নীল, উষ্ণতম রঙ

সামনে পুরস্কারের মৌসুম; আসছে ক্রিটিক চয়েস, বাফটা, ইন্ডিপেনডেন্ট স্পিরিট, গোল্ডেন গ্লোব, অস্কার। যে ক'টার নমিনেশন ইতিমধ্যে ডিক্লেয়ার করা হয়েছে তাদের মধ্যে ফরেন ক্যাটাগরিতে একটা কমন নাম হলঃ Blue is the Warmest Color - চলতি বছরে সোদারবার্গ, পোলানস্কি, কোয়েন ব্রাদার্স, ফ্রাঙ্কোয়িস ওজোন, জিম জারমুশ কিংবা আসগার ফারহাদি'র সিনেমার সাথে পাল্লা দিয়ে পাম ডি'অর জিতে নেয়া সিনেমা।

পরিচালক - তুলনামূলকভাবে অখ্যাত আবদেললতিফ। দেখে শুনে যা মনে হচ্ছে আসছে অস্কারে Blue is the Warmest Color is gonna be the next Amour. ভালো করে খুঁজলে হয়তো Amour এর সাথে দুয়েকটা মিলও পাওয়া যাবে। যেমন - দুটো সিনেমারই মূল উপজীব্য হল দুইজন মানুষের মাঝখানে একটা আবেগঘন সম্পর্ক এবং তার টানাপোড়েন। অবশ্য এছাড়া আর কিছু মিল খুঁজতে যাওয়া অবান্তর হবে। কারন একটা হলো বুড়ো-বুড়ির প্রেম আর আরেকটা দুরন্ত লেসবিয়ান প্রেম!

লেসবিয়ান প্রেমের সিনেমা দেখতে ভালোই লাগে। মনে আছে শামীম শরীফের দুইটা সিনেমা দেখেছিলাম অনেক আগে। লিজা রে ছিলো। বেশ লেগেছিলো। কিন্তু একটা পর্যায়ে গিয়ে সিনেমাগুলো কিছুটা সিরিয়াস মেসেজধর্মী হয়ে যায়। লেসবিয়ানিজমের ফাঁক গলে তখন নারী স্বাধীনতা, নারীর অধিকার, নারী মুক্তি ইত্যাদি ঢুকে পড়ে। সিনেমা শিক্ষামূলক হয়ে উঠলে আর ভালো লাগে না। এর'চে ডকু ভালো।

সেই বিবেচনায় - Blue is the Warmest Color অনেক ভালো ছবি। কিন্তু আমার ধারণা - আমার নিজস্ব সাংস্কৃতিক সীমাবদ্ধতার কারনে এখনো সমকামী প্রেমের গল্প আর দশটা প্রেমের গল্পের মত অতো সহজ সাবলীলভাবে নিতে শিখে নি। আমার কাছে এটা বড়জোড় এক রাতের এডভেঞ্চার হতে পারে (আহা Room in Rome)। 


Blue is the Warmest Color -এ নীল রঙের একটা মৌন উপস্থিতি আছে। মৌন বললাম এ কারনে যে এই নীল রঙ নিয়ে সিনেমার কোথাও কোন আলোচনা নেই, কোথাও কোন কথোপকথন নেই। কেউ হঠাৎ বলে উঠে না যে - দেখো আজকের আকাশটা কী নীল! কিংবা জানো? আমার সবচে' প্রিয় রঙ কি?

অথচ পুরো সিনেমা জুড়ে নীল রঙ চোখে পড়ে সবসময়। বাসার দরজায়, দেয়ালে, বিছানার চাদরে, আঙুলের আংটিতে এমনকি প্রেমিকার চুলে! এডেল নামে যে মেয়েটির যৌনতা নিয়ে কাহিনী আবর্তিত হয়েছে নীল রঙের প্রতি তার বিশেষ দূর্বলতা লক্ষ্যনীয়। যদিও সে কখনো মুখ ফুটে সেটা বলে না। কিন্তু স্কুলে যে মেয়েটাকে তার বিশেষ ভালো লাগে সে নীল পাথর বসানো আংটি পড়ে। পরবর্তীতে যার প্রেমে হাবুডুবু খেতে খেতে অনেক ছেলেকে ফিরিয়ে দেয় তার মাথায়ও নীল রঙের চুল।

এডেল তখন সদ্য অষ্টাদশী। ক্লাসের সবচে' সুন্দরী মেয়ে। অনেক ছেলেই তার মনোযোগ প্রার্থী। অথচ পুরুষসঙ্গে তার দুনিয়ার অনাগ্রহ। কোন এক নীল নয়না, নীল কেশবতীকে ভেবে সে একান্তে মাস্টারবেড করে। প্রথমদিক মনে হয়েছিল এটা হয়তো একান্তই প্রথম যৌবনের কিউরিওসিটি প্রসূত ব্যাপার। কিন্তু পরবর্তীতে দেখা যায় - না; She is serious.

এমা'র সাথে এডেলের প্রথম আলাপ হয় একটা লেসবিয়ান বারে। সে আলাপ পরবর্তীতে বিছানা পর্যন্ত গড়ায়। এমা বয়সে বড়, অভিজ্ঞ; পেশায় একজন আর্টিস্ট। দুইজনের বিভিন্ন বিষয়ে কথোপকথন থেকে জানা যায় একমাত্র নারী শরীরের প্রতি আকর্ষন ছাড়া দু'জনের মধ্যে আর কোন বিষয়েই মিল নেই। এডেল পিকাসো ছাড়া আর কোন আর্টিস্টের নামই জানে না। এদিকে এমা কথায় কথায় সার্ত্রে কোট করে; বিভিন্ন দর্শন নিয়ে কথা বলে। এমা'র এই ব্যক্তিত্বের কাছে এডেল সবসময় কেমন যেন ক্ষুদ্র হয়ে থাকে। সে কিছুতেই এমা'র কিংবা এমা'র বন্ধুদের আড্ডায় অংশ নিতে পারে না।

এডেল একসময় ওর বাবা-মা'র বাসা ছেড়ে এমা'র বাসায় উঠে আসে। কিন্তু, তখনো সবার কাছে বিশেষ করে বাবা-মা'র কাছে নিজেকে লেসবিয়ান বলে পরিচয় দিতে সে অস্বস্তিতে ভোগে। একবার তো স্কুলে আরেকটি মেয়ের সাথে প্রায় মারামারিই বাঁধিয়ে ফেলেছিলো যখন মেয়েটি এডেলকে সবার সামনে লেসবিয়ান বলে গালি দেয়। এমা'র বন্ধুরা অবশ্য অনেক খোলামেলা। অধিকাংশই তার মতো আর্টিস্ট কিংবা শিল্পী সাহিত্যিক। তারা এডেলকে খুব স্বাভাবিকভাবেই নেয়।

এমা'র পুরনো প্রেমিকা ফিরে এলে এডেল ও এমা'র মাঝে দূরত্ব তৈরি হয়। এডেল তখন কিছুটা অবহেলিত বোধ করে। যার পরিনতি ঘটে বিচ্ছেদে। শেষপর্যন্ত এডেলকে এমা তার বাসা থেকে বের করে দেয়। এডেল ছোটদের একটা স্কুলে চাকরি নেয়। কিন্তু বিচ্ছেদের বেদনা তাকে পিছু ছাড়ে না। নীলাক্ষী এমাকে সে কিছুতেই ভুলতে পারে না।

সবচে' ভালো লেগেছে এডেলের অভিনয়। তার চোখ-মুখের অভিব্যক্তিতে, উস্কোখুস্কো চুলে সদ্য যৌবনে পা দেওয়া মূল চরিত্রটা প্রায় নিবিড়ভাবে ফুটে উঠেছে। অনেক সমালোচক তো তাকে ইতোমধ্যেই ২০১৩-এর শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর মুকুট পরিয়ে দিয়েছেন।

সিনেমার একটা খারাপ দিক হলো - এডেল এবং এমার শরীরী অন্তরঙ্গতার দৃশ্যগুলোর কোন ভালো ইন্ট্রো নেই; হঠাৎ করে কাটপিসের মত শুরু হয়। তখন দৃশ্যগুলোকে আরোপিত মনে হয়, অপ্রয়োজনীয় মনে হয়। মনে হয় পরিচালক বুঝি বাণিজ্যিক চাহিদা মেটানোর ধান্দা করছেন। আরেকটা দৃষ্টিকটু ব্যাপার হলো - এডেল এবং এমা দু'জনের পুরো শরীরই অত্যন্ত পরিপাটিভাবে waxed দেখানো হয়েছে। পর্নোগ্রাফির আর্টিস্ট ছাড়া এরকমটা সচরাচর দেখা যায় না। এর মধ্যেও তাই সস্তা বাণিজ্যের অনুষঙ্গ খুঁজে পেয়েছি।  

সিনেমাটা দেখার পরে আমার মনে হয়েছে এটা অবলীলায় একটা নারী-পুরুষের প্রেমের গল্প হতে পারতো।পরিচালক মূলতঃ দেখাতে চেয়েছেন - যে কোন সম্পর্কই আসলে টিকে থাকে ইন্টেলেকচুয়াল মিল মহব্বতের উপর। শুরুতে শারীরিক মোহ থাকলেও সেটা হয় ক্ষনিকের জন্যে। তাহলে কেন এই লেসবিয়ানিজম? - জানি না। আখেরে হয়তো এতে কাটতি বাড়ে। ক্রিটিকদের একটু বেশি বাহবা মিলে কিংবা কে জানে হয়তো দুটো পুরস্কারও বেশি জোটে।
------------------------------------------------------


1 টি মন্তব্য:

ঋত্বিক বলেছেন...

অস্কারে তো পাত্তাই দিল না!! লেসবিয়ান না হয়ে গে ছবি হলে মনে হয় শুধু নমিনেশন না পুরস্কারও পেত