটেছিলো এদিক ওদিক।
পেতেছিলো কান আমার টেবিলের পায়ায়,
অফিসের দেয়ালে, আর সব গোছানো ফোল্ডারে।
খেলতে খেলতে কখন যে পেটে পুরেছিলো দু'য়েকটা বোর্ডপিন!
বুঝে উঠতেই কেটে গেলো আমাদের সব পরিপাটি রোদ।
মৃত ঘোষনার।

যদ্দুর মনে পড়ে সেই সুরেশের আর ছেলেপুলে হয় নি কোন।
কিংবা হলেও যথেষ্ট বাঁচেনি ওরা কেউই।
আমি ও আমার বোর্ডপিনগুলো যেমন বেঁচেছিলাম
এক গাদা শীতের ভোরে।
এই গেল রোববারেই যেমন হেঁটে এসেছি অনেক মহাদেশ।
টেবিল থেকে টেবিলে বরাদ্দ ছিল আমাদের অখন্ড অবসর।

-----------------------------------------------------

টিভি অভিনেত্রীর প্রতি

টিভি অভিনেত্রীর প্রতি


আজকের দিনে আর কারুরই জানতে বাকি নেই যে
আমি খুব দুর্মরভাবেই তোমাকে চেয়েছিলাম
সমস্ত টং এর দোকান, তাদের অলস খদ্দের
কিংবা স্টপেজের চৌকস টিকেট বিক্রেতা অব্দি জেনে গেছে
তোমার লিনেনের শাড়ি
প্রচ্ছদের গায়ে তোমার লিপস্টিকের রঙ।
এমনকী তোমার নীল টিপও শিখে গেছে ওরা

শীতের ভোরে অফিসগামী লোকগুলো
ফি বছর কেমন উচ্ছন্নে গেছে তোমাকে দেখে দেখে
বলা যায় সমগ্রভাবে শুধু তোমার চোখ ভেবে
ভুলে বসেছে দু'য়েকটা মহাসমুদ্রের মত জল রাশি।

তুমি কি তখনো হয়ে ওঠো নি
পর্যাপ্ত সেলুলয়েড?
------------------------------------------

বৃষ্টির ট্রাফিকে টিউশনি

বৃষ্টির ট্রাফিকে টিউশনি


তাৎক্ষণিকভাবে বৃষ্টিতে ভেজার কোন প্ল্যান ছিলো না।
বিশেষত এমন ব্যবস্হাপনায়
যখন খুব মিইয়ে গেছে আমার ছাত্রীর মুখ।

বিপুল মিনিটে ক্রমেই দেরি করে ফেলছি আমি
এই পালিশের দোকানে
সেতু নির্মাণে জড়িত
একজন পরামর্শক জানাচ্ছেন
এবার মিনারে মাতম হবে
অতএব, না ভিজে যাবেন কোথায়?

মাননীয়া প্রধানমন্ত্রী এবার জাতিকে কিছু চমক দিয়েছেন বটে।
যারা নাকি প্রত্যেকেই দিকাক্ষের মত আশাজাগানিয়া
এবং যথেষ্ট মেঘমেদুর।
------------------------

রেণু বিষয়ে

রেণু বিষয়ে


বিগত দশকেও রেণু এরকমই ছিলো।
ঘুম ভোরে উঠে গিয়ে কেমন একটা বিষাদে যুক্ত হতো।
আমি বিছানায় শুয়ে শুয়ে
তার অবারিত টুং টাং শুনতাম।
শুনতাম কিচেন থেকে ভেসে আসা জল পড়ার শব্দ।
ধোঁয়া ওঠা কেটলি আর কাপের শব্দ।
আমি তখন দু'কানে বালিশ চেপেও
সহস্র চুড়ির শব্দ পেতাম।
এখনো যেমন আমার সমস্ত দেয়াল জুড়ে থাকে
মৃত প্রজাপতির দল।
এবং গ্রথনে ওদের পৃথিবীর রোদ।
জানালার গ্রিল বেয়ে গোপনে নেমে আসে যখন
রেণুর আলনায়,
ড্রেসিং টেবিলে
কিংবা
খুব এটিকেট মানা শুধু ঘুমের চাদরে।

অথচ তারপর থেকে তেমন কিছুই ঘটেনি রেণু বিষয়ে।
এমনকি বিগত দশকেও রেণু এরকমই ছিলো।
ডাইনিং টেবিলের ভোরে আমার অপেক্ষায় থেকে থেকে
যথেষ্ট বিষণ্ন একটা অমলেট হাতে।
------------------------------------

অনুমোদিত রিসেপশনিস্টের সাথে হোটেল লবিতে

অনুমোদিত রিসেপশনিস্টের সাথে হোটেল লবিতে


চোখ চলে যায় পৃথিবীর শেষ দরজায়।

উড়ন্ত চাবির সহিস হয়ে
যখন প্রমেহ জেগেছিলো মনে।
রিসেপশনিস্ট মেয়েটির গহীন ক্লিভেজে।

দেখা গেলো বহু চাঁদ ঝুলে আছে অবসরে
একটা অনুমোদিত দূরত্ব রেখে
খুব শুনশান হোটেল লবিতে।

------------------------------------

বিষাদ যাপন কেন্দ্র

বিষাদ যাপন কেন্দ্র

বসে আছি পার্কের নির্জনতম বেঞ্চিতে।
মুঠো ভরে নিয়ে তোমার সমস্ত পেলবতা
ক্রমশ: দূরবর্তী হই লেকের জলে ভেসে ভেসে।

যেন বহুকাল আগে
এখানেই হয়েছিলো ছিনতাই।
পায়রার পালকে গেঁথে
এইখানে এই লেকের তীরে
এসেছিলো যারা বিষাদ যাপনে।
বিস্তীর্ণ আকাশ ফুঁড়ে
উড়ে গেছে ওদের রকেট।
পার্কের সব ত্বরণ ভুলে গিয়ে
আরো নির্জন কোন বেঞ্চির খোঁজে।

-----------------------------------

পি-কক সন্ধ্যায়

"পি-কক" সন্ধ্যায়



একজন ওয়েটার এসে
ভুলিয়ে দিচ্ছে বারবার।
কটাক্ষে দেখছে 
এবং বলছে-
কোন কয়েনই অবশিষ্ট নেই আর।

কোন কয়েনই অবশিষ্ট নেই আর
আমাদের টেবিলে,

টেবিল সংলগ্ন ক্লথে।
ক্রমশ: গভীরমান এমটিভির পর্দা জুড়ে
একজন গ্রাফিক্যাল ভিজের সমস্ত সুহাসে।

অথচ কি এক গুহ্যকের মত
শুধু একটা গ্লাস আঁকড়ে পড়েছিলাম আমি।
যেন অদূরে কোন শেরাটনের শহর থেকে 
নেমে এসেছিলো ওরা।
এসেছিলো আমারই টেবিলের ক্লথে।
ঘুম ও ঘোর মদিরে
একদিন ভিজেছিলো এমন বিস্তর।
বুনোট ফেলে রেখে সব
এসেছিলো এমন মদ্যপ সুদূর!

ঋতুগত বিপণন

ঋতুগত বিপণন


মৌসুমি বাতাসে চেপে
এসেছিলো গোধূলির বাস।
দূর-পাল্লার।

ফেলে এসে ভুল পথে
তাহার সমস্ত তেল তৈজস
পেতেছিলো কি অপরূপ! এইখানে
এমন বৈশাখের রাতে।


বিষাদের ঘুড়ি কেটে কেটে
যারা হেসেছিলো অমলিন।
হয়তো আমিও মুখর ছিলাম তখন
ওই সব তীব্র রোদের মত তারিখে।
হাওয়ায় হাওয়ায় অবারণ পুলকে
দেখা হয়েছিলো আমাদের।
প্রচুর সময়ে
ঋতুজ অবসাদের এই প্রখর জ্বরে।

-----------------------------------------

ইজি চেয়ারে

ইজি চেয়ারে


জানা গেল না
কি ছিলো ফার্ণের পাতাদের মনে?
সমস্ত বারান্দা ও তাহার গ্রিল জুড়ে।
পয়মন্ত প্রদোষে।

তবুও শেষ সম্পাদকীয়তে
লেখা ছিলো আমার সব অসুখের কথা।
প্রতিটি পিক্সেলে পিক্সেলে
ফুটেছিলো সুদক্ষিণ।
মৃদু দ্রাঘিমা রেখায়।

এমন অসময়ে কেউ
চায়ের কাপ হাতে হেঁটে এলে
আমি একে একে লুকিয়ে ফেলি
আমার সকল গোলার্ধ;
পর্ণমোচী বিকেল।
--------------------------------

রিকশাযাত্রীর চোখ

রিকশাযাত্রীর চোখ


সিনেমা হলের সবগুলো চৌকসগ্রন্থি মিলে
আজ কোন বিষাদ লিখে রাখেনি।
হোটেল নীলিমা আবাসিক-এর দক্ষিণমুখী জানলা থেকে
উদগ্র নেমে আসেনি
কোন রাত্রিকালীন চুপিসার।
সমস্তটা নীল হয়ে ওঠে নি এখনো
এই সেগুনবাগিচায়।
আমি তবু ঊন মূক বসে আছি
তার বিস্তৃত যানজটে।
গনপূর্ত অধিদপ্তরের সমস্ত গা জুড়ে
স্টাফবাসটা ঘাই মারছিলো বিকট।

আমি অনিমিখে দেখে নিয়েছিলাম
এক জোড়া বিপরীতগামী চোখ।
বহুদূর সিগন্যাল ফেলে এসেও
যা মৃতবৎ লেপ্টে ছিলো
এপ্রিলের পূর্ণিমায়;
আমার বুক পকেটের ভাঁজে ।
----------------------------

বাথটাবে

বাথটাবে


প্রশ্ন উঠতেই পারে এইরূপ স্বমেহনে।
কিছু বুদ্ধ্যাঙ্ক মাফিক সভা কিংবা
প্রস্তাবিত চায়ের কাপ ফেলে
যারা চলে গেছে খুব দীঘল
বিকেল-মনস্ক রাস্তায়
নিরুপম হেঁটে হেঁটে।
হয়তো ভেবেছিলো
গহীন মেনোপজ
অথবা কোন যৌনতা শীর্ষক পাঠে
কারো রতিপ্রিয়তার অজুহাতে
যখন নিশ্চিতভাবে শুয়েছিল বাথটাবে।
----------------------------------------

মূলতঃ অমুদ্রিত ভ্রমন্থন

(১)
তখনো বিশেষ অতিথি লোকটা
চেয়েছিলো বিকট।
অবধারিত পনেরো ডিগ্রীতে কৌণিক সভায়
মুখায়নের তুরি কেটে কেটে
একজন সভ্যতা'র মা মরে গ্যাছে জেনে
আধাগেরস্ত পরিচ্ছেদে।

সে ফিরে গেলেই বাস্তবিক ধারনা করা যায়
মূলত: উগ্রপন্থী বলতে কি বোঝায়?


(২)


বহুবিধ প্রেয়সী হেসে
কখনোই বলবে না আর
সঘন বিনুনিতে এমন সঘন সঞ্চার
এমনই নিরালম্ব ভেবে
এই সব বিভাবরী পাঠ
বিষয়ীভবন মুখে সহিস ও চৌকাঠ
তবুও প্রশ্নমুখিন মেঘে
এতো বিস্তারিত মন্থন
পাহাড়ের আশা করে দুই নীলঘুম স্তন।

--------------------------------------

দুই লাইন

১.

সমস্ত চাদর জুড়ে

ঈষৎ প্রোটিন শৈলী

একহিম ঘুমের পরেও

পড়ে আছে বিস্তর

সঙ্গমে

যোনি কেশরের মূল ঘামে

এবং

চূড়ান্ত শিথিলতায়

ওরা যেন কত রাষ্ট্রীয় গোপন!



২.

অনেক নিমগ্নতার পরে

শুধু এক ফালি ব্যালকনি এলো

যার গভর্নরের ছোট মেয়েটি

আমার ক্লাসমেট ছিলো।

-------------------------

আর্টের স্কুল-বায়োগ্রাফিমূলক ২

মাঠের এক কোনায় দেখি একটা প্রকান্ড আম গাছ কয়েকটা বিল্ডিং এর দোতলা,তিনতলা আর খানিকটা আকাশ আড়াল করে দাঁড়িয়ে আছে।পাশ ঘেঁষে যে আস্তরহীন দেয়ালটা চলে গেছে তার কিয়দংশ এই মহীরুহের প্রতাপে যেন আরো জরাজীর্ণ হয়ে উঠেছে।এমনিতেই সারা গায়ে তার কানা ঘুপচির ঘাটতি নেই,তার উপর প্রতিবেশীর শিকড়ের ক্যাপিটালিস্ট মনোভাবের কারনে বেচারা বড় ভগ্ন হৃদয়।এই দেয়ালের সমান্তরালে অনেক গুলো মাঝারী থেকে ছোট হাইটের ফুল গাছ,তার মধ্যে একটা বোধ হয় রক্তজবা,সনাক্তকারী চিহ্ন হিসেবে কয়েকটা ঢাউস সাইজের লাল রঙা ফুল দেখে বিজ্ঞের মত সিদ্ধান্ত নিলাম।এতো বড় জবা ফুল আমি দেখিনি আগে।বাকি গুলোর ব্যাপারে খুব একটা নিশ্চিত হওয়া গেলো না।তাছাড়া বেশ কিছু পাতাবাহারী মনে হলো।খুব সুন্দর পাতা ওয়ালা গাছে নাকি কখনো ফুল হয় না।অথচ এই পড়ন্ত বিকেলের আবছায়ায় ঐ গাছগুলোকে কি ফুলেল দেখাচ্ছে!প্রতিটা পাতাই যেন একেকটা ফুল।ফুলবাহারী সব গাছের আলাদা ডাক নাম থাকে কিন্তু এই সুন্দর পাতার গাছগুলোর নিজেদের কোন নাম নেই।সবারই একই পদবী-পাতাবাহারী।ফুলঘটিত এই বায়াসড নামকরন প্রথা মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে বেশ।অন্তত: কিছু গাছের পাতার নামে নাম দেয়া উচিত ছিলো। তো এই ফুল আর পাতা নিয়েই একটা ছোটখাটো লম্বা বাগানের মতো।চারপাশে ইট জড়ো করে তার সীমানা নির্ধারন করে দেয়া হয়েছে।ধারনা করা যায় খানিকটা-আকাশ-আড়াল- করা প্রকান্ড আম গাছটাও কোন এক কালে এই বাগানেরই বাসিন্দা ছিলো।যদিও সীমানালঙ্ঘী স্পর্ধায় এখন সে নিজেই একটা গ্লোবালাইজেশনের মডেল হয়ে উঠেছে।
সীমানার এপারে এক চিলতে মাঠ।কোথাও ঘাসের চিহ্ন মাত্র নেই,শুধু ধূলো আর বালি।বালিতে অনেক আসা যাওয়ার ছাপ।একটু আগেও যেন ধূলো উড়ানো খুব ব্যস্ত সময় গেছে তার।তবুও ঐ বেড়ার ঘরগুলো আর খানিকটা-আকাশ-আড়াল-করা আম গাছটার শেষ বিকেলের ছায়ায় মাঠটাকে কেমন যেন বিষন্ন মনে হচ্ছিল।ফ্রকে মুখ গোঁজা "মন ভালো নেই" কিশোরীর মতো একরাশ ধূলো-মলিন বিষন্নতা!
দূরে তাকিয়ে দেখি বিপুল সংখ্যক কাক বাসা বেঁধেছে গাছটাতে।ওদের বিস্তর ডাকাডাকিতে আর সশব্দ পয়: নিষ্কাশনে মাঠের বিষন্ন নীরবতা ভেঙ্গে খান খান হচ্ছে।বেড়া দেওয়া ঘরগুলোর টিনের চালে থেমে থেমে শুকনো ডাল পালা আর কচি আম পড়ার শব্দ শুনছি।টিনের চালের নিচে যারা বসে ছবি আঁকছে ওরাও নিশ্চয়ই খুব বিরক্ত হচ্ছে।নামেই শুধু আম গাছ,কাজেকর্মে তো দেখি আস্ত একটা কাকগাছ!


আজ বহুদিনপর আমার আর্টের স্কুলের একটা বিকেলকে ধরতে গিয়ে এমনি কিছু বিচ্ছিন্ন পুলক জাগছে মনে।সেদিন অবশ্য এই অলস বালকের কোন ভাবেই পুলকিত হবার অবকাশ ছিলো না।বরং সেচ্ছাচারী শুক্রবারের বিকেলগুলোকে এভাবে অফিসিয়ালি মৃত ঘোষনা করার মৌন প্রতিবাদ হিসেবে হাঁড়ি মুখ করে বসেছিলাম দারোয়ানের বেঞ্চিতে।এই শেষকৃত্য অনুষ্ঠানের মূল পুরোহিত যিনি,আমার মা এই হাঁড়ি ভর্তি তীব্র প্রতিবাদকে দিব্যি রসমলাই বানিয়ে দিয়ে হাসিমুখে এক আন্টির সাথে খোশ গল্পে মেতে উঠেছিলেন।খানিক বাদে ঐ আন্টিও দেখি আমার দিকে তাকিয়ে রহস্যময় হাসি দিলেন।বলাবাহুল্য সেই হাসিতে আমি কোন স্বপক্ষ সমর্থন খুঁজে পাইনি,পেয়েছি "কাঁদে না খোকা সব ঠিক হয়ে যাবে" টাইপের সমবেদনা।

আমি যেখানটাই বসে ছিলাম তার বাঁ পাশেই খুব নিচু একটা গেইট।বড়রা সবাই অসহায়ের মত মাথা নিচু করে ঢুকছে কিংবা বেরুচ্ছে।হয়তো ছোটদের স্কুল বলে এই বিশেষ ব্যবস্হা।বড়দের স্কুলে যেমন বড় বড় গেইট, ছোটদের স্কুলে তেমন ছোট ছোট গেইট।পাশে বসা দাড়িঅলা বৃদ্ধ লোকটা কয়েকবার আমার সাথে খাতির জমানোর চেষ্টা করে এখন চুপ মেরে গেছে।কী বাবু?তোমার নাম কি?কোন কেলাসে পড়ো?
এই সব হাবিজাবি সবাই যা বলে আর কি!এমনতেই একটা প্রতিকী অনশনের মত চলছে।এর মধ্যে উটকো ঝামেলা!তাই আমি না শোনার ভান করে খানিকটা-আকাশ- আড়াল-করা আম গাছটার দিকে তাকিয়ে থাকলাম।বেশির ভাগ লোকজনই দেখি আমার নাম আগে থেকে বলে দেয়।যেমন এই দাড়িঅলা কি সুন্দর আমার নাম ধরে ডাকছে-বাবু। জানোই যদি আমার নাম "বাবু",তাহলে আবার জিজ্ঞেস করার মানে কি?লোকটা একটা পাতা কুড়িয়ে আমার সামনে ধরে বলল,

--"কন তো দেহি এইডার রঙ এমন হলুদ হইছে ক্যা?আগে তো সবুজ আছিলো? নাকি?"

--"বুড়ো হয়ে গেছে তো ,তাই হলুদ হয়ে মরে গেছে"

দাড়ির ফাঁকে মৃদু হেসে,
--"আমি তো বুড়া।আমার রঙ হলুদ হয় না ক্যা?"

--"আপনি তো পাতা না।তাছাড়া মরে গেলে আপনিও হয়তো হলুদ হয়ে যাবেন"

লোকটা দেখি এবার শব্দ করে হেসে উঠলো।দাড়ির ফাঁকে পান খাওয়া দাঁত দেখা যাচ্ছে।আমার দিদার দাঁতগুলোও এরকম দেখতে।লোকটার তারপরও শব্দ করে হাসতে থাকে।তার চোখের কোনে বিন্দু বিন্দু পানি জমছে।এ হাসি কান্নার মানে কি?
সশব্দ হাসির লোকগুলোকে আমার বিশেষ পচ্ছন্দ না।এ ব্যাপারে আমার কিছু ভয়ংকর অভিজ্ঞতাও আছে।আমি তাই একটা উঠি উঠি ভাব নিতে যাচ্ছি,এমন সময় দেখি মা বেরিয়ে আসলেন ভিতর থেকে,হাতে একটা খাতা আর রঙের বাক্স।পরে জেনেছি এ লাইনে এটাকে পেস্টেল কালার বলা হয়।তো বিবিধ উপায়ে এই রঙের বক্সের প্রতি আমার আগ্রহ তৈরী করার একটা সাময়িক এবং স্হানীয় প্রচেষ্টা চলল কিছুক্ষণ,এই প্রচেষ্টায় কিছু আগে চোখে পানি জমা হওয়া বৃদ্ধ এবং রহস্যময়ী হাসি-আন্টিও হেসে যোগ দিলেন।তাদের তীব্র চাপের মুখে আমি হাঁড়ি মুখ নিয়েই একটা ক্লাসরুমে প্রবেশ করলাম।এই ক্লাসের নাম নাকি "হাসিখুশি"।

বালকের আকাশদর্শণ-বায়োগ্রাফিমূলক ১

মা কে পাশে রেখে হুডতোলা রিকশায় আমি চোখ পাতি বাইরে।শুক্রবারের আসন্ন বিকেল।রাস্তা তো নয় যেন পিচ ঢালা ফুটবল খেলার মাঠ।তাই রিকশা চলছে দ্রুতলয়ে।এবড়ো থেবড়ো রাজপথ অভদ্রের মতো তার অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে প্রায়শ। ঘুম চোখেও আমি অস্হিমজ্জায় টের পাই তাদের সশব্দ এবং কর্কশ কথোপকথন।দীর্ঘ সাতদিনের এক আপোষহীন রুটিনের পরে এই শুক্রবারের বিকেলগুলো আমার জন্য দেবতার উপঢৌকনের মতো ছিলো।"যা খুশি কর্"-ব্যাপারটার মধ্যেও একটা সুক্ষ কারচুপি আছে বলে আমার বিশ্বাস।দেখা গেল প্রায় আমার এই সাধের ইচ্ছেমতন বিকেলে আমি বাবার কাঁধ জড়িয়ে পরম আনন্দে ঘুমিয়ে আছি।সেই সুত্রে ঘুমও একটা ব্যক্তিগত শখের ব্যাপার হতে পারে।যদি এমন একটা বহুজাতিক কোম্পানির চাকরী পেতাম যেখানে স্যুট-টাই পড়ে নটা-পাঁচটা ঘুমিয়ে থাকার জন্য মাস শেষে কড়কড়ে নোটে মাইনে দেবে।সাথে ফেস্টিভল বোনাস,মেডিকেল কেয়ার,ট্রান্সপোর্ট ফি সহ আরো কতও কী!!-আহা!!কী ঘুমবিলাস। তো এই ঘুম তাড়িত বৈকালিক সৌখিনতা সপ্তাহের অন্যান্য দিনগুলোতে আমার মার যথেষ্ট সৌজন্যবোধের অভাবে হরহামেশাই মুখ থুবড়ে পড়ে।পুত্রের ব্যক্তিগত শখের ব্যাপারে মার হয়তো আপত্তি নেই মোটেও কিন্তু এখনো দ্বিতীয় শ্রেণীতে অধ্যয়নরত নাবালকের ব্যক্তি হয়ে ওঠার ঔদ্ধত্যে তিনি মা হিসেবে কপালে শতকোটি বলিরেখা আঁকবেন,অত:পর প্রয়োজনবোধে নানাবিধ উপকরনসমেত (উদাহরনস্বরূপ-আমার রুলটানার স্কেল,ভাতের চামচ)তেড়ে আসবেন অশনী গতিতে-এটাই প্রচলিত সমাজের চিত্র।বলাবাহুল্য আমার মা এই চলচ্চিত্রের একজন সুদক্ষ কৌশলী।এছাড়া অন্যান্য সময়ে তিনি কলেজে রসায়ন পড়ান।এই রসায়ন বিষয়বস্তুটা যে কি পরিমান রস বিবর্জিত তা বোধকরি দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়ার বহুআগে থেকেই আমি হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করেছিলাম এবং উচ্চ মাধ্যমিক পড়ার সময় পুরাকালের উপলব্ধির সাথে ভুক্তভোগী বাস্তবতার একটা নান্দনিক মেলবন্ধন তৈরীর অবকাশ পাই।রসায়ন শিক্ষার অবসরে মা র নানাবিধ রাসায়নিক কর্মকান্ডে আমরা পরিবারের সবাই (এমনকী ক্ষেত্রবিশেষে বাবাও)বিক্রিয়ক হবার আশঙ্কায় তটস্হ থাকি সারাক্ষণ।বাবা গনিতের লোক।আটপৌরে,সাধাসিধে,কারো সাতে নাই পাঁচে নাই টাইপের বিশেষনগুলোর এক সাক্ষাত মুখপাত্র।সারাদিন দেখি ইংরেজী এ্যালফেবেট নিয়ে কি সব কাটাকুটি!!a আর b যোগ করলে কিভাবে c হয় এই চিন্তায় আমার প্রায় রাতে ঘুম হয় না অবস্হা।মাঝে মাঝে বড়োদের উপর বেজায় রাগ হয়।ওরা নিজেদের বেশি বেশি চালাক ভাবে।রসায়নবিদ হবার সুবাদে মাকে আমি কখনো দেখি নাই লম্বা চুলের বেনী দুলিয়ে সারা ঘরময় আনমনে গুন গুন করে বেড়াতে কিংবা আমার গনিতবিদ বাবাকে নাকের ডগায় চশমা ঝুলিয়ে কোন স্বাস্হ্যবান কবিতার বই হাতে সুনশান প্রশান্তমুখ।এহেন ডেডিকেটেড গনিত আর রসায়নের মিউচুয়াল আন্ডারস্টেন্ডিংএ আমার মতো নচ্ছার অলস মস্তিষ্ক উৎপাদিত হবার প্রবাবিলিটি এতোই ক্ষীণ যে মটরশুটিবিদ্যা অনুসারে আমার প্রপ্র-পিতামহের কাউকে না কাউকে অবশ্যই বাঈজী দলের সর্দার হতে হবে।

তো শুক্রবারের বিকেলে ঘুমানো ছাড়াও আরো একটি সাংঘাতিক গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো --বারান্দায় বসে আকাশ দেখা।সবাই যখন ঘুমিয়ে থাকে তখন আকাশের অনেক নিচে একটা পুকুর।পাড় ঘেঁষা রাস্তা-মানুষ।একটা কাঠমিস্ত্রির দোকান।ওদের অবিরাম ঠুক ঠাক।একটা কাঠের ফ্রেমে খোদাই করা অবিকল মানুষের মুখ।বাবা বলেছে উনি আমাদের দেশের প্রেসিডেন্ট ছিলেন একসময়। প্রেসিডেন্ট ছিলো বলে তার মুখ খোদাই করে রাখতে হবে?প্রেসিডেন্টের তো ভারী মজা!!অথচ লোকগুলো সারাদিন কি কষ্টটাই না করছে এই ফ্রেমের পেছনে?ওদের তো আরো অনেক কাজ থাকতে পারে-খাট পালং চেয়ার টেবিল আলনা শো কেস শেলফ আরো কত কি পড়ে আছে!এসব মন-খারাপে আমারও প্রেসিডেন্ট হওয়ার সাধ জাগে।পরে ওদের সবাইকে ডেকে বলবো-তোমরা তোমাদের কাজ করো।আমার মুখের ফ্রেম বানানোর কোন দরকার নেই!

মাঝে মাঝে অবশ্য শুধু আকাশ দেখেই কাটাতে হয়।আমাদের রেলিংটা আমার মাথার চেয়ে বেজায় উঁচু হওয়ায় পায়ের তলায় মোড়া ছাড়া আমি নিচের পৃথিবী দেখতে পাই না।তখন বাসার অনেকে মিলে টেলিভিশন দেখে,শুক্রবার বিকেলে টিভিতে সাদা কালো ছবি।তাই মোড়া খালি পাওয়া যায় না।অবশ্য আমার আকাশ সবসময় রঙীন থাকে।আমি মেঘ গুলোর যাওয়া আসা দেখি।কারো খুব তাড়া!!এই এলো এই চলে গেলো।কেউ কেউ খুব বড়ো।ওদের অতো তাড়া নেই।অনেকক্ষন তাকিয়ে থাকলে আমি ওদের মধ্যে চেনাজানা জিনিস পত্র দেখি।মনে হয় ওরা ইশারায় কিছু বলছে।কখনো ইশারা সহজ থাকে।কখনো কোন মাথা মুন্ডু খুঁজে পাই না।একটা পিঁপড়ের পেটে আস্ত বাঘ ঢুকে যাচ্ছে এটা নিশ্চয় খুব একটা ভালো ইশারা না।তারপরও আমি সায় দেই--"অ বুঝছি! বুঝছি!"
মেঘমানুষ!!পরে কি না কি মনে করে বসে?

কোন মৌসুমে আকাশে ঘুড়ির মেলা বসে।আহা! সে এক দৃশ্য বটে।এতো এতো ঘুড়ি।অথচ ঘুড়ির মানুষ দেখি না একটাও।কোন কোনটা মনে হয় আমাদের ছাদ থেকেই উড়ছে।আমার মনে হয় এই খেলায় মানুষের চেয়ে ঘুড়িই বেশী মজা পায়।আকাশের কাছ থেকে কেমন লাগে দেখতে?কিংবা মেঘগুলো থেকে আমাদের বাসা কেমন দেখা যায়?ঘুড়ি ওড়ানোর প্রতি আমার খুব একটা আগ্রহ দেখিনা কিন্তু ঘুড়ি হওয়ার খুব শখ আমার।গুনীজনে কি সাধে বলে-অলস মস্তিষ্ক শয়তানের কারখানা?

তো এই অলস মস্তিষ্ককে গতিশীল করতেই মার সহিত আমার দ্রুতগতির এই রিকশাভ্রমণ।আমার ইচ্ছে-বিকেল গুলোকে একটা সামাজিক রূপদানের মা-গত আরেকটি প্রয়াস।আমাদের গন্তব্য আর্টের স্কুল।

জন পেট্রিক শেনলির চলচ্চিত্র "দ্য ডাউট" এবং মেরিলের ঝুলিতে প্রায় তৃতীয়-অস্কার

কি ভেবে আজকে হিসেব কষে দেখলাম, ইহ-জীবনের একটা বৃহৎ অংশ জুড়ে আমি একটা ১৫ ইঞ্চি এলজি মনিটরের দিকে তাকিয়ে থেকেছি।
ভাবতেই কেমন এক বিষন্নতা গ্রাস করলো।আহা! পরিবর্তে কোন রূপসীর পানে এতো দীর্ঘ সময় নিবিষ্ট হলে হয়তো এই ভয়াবহ প্রতিযোগিতামূলক জগৎসংসারে এতো দিনে আমার একটা গতি(কিংবা দুর্গতি) হয়ে যেতো।ফিবছর ভবসংসারের নানাবিধ টানাপোড়েনে পেন্ডুলামের মতো ঝুলে থাকতুম না মোটেও। তো এই হতচ্ছাড়া ক্লীব পদার্থের সান্নিধ্যে আমার প্রিয়তম মূহুর্তগুলো কেটেছে কোন না কোন মুভি দেখে, বিটিভির ভাষায় যাকে বলে পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র।প্রথমেই আমি বলে নিচ্ছি পাঠক আমি আসলে একজন দ্বিতীয় শ্রেনীর সিনেমা দর্শক,যে কিনা এখনো প্রাণপনে প্রথম শ্রেনীতে উঠার চেষ্টা করে যাচ্ছে এবং বার বার ব্যর্থ হচ্ছে তার সাবকন্টিনেন্টাল ইমোশনের কারনে যা হয়তো পুরোটাই জেনেটিক বিদ্যার আশীর্বাদ।দ্বিতীয় শ্রেনীর দর্শক আমি তাদেরকে বলি যারা এখনো প্রিয় অভিনেতা-অভিনেত্রীর লিস্ট ধরে ছবি দেখেন এবং হরহামেশাই ভুলে থাকেন যে ছবিতে "ডিরেক্টর" বা "পরিচালক" বলে একটা মানুষ থাকে।পুরো ছবি জুড়ে যার আসা যাওয়া, পুরো রিল জুড়ে যে পুরোধার কষ্টের ঘাম লেগে থাকে।আমি নিজেও হরহর করে শ খানেক অভিনেতা অভিনেত্রীর নাম বলে দিতে পারি,কিন্তু ডিরেক্টরের বেলায় বারবার হাতের
কর গুনি।সাবকন্টিনেন্টাল ইমোশন হলো আমাদের এই এলাকার জনগোষ্ঠির একটা সানক্তকারী বৈশিষ্ট্য যার কারনে আমরা পর্দার মানুষগুলোকে খুব আপনার লোকজন বলে ভাবতে শুরু করি সে খেলোয়াড়ই হোক কিংবা অভিনেতা-অভিনেত্রীই হোক।পর্দায় ভালো লাগছে ব্যস!যথেষ্ট।তো আমিও নিজেকে এই দোষে দুষ্ট বলে মনে করি এবং প্রায় ঘুম থেকে চোখ মেলে দেখি কেট উইন্সলেট মাথায় ঘোমটা দিয়ে হাসি হাসি মুখ করে আমার সামনে চা হাতে দাঁড়িয়ে আছে।কিংবা আমার সারা ঘরময় গুন গুন করে রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইছে এলিসিয়া সিলভারস্টোন------"আমার মল্লিকা বনে যখন প্রথম ধরেছে কলি আমার মল্লিকা বনে......."ঠোঁটে লেগে থাকে সেই খুনী হাসি!!অথবা অদ্রে তুঁত আপাত দুর্বোধ্য ভাষায় আমার চুলে বিলি কেটে দিচ্ছে,হয়তো বলছে "কি দাড়ি কাটো না কেনো?"


যে ছবি নিয়ে লিখতে বসা তার নাম "দ্য ডাউট"।পাঁচটি বিভিন্ন নমিনেশন আছে এ ছবির নামে এবারের অস্কারে।এটা অবশ্য কোন কাজের কথা না কারন আমি রেফারেন্স ধরে ছবি দেখি না কখনোই।তার উপর এসব পুরস্কারদাতা এবং গ্রহীতাদেরকে প্রায় আমি বাঁকা চোখে দেখি,যেমন এবারো দেখবো চোখের সামনে দিয়ে "স্লামডগ মিলিনিয়ার" ঝুলি ভরে একগাদা অস্কার নিয়ে যাবার পর।কিংবা সেভেন পাউন্ডসের মতো ছবি যেখানে কোন নমিনেশনই পায়না।

"দ্য ডাউট" দেখতে বসা সুন্দর নাকের মানুষ মেরিল স্ট্রিপের খাতিরে যার অভিনয় দেখে প্রথম যৌবনেই মনে হয়েছিলো "কেনো আরো আগে পৃথিবীতে আসলাম না?" কিংবা "আমি যদি বেনজামিন বাটনের মতো সুদীপজামিন বাটন হতাম"।
"জন পেট্রিক শেনলি" এই নামটা আমার পিতৃদেব যেমন কোনদিন শোনেন নাই তেমনি ছবি দেখার আগে আমিও কোনদিন শুনি নাই।অথচ কি ভয়াবহ সুন্দর একটা ছবি উপহার দিলেন!গভীরতম অনুভূতি নিয়ে কি চুলচেরা চলচ্চিত্র!মূল উপন্যাসটা আমার পড়া নাই তারপরেও এরকম মাস্টারপিসের জন্য একটা জোরদার হাততালি পেতেই পারেন।আশাকরি অস্কার কমিটি তাকে নিরাশ করবে না।যদিও এ অভিজ্ঞতা তার নতুন নয়।

আফসোস লাগছে অপরাহ উইনফ্রের জন্য যিনি অনেক চেষ্টা তদবির করেও শেনলির মন গলাতে পারেন নি।মিসেস মিলার সত্যিকার অর্থেই তার জন্য লোভনীয় চরিত্র ছিলো।শেনলি নাকি তাকে স্ক্রিপ্টই পড়তে দেন নি।বেচারি উইনফ্রে!ভাইওলা ডেভিস অবশ্য মাত্র দুই দৃশ্যে অভিনয় করেই মাতিয়ে দিয়েছেন।বোঝেন তাইলে রোলটা কি ছিলো?

"ভেবে ভেবে কুল পেলাম না" অবস্হা হয়েছে নাটালি পোর্টম্যানের কথা চিন্তা করে ,কেন তিনি সিস্টার জেমস হতে রাজি হলেন না?যেখানে অ্যামি এডামস এইবেলা একটা নমিনেশনও জুটিয়ে ফেললেন।

হফমেনের ব্যাপারে আমার একটু এলার্জি আছে আগে থেকেই যেটা এই ছবির পরেও রয়ে গেছে।

আর অনবদ্য মেরিল স্ট্রিপ!বয়সের সাথে পাল্লা দিয়ে অভিনয় করছেন।"বৃদ্ধ বয়সে সৌন্দর্য্যে ভাটা পড়ে"----যতসব গাঁজাখুরি গপ্পো!!পুরো ছবিতে তার ব্যক্তিত্ব যেন ধারালো ছুরির মতো এফোঁড় ওফোঁড় করে দর্শক হৃদয়।শেষ দৃশ্যে তার অসহায় স্বীকারোক্তি----দাগ কেটে থাকবে বহুদিন।

আমি যদি অস্কার কমিটিতে থাকতাম এইবার (কী ছাইপাশ খেয়েছিস বল!!) এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতাম নির্ঘাত।আমার দুইজন প্রিয় মানুষ একই ক্যাটাগরিতে বেস্ট একট্রেস নমিনি।দ্বিতীয় শ্রেনীর দর্শক হিসেবে এক সাংঘাতিক কঠিন কাজ বটে!যদিও রিডারে কেটের পুরনো বদঅভ্যেস বশত: অবলীলায় বস্ত্রবিসর্জন আমাকে বরাবরের মতো বিব্রত করেছে।তদুপরি মন-খারাপ হই পরপর দুটো ছবিতে এমনতর স্যুসাইড দেখবার পর।কিন্তু অভিনয়ে আবারও ঘোর লাগে।আবারও মোহে পড়ি খুব সানন্দ্যে!

ক্যান্টিনে

ক্যান্টিনে


স্হবিরতম ভোরগুলি সাধারনত আমার ক্যান্টিনে কাটে।
অর্ডার দেওয়া খাবারের অপেক্ষায় থেকে থেকে।
এইসময়ে ঘাড় উঁচিয়ে আমি সিলিংটাকে দেখি।
দেখি তার থেকে খানিকটা নিচে একটা ফ্যান
কেমন সুবাস্তু ঝুলে থাকে।
আমি আপাদমস্তক গ্লাসে মুড়ে দেওয়া দেয়ালটাকে দেখি।
দেখি আয়ানাঘরের প্রকরণ ভেঙে
একটা দুর্বৃত্ত নেমে আসে যেন।
এইসব ভোর এবং প্রতিসরী স্কয়ারের ভিড়ে
তাকে হারিয়ে ফেলি পলকে।
মাশরুমের দীর্ঘ গুনাবলি পড়ে পড়ে
অলস ঘুম নেমে এলে
চেয়ে দেখি বাইরের কুয়াশা মেদুর।

অত:পর আমি এবং সেচ্ছাসেবক তিনটা চেয়ার
প্রথাগত একটা সৌজন্যবোধ আঁকি বসে।
---------------------------------------

ঊন মূক

ঊন মূক


কার্নিশ থেকে সুতোটা ঝুলেছিলো।
এবং তার পাশেই কি একটা অপ্রাসঙ্গিক মত!
আমি চেয়ে দেখি ফ্লোর থেকে কিছু অনুযায়ী আর্থ্রোপ্রোড।
মৃদু উঠে আসে যেন।
বেনামে জমা হয় আমার একস্টিকের ফ্রেডে,
উল্টো-পিঠ এ্যাসট্রের বুকে।
বিশেষ করে বুকের বাঁ দিকটাতে।

আমার মনে পড়ে কোন এক ডোমিনিয়ান শহর।
শহরের বিবিধ হরতাল
এবং অ্যালুমিনিয়াম রমনীরা।
তিন-তিনটে যমজ লকারের কোণ ঘেঁষে
এরকম ভাবনাগুলো আমার
চলে গেছে খুব মসৃণ।
প্রার্থনা করি একজন মীন জাতিকার
যোনিপথে ওরা লেপ্টে যাক।
লেপ্টে যাক পূর্বাপর যত থিতু শহর
এবং তৎজনিত মৃত অবসাদ!
তখনো কার্নিশ থেকে ঝুলেছিলো সুতোটা
এবং তার পাশেই কি একটা অপ্রাসঙ্গিক মত!
-------------------------------------------

ড্রয়ার

ড্রয়ার

মুখ ড্রয়ারের কোণ ঘেঁষে আমি অবারিত হই।
অন্ধকারের তৈজস খুলে দেখি আমার বিস্তারিত গোপন।
এবং প্রয়াত: বিষয়াদি।
ছুটিদিবসের ওরা প্রায় আঁটোসাঁটো হয়ে বসে।
ঠিক যেখানটাই ধূলোজমা কুয়ো আর আনুপাতিক চারপাশ।
হয়তো ইতিহাস হওয়ার আশঙ্কায় এখনো প্রবল।
আমি তাই নির্মেঘ হই পরে।

একটা বিষন্নতা মোলায়েম নেমে আসে তখন।
উড়ে উড়ে কী এক প্রাক্তন স্মৃতিময়তায়
ছক কেটে আঁকে আমারই মতো মিথোজীবী সব।
কিছু একান্ত অপরাণ্হে এমনি মৃতপ্রায় পড়ে থাকি আমি।
যেন আশ্চর্য সব ফসিলে এক রোদ ভাঙা সমর্পণ।

---------------------------------------------------

বায়বীয় অনুষদ

বায়বীয় অনুষদ


একটা মেঘ প্রায় নরম পালক হয়ে এলে
আমি কেন্দ্রীভূত হই তার বিবিধ শব্দে মেতে।
তুমি যেন মোম হও পাশে।
মৃদু নিভে যাওয়ার ঠিক কিছু আগে।
ভেজানো দরজায় রাত গভীরে নামে যত
জুতো জোড়া তেমনিই পরে থাকে অবিকল ফ্লোরে।
হাওয়ার অন্ধকারে আমি টের পাই এইসব।
আরো ভোরের কাছাকাছি
কোন সবুজাভ এক বৃষ্টির পরে
ঋতুভেদ হয় স্বপ্নের।
ঘুমন্ত অবশেষে আমি পাখি হই খুব।
যখন রাতের হাওয়ারা মারা যায় একে একে।
-------------------------------------------

আর্টের স্কুল

আর্টের স্কুল


আমি অনেকক্ষণ বসে আছি একই অবয়ব ভেবে।
দূরতম ইঞ্জিন আর ঢেউয়ের শব্দ শুনে শুনে
সচকিত হই প্রতিবার;
জড়িত হই এই ভীষণ অবেলায়।

এখানে ঋতুভেদে সাঁকো পাল্টায় জানি।
ফ্লুরোসেন্ট প্রতিবেশে রিফিউজি জমে যত্রতত্র ।
কী এক নখর শ্বাপদের মতো সহসা গ্রাস করে সর্বস্ব !
লেকের মানুষগুলো তখন বড্ড আঁটোসাঁটো হয়ে পড়ে ।
বরফকলের যে কজন ছিলো আমার আশেপাশে এই সুতীব্র কুয়াশায়
আমি রঙের টিউবে ওদের চোখ আঁকি; যেন বিশদ ঘটনাবহুল কত!
-------------------------------------------------------------

অর্কিডের গল্প

 অর্কিডের গল্প

প্রকাশ্যে ঠোঁট ছুঁয়েছিলো বহুআগেই।
খুঁজেছিলো চৌকাঠ ডিঙানো এক বিকেলের প্রশ্রয়।
গল্প-উপন্যাসে যেমন কারচুপির অভিযোগ থাকে
একই বিছানায় গোপন অর্কিডের বায়না
প্রাইস ট্যাগগুলোর মার্জিনাল সতর্কতা
কিংবা যথেষ্ট নিরাপত্তার অভাবে 
কিছু তাড়াহুড়ো চুম্বন
মডারেট দূরত্বে খানিকটা লুটপাট
এই-ই তো!

তারপর তুমি ঠিকই রিকশা ডাকো।
যেতে যেতে ভালোবাসা আর 
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অংক কষো।
হয়তো মেঘচোখে ভুল করো বারবার।
------------------------------------------

জলচৌকি

জলচৌকি


তোমার চোখের রঙে
আমার তেমন কিছু যায় আসে না।
তবু মেঘ বোঝাই রবিবারগুলো
দেখি সাধ করে উপোস কাটাচ্ছে।
তোমার বসবার জলচৌকিতে জমছে
ওদের নৈতিক দাবী-দাওয়া,
কিছু প্রাত:ভ্রমনের আবেদনপত্র,
কয়েকটি অনুতপ্ত বৃষ্টির দিন।

তবু তোমার চোখের রঙে
আমার কিছু যায় আসে না।
যেমন যায় আসে না পাঁচকোটি বিকেল
তাড়া করে ফেরা যুবকদের
মাথাপিছু হীনমন্যতায়।
--------------------------

আরো ঠিক কতো মানুষ মরে গেলে শুয়োরগুলো খোঁয়াড়ে ফিরে যাবে?



ওরা কানে দু'হাত চেপে রাত ভোর করে দেয়।
ভেবেছিলো হয়তো ঘোর কেটে যাবে।
হয়তো এইবারের বিরতি শুধুই সাময়িক নয়।

তাই জোড়া চোখগুলো দিগ্বিদিক শুধু নিজেদের ছায়া খুঁজে ফিরে।
যখন বেইত লাহিয়ার আকাশ ভয়ানক ঈশ্বরহীন হয়ে ওঠে।
যখন ওদের বাচ্চাগুলো ভরদুপুরে একে একে মারা যায়;
আমার মতো কিছু লোক টিভি সেটের সামনে বসে
এই নির্লজ্জ সময়ের সাক্ষী হয়।
-------------------------

টুথব্রাশ

টুথব্রাশ


না হয় আমি মেনেই নিয়েছিলাম সব।

এমনকী চার-চারটে বন্ধ্যা বিকেল!

তবু তোমাদের আড়িপাতা বারান্দায়

আমার ঝুলে থাকা বয়স

মাকড়সার মতো নীল নীল হয়ে ওঠে

তোমার স্হপতি বাবার ভয়ে।

তবু না হয় মেনেই নিয়েছিলাম সব।

এমনকী চার-চারটে গোপন বিকেল,

তোমার আমার একটা টুথব্রাশ!
-------------------------------------

চায়ের দোকানে

চায়ের দোকানে


ওপাশের বেঞ্চিতে চায়ের দাগ
তুরস্কের মানচিত্রের মতো সংবেদনশীল।
চুমুক দেবার কাপে জমে মৃদু ছাইপাশ,
বাহারি নিকোটিনে সাজানো পসরা,
শশব্যস্ত সমাজের আনাগোনা।

কিছু আগে যারা এসেছিলো ওরাও ফিরে গেছে।
দু একটি কিংবদন্তী কেবল
উড়ে........উড়ে..........
নেহায়ৎ বসবার জায়গা পায়নি বলে
মার্কসবাদী ঝড় তুলে।
আজকাল তুরস্কে পা রেখে ঠায় বসে থাকি আমি।
এই রকম ভীষণ নির্লিপ্ত বিকেলে।
-----------------------------------

শীতের সকাল

শীতের সকাল


ছককাটা রোদের লেবাস জড়িয়ে
আনুমানিক সময় বসত গাড়ে আমার ব্যালকনিতে।
রম্বসের ঘড়ি দেখে দেখে পৌষবয়সী আমি
পিঠ এলিয়ে দিই রোদে।
সংখ্যা গুনি প্রতিবেশী সূর্যাহতের।

শীতকালীন সৌজন্যতা ভুলে
আমি তাকিয়ে দেখি এইসব।
ওরাও হয়তো জেনে গিয়েছিলো
মুখরোচক নৈশগীতের কথা।
নইলে কি আর রোজ রোজ এতো ঘনিষ্ঠ হয়ে বসে?

---------------------------------------

চারুলতার বড় হওয়া

চারুলতার বড় হওয়া


গাদাগাদি করে ওরা জনাপাঁচেক
ফাঁকা পেয়ে ঢুকে পড়লো
চারুলতার নিউরনে।

অখন্ড অবসরের ফলে
হা করে খোলাই ছিলো সদর দরজা।
তদুপরি ভর দুপুরের চিলেকোঠা,
মনোযোগেই বা কি উপায়!

তাই, অশীতিপর কচ্ছপের মতন সাঁটিয়ে পিছুটান
চিরসাবধানী,অক্ষতযোনি চারুলতা
নিয়মিত হলো বড় হওয়ায়।
-------------------------------------

লোকটা এবং তার গীটার

লোকটা এবং তার গীটার


বার কয়েক ফোঁড়ন কেটেও কোন সুরাহা হলো না।
নির্জনতার অজুহাতে লোকটা
দিব্যি বাজিয়ে গেল মিক্সোলিডিয়ান ঢং-এ
সাঁড়াশি চলল বহুবার।
দীর্ঘ আঙুলের সেতু,
জড়িত ছিলো কী এক প্রগাঢ় জড়তায়!

নিচে ধূলো মলিন চরে ফ্রেডের এপার ওপার।
লহমায় কেটে গেল সেই বিকেলের অনুষদ
ঘন ঘন চায়ের কাপে এবং প্রতিবেশী ধোঁয়ায়
ফিরতি পথে কে যেন বলে উঠলো-

ওর নাকি যাদুকর হওয়ার খুব একটা ইচ্ছে ছিলো না!
---------------------

কাক

কাক


সরাইখানার পাশ ঘেঁষে
রবিবারের রাস্তাগুলো
আনমনে নেমে গিয়েছে বহুদূর।
প্রায় স্যুরিয়ালিস্টিক আবর্জনা যেন।

খড়খড়ে তোয়ালে মেলা ছাদে
কাকদের এবং ঈশ্বরের ভোজসভায়
ওদেরও টেড হিউজ হওয়ার সাধ জাগে।

-----------------------------------

একটি কর্পোরেট ভোর


একটি কর্পোরেট ভোর

আমি সাবধানে আঁকছি
দু'টি পাশাপাশি ভোর;
একটা সি/৪ এপার্টমেন্ট।
কিংবা তার থেকে গজিয়ে ওঠা ল্যান্ডস্কেপে
একটা লিফটের চৌকাঠ।
যেটা ক্ষয়ে গেছে খুব নিচে
গুমোট গ্যারেজের দিকে।
যেখানে আলতামিরার মত
আরো অন্ধকার এসে
চকিতে দেখে নিচ্ছে কর্পোরেট মে
ঘ,
ব্যালকনি ভোর,
ইস্পাতবহুল।
স্কুলগামী বালকগুলো এ সময়ে
রোজ নেমে এলে
সিঁড়িঘরে আমি একটা রঙের টিউব খুঁজে মরি।
যার থাকার কথা ছিলো খুব
এইসব নির্লিপ্ত রেলিঙে,


ওদের জুতোর সুখতলায়।
-----------------------------

ঘেরাটোপ


ঘেরাটোপ

ইদানীং প্রায়ই আমি নৈ:শব্দ্যে ভুগি।
ঘর্মাক্ত পেশীতে হাতড়ে বেড়াই বেসিনের জল।
যা কিনা ক'দিন আগেও যথেষ্ট শব্দময় ছিলো
বয়:প্রাপ্ত শ্বাস-প্রশ্বাসে।
অনিবার্য ভেবে অপরিচিতার বালু-পাহাড়ী কটিদেশ
ছুঁয়ে দেয় প্রসন্ন পরাসক্তি,
রটে যায় তাঁর নাইতে নামার খবর।
অসমর্থিত সূত্র ধরে আমি তখন বীরভূমের জুয়াড়ী।
শব্দে ক্লেদে ভারাক্রান্ত ভীষন?
না কি
গলুই চাপা অভিমান?
নিবারনের বোন তো ঠিকই বলেছিলো।
আমাকে পর্যাপ্ত পরিমানে শব্দ এনে দেবে ডাকঘরে,
তার অসাবধানী স্তনের কানাকানিতে শব্দেরা
গিনিপিগ হয়ে ঘুরে বেরাবে ইত:স্তত।
সূর্যাস্তের হাওয়া মেখে আমি দিব্যি রবীন্দ্রনাথ হয়ে যাব।
আরো কত আবেগ ঘন কাসুন্দি!
এখন আমি নিয়মিত টবের গাছে সূর্য নামাই,
ঈষৎ গেলাসে আঙুরের রং আঁকি আর
ল্যাম্পপোষ্টের কাছে নিঃসঙ্গতা ধার চেয়ে
রাত জাগে শব্দ খুঁজে ফিরি ।
---------------------------------

বায়ুকল

বায়ুকল
(অতি সম্প্রতি সদলবলে অরন্যে রাত্রি যাপনের পর প্রিয় কবি'র নির্লজ্জ অনুকরন)

কী এক অন্তরঙ্গ জ্যোৎস্নার থেকে
নিমেষে নিমের বনে তক্তপোষ পেতে
আমরা ক'জন মধ্যবিত্ত পরিবারের বড় ছেলে
অপেক্ষার সারারাত কাটাই
সহস্র বছরের নক্ষত্রেরও আনমনে
কেউ যেন কথা দিয়েছিলো এ রাতের।
বুনো ঘাসের আলগোছে আজ বহুদিন পর
তার কথা মনে পড়ে
গাছের ছায়ায় ছায়ায় ঘাই মারে শুক্লপক্ষের চাঁদ
দূরে কোথাও নিস্তরঙ্গ শিরীষের ডালে 
এক বিরহিনী লক্ষীপেঁচা
তার ডাক শুনি যেন এই যাদুকর জ্যোৎস্নায়।
ঝিঁ ঝিঁ পোকার শব্দে শব্দে সন্তর্পনে 
অন্ধকার আরো গভীরে নামে।
অশরীরী হাওয়ার 'পরে মেঘ বুনে সিগারেট আর
আমরা ক'জন মধ্যবিত্ত পরিবারের বড় ছেলে
বুকের হাঁপরে এক চিলতে সুবাতাস নেবো বলে সযত্নে হা করে থাকি।
-----------------------

বৃষ্টি প্রধান কাব্য


বৃষ্টি প্রধান কাব্য



শুধু নিরাপত্তার খাতিরে বৃষ্টিতে ভেজা আমার হয়ে উঠে না
তাই আমি তোমার খাতিরে বৃষ্টিতে ভিজি
ভিজতে ভিজতে পুরুষ কাক হয়ে যাই
অবশ্য তুমি বললে অন্য কিছুও হতে পারি
যেমন আকাশলীনার boyfriend
কিংবা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
--------------------

রংdecision


রংdecision

টানা তেরো দিন বৃষ্টিতে ভেজার পর বুঝতে পারলাম
এই আকালে সন্ন্যাস খুঁজতে যাওয়ার কোন মানে হয় না।
এর চেয়ে তোমার প্রেমিক হয়ে যাওয়া ঢের ভালো ছিলো।


------------------------

কবি

কবি

আরো একদল বিধ্বস্ত কবি
হেঁটে গেলো পৃথিবীর তীর ধরে।
শেকল পরানো পায়ে
রক্তাক্ত কবিতার দাগ নিয়ে
নিদ্রাহীন গিলোটিনের নিচে
এক একজন ভয়ংকর দূর্ধর্ষ।

শুকনো গদ্যের মৌসুমে ওরা
জবাবদিহিতা মূলক বৃষ্টিপাত চেয়েছিলো,
চেয়েছিলো দ্বিধাহীন,
বাদল মুখর দিন
কেটে যাবে এমন
ব্যক্তিগত না পাওয়ার বেদনায়।
----------------------------------

একটা কবিতার ডেলিভারি


একটা কবিতার ডেলিভারি

চলুন তবে এবার করা যাক কিছু খুন
এই প্রাগৈতিহাসিক কসাইখানায়।
ঠিক ঠিক ভুলে আসুন 
সব কর্ডিয়াল শুভেচ্ছাবানীগুলো।
ওগুলোর মতো নচ্ছার আরেকটা দেখিনি এ তল্লাটে, জানেন?
কিঞ্চিৎ মাতাল হয়েও নিতে পারেন এই খারাপির আগে।
দু'য়েক প্যাক বের্টোল্ট ব্রেখট
কিংবা বোদলেয়ারে কিছু র‌্যানডম সুখটান।
এপেটাইজার হিসেবে নেহায়ৎ মন্দ নয় বইকি!
দয়া করে ঐ অভিধানটাকে জড়াবেন না এবেলায়।
বিগত দিনেও বহুত ভুগিয়েছে ও ব্যাটা!
তবে হ্যাঁ,যদি ঘুম বিলাস থাকে প্রবল
তবে একখানা খাসা বালিশ পাবেন বটে।
আরো একবার ভেবে নিন
আপনার প্রিয়তমার মুখখানি।
সে কি গত বসন্তেও বিছানায় ছিলো
এমন জলজ তৎপর?
তাই বলি মশাই-
মখমলের মুখ মুছে আসুন বেসিন থেকে।
লাস্যময় উগলে দিন যত সংশ্লেষপ্রবণ
এবং বমি করুন।
বমি করুন যথেচ্ছ 
বেডরুম লাগোয়া বাথে,
মেমোরিয়াল ব্যালকনিতে,
ওয়ার্ডড্রবের মিহিন দাম্পত্যে।
এইসব এসিডিটির মতন ফ্লুরোসেন্ট বোধ
এসে জমে যাচ্ছে যখন
তখন চলুন তবে ধরা যাক একে একে
কিছু শব্দঘন প্রতিবেশ।
সার বেঁধে দাঁড় করাই ওদের সাঁজোয়া শেষকৃত্যে।
অত:পর বাঁপাশে ছুরি বসিয়ে নিংড়ে বের করে আনি
কিছু দশ কিংবা বারো আউন্স মতন।
-------------------------------------

রিকশা এবং প্রস্টিটিউট


রিকশা এবং প্রস্টিটিউট


মোড় পেরিয়ে রিকশাটা চলে যাচ্ছে আরো সামনে।
হয়তো তেমাথায় যাবে কেউ।
কিংবা আরো কিছু সামনে
যেখানটায় ভিড়বাট্টা ফুঁড়ে
একটা চৌকস সার্কাস শহর
রুগ্নভাবে দাঁড়িয়ে আছে।
দাঁড়িয়ে আছে সেলুন
ও তার অন্ধকার।

রিকশা আরোহিনী এইসময়ে
আড়াআড়ি পা তুলে বসলে
চকিতে শোকেসে ঢুকে পড়ে
একটা লাল পেটিকোট।
তার অধ:স্তন কালো রঙ সমেত
রোদের মতন আবহাওয়ায়
ছোপ ছোপ ব্লাউজে লেগে থেকে 
কটাক্ষ ফুটপাথের।
উচ্চকিত পারসে তারা
পাছা মেলে দেখিয়ে দেয় 
সামাজিক ছাড়পত্র।
ক্ষতমুখ আঁইশের মত ঠোঁটে তবু
পিছলে যায় সহস্র এঁটো মহাকাল;
আকাশে পাতানো একটা ওভারব্রীজ
এবং এরকম আরো কিছু সুরম্য বিষয়।
-----------------------------------------

গত রাতের ফুটপাথের আসর থেকে


গত রাতের ফুটপাথের আসর থেকে


নিহতের মতন রাত্রি গুলো
আবারও খুবলে নিচ্ছে 
যৌথ ভুলের প্রশ্রয়।
গলদেশ বেয়ে উঠে আসছে 
নির্বাচিত ফুটেজরা;
প্রচ্ছদের আশা করে যারা 
নিয়মিত হারিয়ে যাচ্ছে।

মৃত ক্রসিং এর ভিড়ে উলঙ্গ বিলবোর্ড
যেন শুধু নিয়ন বাতির মতন পেয়েছে সংকেত
স্হানীয় ফুটপাথের।
আমি তবু প্রাণপনে ভুলে যাচ্ছি
তোমার গ্রাফিক্যাল কটিদেশ।
গন্ধ ব্যাকুল বিলাস পন্হা সব।

মীন জাতিকা,
তুমি কি আগেই জানতে?
এমন সকরুন বোধিসত্ব হবে জীবন?


--------------------------------

নেইলকাটার


নেইলকাটার
(আমার প্রিয় কবির স্মরণে, অনুকরনে) 


নখ গুলো মরে গেছে বহু আগেই।
রাতের ফ্লোরে তবু 
ওদের জীবিত আত্মীয়রা এসে
নখেদের সৎকার দেখে বার বার।
দেয়ালের বাতি নিভে গেলে পরে 
এখানে অজস্র আঁধারে তারা প্রাণ পায় যেন  
আমারই ঘুমের পাশে।

যুগপৎ ভেবে ভেবে 
এমন-ই জীবন চেয়েছিল বুঝি? 
মীথময়?
যেন কোন প্রগাঢ় বেদনায় 
বহুদিন জাগবে না জেনেও
চাপা পড়ে আছে আজো 
সহস্র সময়, 
প্রয়াত: নখ মঞ্জুরি।
অথচ চারদিকে মশারির মতন নিস্তব্ধতা নেমে এলে
আমিও টের পাই 
তাদের বিবিধ প্রস্তুতি।
আলগোছে ভেবে দেখি 
এই সব নখেদের বিদ্রোহ।

অত:পর.....
একখানা চৌকস নেইলকাটার!
---------------------------------------------------