যৌবনের বিপ্লব
সিরাজ সিকদারের সর্বহারা পার্টির সদস্যদের মধ্যে প্রেম-ভালবাসা কেন্দ্রিক বিভিন্ন ঝামেলার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। কমবয়সী ছেলেমেয়েদের দল। একদিকে বিপ্লবের কঠোর মন্ত্রে দীক্ষিত গৃহত্যাগী কষ্টের জীবন, অন্যদিকে তরুণ বয়সের স্বভাবসুলভ শারীরিক কামনা বাসনা। এই দু’য়ে মিলে তালগোল পাকিয়েছে বার বার। তবে এ নিয়ে সিরাজের স্ববিরোধী এবং স্বেচ্ছাচারী অবস্থান টের পাওয়া যায়। তিনি নিজে পার্টির মধ্যে একাধিক নারী সঙ্গীর সাথে সম্পর্ক রেখেছেন অথচ, অন্য সদস্যদের বেলায় অত্যন্ত কঠোর নিয়মকানুন আরোপ করতেন। দলের যে কোন সদস্যের বিয়ে-শাদির আগে সিরাজের অনুমতি নেয়া লাগতো। সিরাজের অমতে কেউ বিয়ে করলে নেমে আসতো কঠিন শাস্তি - এমনকি মৃত্যুদণ্ড। এ নিয়ে পার্টিতে ছিল চাপা বিদ্বেষ ।
সেলিম শাহনেওয়াজ এবং মাহবুব দুজনেই ছিলেন পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। সেলিম প্রেম করতেন পার্টির এক জুনিয়র কর্মী আলমতাজ বেগম ছবির সাথে। আর মাহবুব প্রেম করতেন সালমার সাথে। সিরাজ তাদের এই সম্পর্ক মেনে নেন নি। তার মতে এটা ছিল প্রকারান্তে যৌন স্বার্থের কাছে বিপ্লব, জনগণ এবং পার্টির স্বার্থকে বিসর্জন দেয়া। পার্টি মিটিংয়ে ছবি এবং সালমা দুজনের তাত্ত্বিক এবং সাংস্কৃতিক মান নিচু বলে সাব্যস্ত হয়। সেলিম এবং মাহবুব দুজনকেই প্রথমে কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে বের করে দেয়া হয় এবং পরে চক্রান্তের অপরাধে খুন করা হয়। এর রেশ ধরে খুন হন ছবির বড় ভাই সেসময়ের বিখ্যাত কবি হূমায়ন কবির।
সিরাজ হয়তো ভাবতেন পার্টির কমবয়সী ছেলে-মেয়েরা স্বাভাবিক যৌনতায় অভ্যস্ত হয়ে গেলে সশস্ত্র বিপ্লবের আগ্রহ হারাবে এবং ঘর সংসারে ফিরে যাবে। অথচ তিনি নিজে বিপ্লবের শুরু থেকেই খেয়াল খুশিমত যৌন সঙ্গী বদল করেছেন।
সিরাজ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে (বর্তমান বুয়েট) থার্ড ইয়ারে পড়ার সময়ে তাদের বাসার অপ্রাপ্তবয়স্ক গৃহকর্মী রওশন আরাকে বিয়ে করেন। বলা হয়ে থাকে এই বিয়ের মধ্য দিয়ে নিজের বাবা-মা এবং পরিবারের পেটি-বুর্জোয়া শ্রেণী চরিত্রকে অগ্রাহ্য করে বিপ্লবের পথে সিরাজের যাত্রা শুরু। পাঁচ বছরের দাম্পত্যে তাদের দুই সন্তান – শুভ্র এবং শিখা। যে মার্কিন সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে তার সারা জীবনের বিপ্লব-সংগ্রাম, পরবর্তীতে তার দুই সন্তানই সেই দেশে স্থায়ী নিবাসী হন। রওশন আরা ছিলেন অল্প শিক্ষিত, গরিব ঘরের মেয়ে। বয়সে সিরাজের অনেক ছোট। পার্টি অফিসে রান্নবান্না আর থালাবাসন মাজার মধ্যেই তার জীবন সীমাবদ্ধ। মার্ক্স, লেনিন, মাও সে তুং তার কাছে অর্থহীন।
সিরাজ ১৯৬৯ সালে জাহানারা হাকিম নামে এক বিপ্লবী নারীর প্রেমে পড়েন। তার স্বামী উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা। তার কিশোর বয়সের ছেলেমেয়ে আছে। তিনি গল্প, কবিতা লেখেন। এফ্রো-এশিয়ান রাইটার্স ব্যুরো থেকে পুরস্কার পাওয়া লেখিকা। আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের অধিকারী। ধনী পরিবারে বেড়ে ওঠা। বিএনপি’র আমলে জিয়াউর রহমানের ক্যাবিনেটে উপমন্ত্রী ছিলেন জাহানারা’র বোন। জাহানারা স্বামী-সন্তান ছেড়ে পালিয়ে এসে সিরাজের পার্টিতে যোগ দেন। সিরাজ ঘোষণা দেন – বিপ্লবী পুরুষের জন্যে অনুগত স্ত্রী নয়, প্রয়োজন বিপ্লবী স্ত্রী! এই ফতোয়া দিয়ে তিনি রওশন আরাকে ডিভোর্স দেন এবং জাহানারাকে বিয়ে করেন। পরে কিছুটা অপরাধবোধ থেকেই প্রথম স্ত্রীকে পার্টির এক জুনিয়র কর্মীর সাথে আবার বিয়ে দেন। সিরাজ এবং জাহানারার এক পুত্র সন্তান – অরুণ। যুদ্ধের সময় আট মাসের বাচ্চাকে ঝালকাঠির পেয়ারাবাগানে এক গরিব মায়ের কাছে রেখে দুজনে পালিয়ে ঢাকা চলে আসেন।
পার্টির মধ্যে সবাই জাহানারাকে আপা সম্বোধন করতেন। কর্মীদের তিনি ঝি চাকরের মত খাটাতেন। কিছু বছর পর, জাহানারার সাথে নানা কারণে সিরাজের সম্পর্ক খারাপ হতে থাকে। এসময় জাহানারা মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। দুয়েকবার পিস্তল ঠেকিয়ে সিরাজকে খুন করার চেষ্টা করেন। জাহানারার ছোটবোন রওশন এসময়ে প্রায়ই তাদের বাসায় আসা যাওয়া করতেন এবং এক পর্যায়ে পার্টিতে যোগ দেন। সিরাজ তার শ্যালিকার প্রতি অনুরক্ত হয়ে বড় বোন জাহানারাকে ডিভোর্স দেন। কিছুদিন পরে সিরাজ দুই বোনের সাথেই সম্পর্ক রাখতে চাইলে, রওশন পার্টি ছেড়ে চলে যান। সিরাজ এই নিয়ে তার সাথে চরম দূর্ব্যবহার করেন। অসুস্থ জাহানারা যদিও পার্টিতে থেকে যান।
রওশন চলে যাবার পরে সিরাজের পার্টনার হিসেবে একটা কমবয়সী মেয়েকে আনা হয়। কিন্তু শেষপর্যন্ত সেও বেশিদিন টেকে নি।
এরপর সিরাজ তার বন্ধুপত্নী মনজি খালেদা বেগমকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। তবে তার আগে পরীক্ষামূলক দৈহিক সম্পর্ক করতে চান। খালেদা বিয়ে করতে রাজি হন না। কিন্তু বিপ্লবের স্বার্থে পার্টি লিডারের সাথে তাকে দৈহিক সম্পর্ক করতে হয়। খালেদা ছিলেন পার্টির ফাউন্ডার-মেম্বার সামিউল্লাহ আজমির স্ত্রী। পার্টিতে সিরাজের পরে সেকেন্ড ইন কমান্ড ছিলেন সামিউল্লাহ। খালেদা পরিবারের অমতে পালিয়ে সামিউল্লাহকে বিয়ে করেছিলেন। কিন্তু ১৯৭১ এ যুদ্ধের সময় বিপ্লবের প্রয়োজনে দু’জনকে আলাদা থাকতে বাধ্য করা হয়। সামিউল্লাহকে পাঠানো হয় ফ্রন্টলাইন যুদ্ধে আর খালেদাকে দিয়ে বাসায় ঝিয়ের কাজ করানো হয়। ১৯৭১ সালে সাভারে আওয়ামীলীগ কর্মীদের হাতে সামিউল্লাহ নিহত হন। স্বামীর মৃত্যুর জন্যে খালেদা প্রকারান্তে সিরাজকে দায়ী করেন। মৃত্যুর পরে পার্টির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে সামিউল্লাহ তার যোগ্য সম্মান পান নি। সিরাজ হয়ত চেয়েছিলেন পার্টিতে তার একক নেতৃত্বের পথ সুগম রাখতে।
খালেদার সাথে কিছুদিন থাকার পরে সিরাজ শায়লা আমিন নামে আরেকজন পার্টি সদস্যকে বিয়ে করেন। ১৯৭৪ সালে জাহানারা এবং শায়লা দুজনকে নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে গোপন আস্তানায় চলে যান। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এরা দুজন সিরাজের সাথে ছিলেন। সিরাজ যখন মারা যান, শায়লা তখন প্রেগন্যান্ট ছিলেন।
চট্টগ্রামে হালিশহরে যে পার্টি শেল্টার থেকে সিরাজ গ্রেফতার হন, সেখানে কমরেড ঝুমা নামে একজন কর্মী ছিলেন। ঝুমার সাথে আরেক জুনিয়র কমরেড রবিনের প্রেম। কিন্তু সিরাজ বিভিন্ন সময়ে ওই শেল্টারে গেলে ঝুমার সাথে দৈহিক সম্পর্ক করতেন। এই নিয়ে ঝুমা এবং রবিন দুজনেই ত্যক্তবিরক্ত – কিন্তু সভাপতির বিরুদ্ধে ভয়ে কিছু বলতে পারতেন না। সিরাজের মৃত্যুর পরে ঝুমা নাকি স্বীকার করেছিলেন – পার্টিতে তিনি বেশ্যা ব্যতীত কিছু ছিলেন না এবং প্রতিশোধের তাড়নায় তিনি সভাপতির যাতায়াতের রাস্তার বর্ণনা দিয়ে পুলিশের কাছে চিঠি লিখেছিলেন। যার সূত্র ধরে ১৯৭৫ সালের ১ জানুয়ারি সিরাজ গোয়েন্দাদের হাতে গ্রেফতার হন এবং ২ জানুয়ারি নিহত হন। এসময় তার বয়স হয়েছিল মাত্র ৩০ বছর। সিরাজের গ্রেফতার হবার পিছনে বেশ কয়েকটা ভিন্ন ভিন্ন কাহিনী পাওয়া যায়। তার মধ্যে পুলিশের কাছে ঝুমার গোপনে চিঠি পাঠানো একটা। যদি এটা সত্যি হয়, তাহলে বলা যায় নিজের দলের মধ্যে যৌনতা ঘটিত কারনেই সিরাজের মত বিপ্লবীর মৃত্যু হয়েছিল।
বয়সের বিচারে যৌবনের শ্রেষ্ঠ সময়ে – অর্থাৎ ২০ বছর থেকে ৩০ বছর বয়সে তিনি বিপ্লব করেছেন। এটা যদি আরো ম্যাচুরড বয়সে - ৪০ কিংবা ৫০ বছরে বয়সে করতেন তবে কি ভিন্ন পরিণতি হত? একই প্রশ্ন তার দলের বাকি সবার বেলায়ও প্রযোজ্য।
সাপ্তাহিক বিচিত্রার থ্রিলার কাহিনী
সিরাজ সিকদার গ্রেফতার হবার সবচে’ প্রচলিত বয়ানটি সম্ভবত সত্যি নয়। সাংবাদিক মাহফুজ উল্লাহ ১৯ মে ১৯৭৮ সাপ্তাহিক বিচিত্রায় এই বয়ানটি ছাপেন। বলা বাহুল্য বিচিত্রা সেই সময়ের দর্শকনন্দিত, বহুল পঠিত পত্রিকা। যার ফলে মাহফুজ উল্লাহ বর্ণিত সিরাজ হত্যার একটা জম্পেশ থ্রিলার কাহিনী পাঠক সমাজে দ্রুত জনপ্রিয়তা পায় যা পরবর্তীকালে বিভিন্ন বইয়েও রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বিতর্কিত আন্ডারগ্রাউন্ড রাজনীতির কারণে সিরাজ সিকদারকে নিয়ে সাধারনের মনে এমনিতেই একটা আগ্রহের জায়গা ছিল। মূলতঃ এটাকে পুঁজি করে মাহফুজ উল্লাহ থ্রিলার গল্প ফাঁদেন, যেখানে দাবি করা হয় সিরাজ এবং তার একজন সহযোগী চট্টগ্রামের হালিশহরে পূর্ব নির্ধারিত গোপন পার্টি মিটিং থেকে বের হয়ে তাদের অন্য একটি শেল্টারে যাবার জন্যে বেবিট্যাক্সিতে ওঠেন। সিরাজের হাতে ব্রিফকেস, গায়ে টেট্রনের সাদা ফুলশার্ট, ঘিয়া কালারের প্যান্ট, চোখে কালো চশমা। যেন বা সিনেমার নায়ক (বা ভিলেন)। এসময়ে সম্পূর্ণ অপরিচিত এক লোক তাদের কাছে এসে লিফট চান। বলেন অল্প কিছুদূর সামনে গিয়েই নেমে যাবেন। প্রথমে নিমরাজি থাকলেও পরে সিরাজ তাকে সঙ্গে নিতে রাজি হন। চট্টগ্রাম নিউমার্কেট এর সামনে এই লোক ট্যাক্সি থামাতে বলে সিরাজের সাথে বাক-বিতণ্ডা শুরু করেন এবং এক পর্যায়ে পিস্তল বের করে ড্রাইভারকে থামাতে বাধ্য করেন। এসময় সাদা পোশাকে গোয়েন্দাবাহিনীর আরো লোকজন অস্ত্রসহ জড়ো হন এবং সিরাজকে গ্রেপ্তার করেন। আশেপাশে উৎসুক জনতার ভিড় জমে যায়। তাদের বলা হয় এখানে একজন বড় কালোবাজারিকে ধরা হয়েছে। মাহফুজ উল্লাহ তার প্রতিবেদনে এই বেবিট্যাক্সি কাহিনীর কোন তথ্যসূত্র দেননি। সিরাজ এবং তার দলের সদস্যরা দৈনন্দিন জীবনে যেধরণের কঠোর গোপনীয়তা মেনে চলতেন, তাতে একজন আগন্তুককে সাথে নিয়ে ট্যাক্সিতে ওঠার গল্প বেশ হাস্যকর। যদিও থ্রিলারের প্লট হিসেবে মন্দ নয়। তাছাড়া ১৯৭৮ সালে মাহফুজ উল্লাহ’র প্রতিবেদন লেখার সময়ে ওই আগন্তুক এবং ট্যাক্সি ড্রাইভার ছাড়া এই ঘটনার সাক্ষী দেবার মত কেউ বেঁচে ছিলেন না। সিরাজ এবং তার সহযোগী অনেক আগেই খুন হন। তাহলে উনি এই কাহিনী পেলেন কোথায়?
শামীম সিকদারের হিপোক্রিসি?
সিরাজের ছোটবোন শামীম সিকদার সম্পর্কে অনেক গল্প কাহিনী প্রচলিত। তিনি ভাইয়ের মৃত্যুর জন্যে শেখ মুজিবকে দায়ী করেছিলেন। তার ব্যাগে সবসময় একটা পিস্তল নিয়ে ঘুরতেন এবং বলতেন সুযোগ পেলে মুজিবকে খুন করবেন। অথচ সিরাজকে দাফনের কয়েকদিনের মধ্যেই শামীমের একটা প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয় যেখানে তার বানানো শেখ মুজিবের আবক্ষ মূর্তি উন্মোচন করা হয়। রাষ্ট্রপতির অফিস থেকে শামীমকে এই কাজের জন্যে দশ হাজার টাকা দেয়া হয়। শেখ মুজিবের ওপর তার রাগ সত্যি হলে তিনি হয়ত দশ হাজার টাকার অফার ফিরিয়ে দিতেন এবং শেখ মুজিবের ভাস্কর্য করতেন না।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন