আবার
এসেছে আষাঢ়
ক'দিন ধরে প্রায়ই বৃষ্টি হচ্ছে। হুট-হাট করে অন্ধকার, ধূলো বাতাস; হুট-হাট করে আকাশে তুমুল কালো মেঘ। তারপর সবকিছু ছাপিয়ে প্রবল বৃষ্টি। লাল-লাল কৃষ্ণচূড়ায় মুহুর্তে ছেয়ে যাচ্ছে রাজপথ। দূরে কোথাও তীব্র অনিচ্ছায় নুয়ে পড়ছে একটা নারকেল গাছ। রাস্তার মোড়ে ট্রাফিক জ্যাম, লালবাতি, সবুজ বাতি...সবাই ভিজছে। নির্জন বাড়ির ছাদ, ল্যাম্পপোস্ট, মোবাইলের টাওয়ার একা একা ভিজছে। শুষ্ক হৃদয় নিয়ে ঊর্দ্ধমুখে ভিজছে মানুষ, গাছপালা, শহর, পাখি। বিশ্রী রকম গরমের পরে এ যেন বড় আকাঙ্খার বৃষ্টি।
আমার অবশ্য বৃষ্টিতে ভিজতে এতো ভালো লাগে না। বৃষ্টি'র দিনে আমার সবচে' প্রিয় কাজ হল জানলার পাশে বসে বৃষ্টি দেখা আর গান শোনা। এখন যেমন শুনছি- রবীন্দ্রনাথের 'আবার এসেছে আষাঢ়'।
বাংলাদেশে এখনো আষাঢ় আসতে বেশ কিছুদিন বাকি। তবুও এই গানটিকে কেন যেন আজ খুব প্রাসঙ্গিক মনে হচ্ছে। গানের কথাগুলো যেন একান্তই এই সময়ের, এই চারপাশের। এই বাদর মুখর দিনে এ যেন আমার নিজেরই অব্যক্ত অনুভূতি।
এই গানটির মত রবীন্দ্রনাথের আরো কিছু গান আছে যারা মাঝে মাঝে আমাকে নেশাদ্রব্যের মত পেয়ে বসে। শতবার শুনবার পরেও তিলমাত্র ক্লান্তি আসে না। বরং প্রতিবারই নতুন লাগে। আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারিনা- কেন এত ভালো লাগছে? কোথায় তার ক্যারিসমা? কী সেই মোহন লজিক? প্রথম প্রথম মনে হত কিছু স্পেসিফিক রাগের প্রতি হয়তো আমার দূর্বলতা আছে। তাই সেই রাগের গান আমার ভালো লাগে। কথা সত্য। মল্লার রাগের প্রতি আমার বিশেষ প্রীতি আছে (আসলে কার নেই?)। কিন্তু পরে দেখা গেল একই গান শিল্পী নির্বিশেষে ভালো লাগছে না। হয়তো মাঝখানে কোথাও একটা গ্রে-এরিয়া আছে।
সবমিলিয়ে পুরো ব্যাপারটা যখন একবার ভালো লেগে যায় তখন খুব অসহায় বোধ হতে থাকে। কোন স্পষ্ট কারন/লজিক ছাড়া
এই 'ভালো লাগা' বিপজ্জনক।
আশেপাশের যাবতীয় জরুরী বিষয়, নিজের অস্তিত্ব তখন তুচ্ছ জ্ঞান হতে থাকে। ঘোর লাগে......নিবিঢ় আত্মহননের সাধ জাগে। এখন যেমন জাগছে; জয়তী'র গান শুনে। শুনে দেখেন। বলা যায়না আপনারও জাগতে পারে।
"আবার এসেছে
আষাঢ়
আকাশ
ছেয়ে,
আসে
বৃষ্টির সুবাস বাতাস বেয়ে।"
- এই লাইনটা একটা পিওর স্ট্যাটমেন্ট; সাধারন বর্ণনা হতে পারতো । কিন্তু গানের সাথে সত্যিই যখন সারা আকাশ জুড়ে মেঘ করে থাকে, বৃষ্টির মন-কেমন ঘ্রাণ এসে নাকে লাগে তখন তার চেয়েও বেশি কিছু মনে হয়; মনে হয় এটা কোন ম্যাক্সিম, আদিম প্রবাদ। এমনটাই হওয়ার কথা ছিলো।
"এই পুরাতন হৃদয় আমার
আজি
পুলকে দুলিয়া উঠিছে আবার বাজি
নূতন
মেঘের ঘনিমার পানে চেয়ে..."
- এখানে সরল স্বীকারোক্তি আছে; কনফেশান আছে। রবীন্দ্রনাথ যদিও পঞ্চাশ বছর বয়সে লিখেছিলেন "এই পুরাতন হৃদয়" অথচ গানের ঘোরে আমার নিজেকে তা-ই মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে বহুদিন হলো আমি বেঁচে আছি, পুরনো; জীর্ণ, সময়ের চাপে ক্লিষ্ট। তার মাঝে এই বর্ষার মেঘ বুঝি আজ এক রাশ তারুণ্য নিয়ে এলো; উচ্ছাস নিয়ে এলো। ওদের তুলনায় আমি কত পুরনো, কত ব্যাক-ডেইটেড!
""রহিয়া রহিয়া বিপুল মাটির পরে,
নব তৃনদলে বাদলেরও ছায়া
পরে।
এসেছে
এসেছে, এই কথা বলে প্রান,
এসেছে এসেছে, উঠিতেছে এই গান,
নয়নে এসেছে, হৃদয়ে এসেছে ধেয়ে।
এসেছে এসেছে, উঠিতেছে এই গান,
নয়নে এসেছে, হৃদয়ে এসেছে ধেয়ে।
আবার এসেছে আষাঢ়
আকাশ
ছেয়ে।"
প্রায় একশ বছর আগে একটা লোক যে গান লিখে গেছে তা আজও কীভাবে এতো কন্টেম্পোরারি হয়? কেন মনে হয় শতবর্ষের পুরনো এই গান খুব এই ক্ষণের, খুব আমার?
কেন মনে হয় আজ আষাঢ়?
----------------------
