Queen দেখলাম। সময়ের ব্যবধানে বলিউডি সিনেমা যে কতটুকু পালটে গেছে তার একটা আপাত স্পষ্ট ধারনা পাওয়া গেলো। দশ কি বারো বছর আগেও কেউ কি ঘুণাক্ষরে ভাবতে পারতেন যে সিনেমা'র শেষ দৃশ্যে এসে নায়িকা তার অনামিকা থেকে এনগেজমেন্ট রিং খুলে নায়কের হাতে গুঁজে দিয়ে মধ্যমা প্রদর্শন করে হাসতে হাসতে দৌড় দিবে। তারপর, উদ্বাহু নৃত্য জুড়ে দিয়ে বলবে - আমি সিঙ্গেল! আমি সিঙ্গেল!!
এ কী হলো বলিউডের? কোথায় গেলো সেই মেলো ড্রামা? সেইসব কোমলমতি ছিঁচ-কাঁদুনে নায়িকা?
অবশ্য শেষ দৃশ্যে নায়িকার এই দৌড়াদৌড়ি'র ঘটনা নতুন নয়। বিভিন্ন কারনে আগেও তাদের দৌড়াতে হত। কখনো খারাপ মানুষদের হাত থেকে সম্ভ্রম রক্ষা'র জন্যে, কখনো ক্রমশঃ স্টেশন-ছেড়ে-যাওয়া ট্রেন ধরার জন্যে, কখনো গাড়ির রেসে; কখনো বা এমনিতেই। কিন্তু সেই সব দৌড় ছিল তার কাঙ্খিত পুরুষকে লক্ষ্য করে। এখন দেখা যাচ্ছে তার কোন কাঙ্খিত পুরুষেই নেই। কাঙ্খিত নারী থাকার সম্ভাবনা অবশ্য এক্ষেত্রে উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না।Queen - এ কঙ্গনাকে যেন আবার পুরনো রূপে (নাকি আরো নতুন?) পাওয়া গেলো। গ্যাংস্টারে আহামরি কোন অভিনয় না করলেও কী একটা কারনে যেন ওকে ভালো লেগেছিলো। সেই সময় আশেপাশে বন্ধুদের চোখেও একইরকম মুগ্ধতা দেখেছিলাম। পরে দু'য়েকটা সিনেমা ছাড়া আর ওরকম ভালো লাগে নি কখনো। সব অবশ্য দেখাও হয়ে ওঠে নি। তবে Queen - এর কঙ্গনা'র সাথে তাদের তুলনা চলে না।
বলিউডি সিনেমার কাহিনীতে ইদানীং মনে হচ্ছে ম্যাট্রিয়ার্কি প্রাধান্য পাচ্ছে। নারী প্রধান সিনেমাগুলো বেশ পসার পাচ্ছে। পাবলিকও খাচ্ছে। এর পেছনে কোন সাম্প্রতিক সোশ্যাল কনটেক্সট জড়িত কিনা ভেবে দেখা যেতে পারে। নারী নির্যাতনের ঘটনাগুলো জানাজানি হবার পর সাধারন মানুষ হয়তো এখন একজন আইটেম গার্লের পাশাপাশি একজন শক্তিমতীকেও মনে মনে আঁকছেন। Queen এর কঙ্গনা হয়তো তাদের সেই কল্পনা'র শক্তিমতী।
কীভাবে অন্যের উপর নির্ভর করে না থেকে শত প্রতিকূলতা কাটিয়ে উঠে একটা মেয়ে নিজের চেষ্টায় স্বাধীনভাবে বাঁচতে পারে তা-ই হলো Queen এর মূল উপজীব্য। এটাকে সাজাতে গিয়ে অন্যান্য পার্শ্ব চরিত্ররা কমবেশি ডালপালা মেলেছে। তাদের মধ্যে লিসা বোধহয় একটু বেশিই মেলে ফেলেছে (নাকি আমার ভুল হচ্ছে?)। আহা লিসা; মায়া বনবিহারিনী হরিণী লিসা।
বিগত চার বছর যাবৎ আমার একটা প্রিয় কাজ হলো সপ্তাহ খানেক পরপর Blender'd Pride এর একটা TVC দেখা। মন-টন খারাপ থাকলে অবশ্য আরো বেশি ফ্রিকুয়েন্টলি দেখা হয়। TVC তে দেখানো হয় একটা ভয়ংকর সুন্দর চোখের মেয়ে ভায়োলিন শেখার চেষ্টা করছে। উদ্দেশ্য তার বয়ফ্রেণ্ডকে সারপ্রাইজ দেওয়া। কৃষ্ণকলি বা কালো-হরিণ-চোখ এগুলো যে বাস্তবে সম্ভব তা আমি এই TVC দেখে প্রথম উপলব্ধি করি এবং রবীন্দ্রনাথকে মনে মনে ধন্যবাদ দেই। আজকে বহুদিন পর Queen-এ তাকে দেখে নতুন করে আপ্লুত হলাম, ঘায়েল হলাম। পাঠকের সুবিধার্তে TVC টা শেয়ার দিলাম। চাইলে আপনারাও দেখতে পারেন, কমবেশি ঘায়েল হতে পারেন।
Queen টিপিক্যাল বলিউডি না হলেও আসলে কিন্তু ভারতীয় দর্শকদের মাথায় রেখেই বানানো। সুন্দর পরিসমাপ্তি, বিদেশ বিঁভুইয়ে ইন্ডিয়ান ইমেজ (ম্যারা ভারত মহান), ইন্ডিয়ান সিনেমার গান, দুইদিন প্যারিস আর দুইদিন আমস্টার্ডাম ঘুরে শুধুমাত্র রন্ধন শৈলী'র গুনে আচমকা সফল মানুষ বনে যাওয়া - এগুলো কিন্তু তার-ই ইঙ্গিত বহন করে। তারপরেও কখনো দেখতে খারাপ লাগেনি। সবার বাস্তবিক অভিনয়, সুন্দর স্ক্রিপ্ট, এডিটিং সব মিলিয়ে ভালো একটা সিনেমা।
মূল চরিত্রকে খুব বেশি গ্লোরিফাই না করার কনসেপ্টটা বোধহয় সবচে' ভালো লেগেছে। অনেক নতুন অভিজ্ঞতার পরে, অনেক সফল হবার পরেও বোকা সোকা মেয়েটা কিন্তু ওরকমই রয়ে গেছে। হয়তো সাহসটা কুড়িয়ে পেয়েছে পথে। কিন্তু তাই বলে কোন সুপার উইম্যান হয়ে ওঠে নি। ভাগ্যিস অনুরাগ কাশ্যপ ছিলো।
-------------
২টি মন্তব্য:
বলিউডের মেলোড্রামার স্বভাবগত ও জনপ্রিয় মিছিলের বিপরীতগামী চোরাস্রোত যে ক্রমশ বাড়ছে তা নিশ্চিত। তবে এই নারীপ্রাধান্য যে একেবারে অভিনব তা কিন্তু নয়। নার্গিসের "মাদার ইন্ডিয়া", শাবানা আজমির "অর্থ" কিংবা স্মিতা পাতিলের "ভূমিকা" (স্মিতা পাতিলের আরো ভালো এবং সমমানের মুভিও আছে, এই মূহুর্তে ঠিক মনে পড়ছে না)-এসব মুভি এখনকার যে কোন নারীকেন্দ্রিক মুভির সাথে সমান (কিছু ক্ষেত্রে আপার হ্যান্ড) পাল্লা দিতে পারে। বিশেষ করে স্মিতা পাতিল আমার মতে এখনো ভারতীয় নারী-কেন্দ্রিক চলচ্চিত্রের "মিউজ"। টাবুও নব্বইয়ের দশকে বেশ কিছু ভালো মুভি উপহার দিয়েছেন (যেমন "হু-তু-তু")।
বর্তমানের এই ঘরানার চলচ্চিত্রের গুরুত্ব ও সংখ্যাধিক্যের সাথে ভারতীয় রাজনীতি, জীবনাচরণ এবং অর্থনীতির প্রত্যক্ষ যোগসূত্র আছে বলেই আমার দৃঢ় বিশ্বাস। বর্তমানে জীবিত (এবং অবিবাহিত!)ও জাতীয় রাজনীতিতে প্রভাবশালী বেশ কিছু নারী রাজনীতিবিদরা হয়ত অনুপ্রাণিত করছেন শিক্ষিতা এবং অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী ভারতীয় (শহুরে)নারীদের। ভারতীয় পরিসংখ্যানও বলে যে আগামী দশকগুলোতে চাকুরীজীবি এবং বিবাহে অনিচ্ছুক নারীর সংখ্যা বেড়েই চলবে। চলচ্চিত্র পরিচালকেরা যে তাই এই থিমকে আরো সামনে নিয়ে আসবেন এটা অবধারিত।
কঙ্গনাকে আমার বর্তমান বলিউডের একজন প্রকৃত বহুরূপী ("মাত্রিক" আরকি !) অভিনেত্রী বলেই মনে হয়। মাতৃপ্রধান ভূমিকায় বিদ্যা বালানকে আমি এগিয়ে রাখব। কিন্তু বিদ্যার অভিনীত চরিত্রগুলোর বৈচিত্রতা তুলনামূলক কম। সত্যিই কঙ্গনা'র গ্যাংস্টারের অভিনয় থেকেই কিন্তু বোঝা গিয়েছিল তার দীর্ঘযাত্রার সম্ভাবনা। আমার আরও আশ্চর্য লাগে যখন নানা চরিত্রের পোশাক, উচ্চারণ,চেহারা-এসব কঙ্গনা খুব ভীষণভাবে আলাদা করে তুলে ধরে।
যাহোক আশা করি এবার সেরা অভিনেত্রীর নানা বলিউডি এবং জাতীয় পুরষ্কারটি কঙ্গনা পাবেন। আর দর্শক আমরা অপেক্ষায় থাকলাম আরও প্রথাবিমুখ চলচ্চিত্রের।
(বিঃদ্রঃ চৌধুরী সাহেবকে আপাত পদ্য-বিমুখ দেখে ভাল লাগছে। সুন্দর লেখা আর অফিসের অফলপ্রসূ সময় দূর করার জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ)।
বলিউডি ছবিতে পরিবর্তন আনার যে প্রচেষ্টা অনুরাগ কাশ্যপ ও তাঁর সাঙ্গপাঙ্গরা করে যাচ্ছেন তা সত্যিই প্রসংসার দাবিদার। "মেরা ভারত মহান" দেখানটা আমার কাছে খুব একটা অস্বাস্থ্যকর কিছু মনে হয় না বিশেষত বছরের পর বছর আমেরিকানরা বিশ্বের একমাত্র রক্ষাকর্তা মার্কা ছবিগুলো যখন আমরা দেখে যাচ্ছি।
এই ছবিতে অভিনয় ছাড়া কঙ্গনার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হল তার উচ্চারণ আর কথায় কথায় চিৎকার করে কান্নাকাটি না করা। আরেকটি পরিবর্তন খেয়াল করলাম তার শরীরের কোন একটি অংশে (পড়ুন ইয়ে মানে বক্ষদেশ)আশ্চর্য প্রসারণ। অবশ্য সবাই যেখানে ঠোঁট, নাক সব বদলে ফেলছে ছুরি চালিয়ে এ আর এমন কি!
আরেকজন অসম্ভব সম্ভাবনাময় অভিনেত্রির উত্থান মনে হয় দেখলাম Nimrat Kaur "লাঞ্চবক্স" ছবিতে। যদিও নাচা-গানার ছবিতে কদ্দুর কি করতে পারবেন তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যায়। যদি না দেখে থাকেন দেখে ফেলুন আজই। এই ছবিতে শ্রী কাশ্যপ মহাশয়ের হাত আছে। অস্কারে গেলে ভাল একটা সম্ভাবনা ছিল ছবিটার। বিদেশি প্রযোজকদের হাতও ছিল ছবির পেছনে। কবে যে ভারতীয় চিত্র নির্বাচকদের সুমতি হবে কে জানে!
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন