Veere Di Wedding এর নারীমুক্তির দায়


গেল হপ্তায় বিবিসি’র একটা রিপোর্ট পড়ছিলাম- কারিনা কাপুর, সোনম কাপুরের নতুন ছবি ভিরে দি ওয়েডিং নিয়ে। রিলিজ হবার পর থেকেই নাকি সমগ্র ভারতবর্ষ জুড়ে এ ছবির বিরুদ্ধে মুহুর্মুহু প্রতিবাদ ও নিন্দার ঝড় বয়ে যাচ্ছে। বিশেষত সামাজিক-যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যবহারকারীরা নানা উছিলায় ছবির কুশীলবদের বেশ এক হাত নিচ্ছেন। তাদের হয়তো অনেকেই বুক-ভরা আশা নিয়ে, অনেকদিন পর বড় পর্দায় কারিনা কাপুরকে দেখতে গিয়েছিলেন। শ্বশুরবাড়ি যাবার পর সোনমকেও আর সেভাবে দেখা যায় নি। অনুযোগ শুনে মনে হচ্ছে কারিনা, সোনম দুজনেই তাদের কাঙ্ক্ষিত মনোরঞ্জনে ব্যর্থ হয়েছেন। তাই আম-জনতা এখন বিফলে মূল্য ফেরত চাচ্ছেন।
গড়পড়তা অভিযোগ- এ ছবি অশ্লীল! ছবিতে মেয়েরা সিগারেট খায়, মদ খায়, সেক্স করে, মাস্টারবেট করে এবং অসভ্য ভাষায় গালি দেয়। এতই খারাপ অবস্থা যে- মা, বোন, ঠাকুমার সাথে স্বাচ্ছন্দ্যে বসে দেখা যাচ্ছে না। আমার যেহেতু কোন বোন নেই; মা খুব একটা সিনেমা দেখেন না; ঠাকুমাও স্বর্গত- তাই এক প্রকার বিনা বাধায়, নির্ঝঞ্জাট ভাবেই ছবিটা দেখা হল। ‘দেখা হল’ বললে হয়তো ভুল বলা হবে, বরং বলা উচিত ‘চোখ বুলানো হল’। অত্যন্ত বাজে মেকিং এর কারণে পুরো ছবি দেখার আগ্রহ আর ধরে রাখতে পারিনি। অগত্যা টেনেটুনে যতটুক না দেখলেই নয় ততটুকই দেখেছি। বলতে দ্বিধা নেই- আসলে নেগেটিভ রিভিউ পড়েই ভিরে দি ওয়েডিং দেখার আগ্রহ হয়েছিল। নিখিল ভারতে নারী-চরিত্র প্রধান সিনেমা বড্ড অপ্রতুল। তাই কদাচিৎ দুয়েকটা সিনেমার কথা কানে এলে দেখার লোভ সামলাতে পারি না।
ছবির গল্প চার বান্ধবীকে ঘিরে- প্রচলিত সমাজের চাপিয়ে দেয়া বিধি-বিধানে ত্যক্ত-বিরক্ত চার তরুণী। একজন প্রেমিক-সমেত অস্ট্রেলিয়াবাসী। ঘুরে-ফিরে, গায়ে হাওয়া লাগিয়ে, সুখে-শান্তিতেই দিন কাটছিল তাদের, until হঠাৎ করেই একদিন প্রেমিকবর হাঁটুগেড়ে উচ্চারণ করে বসেন সেই ঐতিহাসিক আপ্তবাক্য- Will you marry me? ছবিটা মূলত এই দৃশ্য থেকেই গতানুগতিক ধারা থেকে ভিন্ন দিকে বাঁক নেয়। কারণ এরপর আমরা সচরাচর যা দেখে থাকি- প্রেমিকার চোখে আবেগের জল, দু’হাতে মুখ ঢেকে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে- Oh My God! কিংবা আগ বাড়িয়ে কোলে চেপে সাহসী চুমু – তার কোনটাই ঘটতে দেখা যায় নি। প্রেমিকা উল্টো গোঁ ধরে বসেন- তিনি বিয়ে করবেন না! সংসার মানেই স্যাক্রিফাইস, এক ঘেঁয়ে রুটিনমাফিক জীবন, সপ্তাহান্তে শাশুড়ির সাথে ঝগড়া, ননদের সাথে মন কষাকষি, মুদির দোকানে বাকি ইত্যাদি ইত্যাদি। তার চে’ এখন যেমন চলছে সেই ভাল, সেই ভাল, আমারে নাহয় না জানো… (পড়ুন লিভ-টুগেদার)
আরেক বান্ধবীর অল্প বয়সে ইয়ে করে বিয়ে। শুরুর কয়েকবছর সব ঠিকঠাকই চলছিল। কিন্তু এরপর যা হয়- প্রাথমিক উচ্ছ্বাস কেটে যাবার পর দাম্পত্য সম্পর্কে ভাটা। ইনি আবার বেজায় ঠোঁট-কাটা, চেইন-স্মোকার এবং পানাহার পটীয়সী। বালিশের নিচে লুকানো থাকে ভাইবেট্রর। স্বামী টের পেয়ে গেলে শুরু হয় ব্ল্যাকমেইলিং- শ্বশুর-শাশুড়িকে বলে দিবেন তাঁদের মেয়ের কাণ্ডকীর্তি। মাস্টারবেশান তো গর্হিত অপরাধ।
তৃতীয় বান্ধবীর ছোট বেলা থেকে একটাই স্বপ্ন- তিনি একটা ধবধবে ফর্সা, বিদেশী ছেলে বিয়ে করবেন। ভারতীয় যুবকে তার তীব্র অনীহা। পরিবারের ইচ্ছের বিরুদ্ধে তিনি বিয়েও করেন ঠিকঠাক; কিন্তু ছেলে-পুলে হবার পর থেকেই জীবনটা কেমন যেন তেজপাতা সদৃশ হয়ে গেল। সংসার আর ছেলে সামলাতে সামলাতে মুটিয়ে গেলেন শেষমেষ।
চতুর্থ বান্ধবী আইবুড়ি, চৌকস ডিভোর্স Lawyer। সব matrimony সাইটেই প্রোফাইল খোলা আছে। সম্বন্ধও আসছে প্রচুর। কিন্তু কিছুতেই ব্যাটে-বলে হচ্ছে না। এই যেমন একজন কর্পোরেট lawyer এর সাথে আলাপ হল সেদিন, দেখতে শুনতে মন্দ নয়, আয় উপার্জন ভাল। দোষের মধ্যে কেবল একটাই- বেজায় মাতৃভক্তি। এমনকি পার্টীতে হালকা চুমু খাবার আগেও মা’র পারমিশন নেয়া লাগে। তাই তো রেগেমেগে এই বান্ধবীর কণ্ঠে আক্ষেপ- “যা, তেরি মা সে শাদি করলে; you bloody mother-lover!”
বুঝতেই পারছেন, কোমলমতি ভারতীয় দর্শকদের মনে আঘাত দেবার মত অনেক উপকরণে ভরপুর এই ছবি। এ নিয়ে আর কিছু বলার নেই। কিন্তু দেখা যাচ্ছে বেশ কিছু “প্রগতিশীল” নারীবাদী সংগঠনও বেশ চটে আছেন। তাদের দাবী- মেয়েরা নাকি অনেক ভাল। ছবিতে তাদের ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। নইলে তারা এরকম হতেই পারে না।
কথিত আছে- নারীবাদীরা সতত একটু বেরসিক হয়ে থাকেন। কিন্তু, তাই বলে সবকিছুর উপর নারী অধিকার, নারী মুক্তির দায় চাপিয়ে দেয়াটা একটু ‘বেশি-বেশি’ হয়ে যায় বৈকি। নারী-চরিত্র প্রধান সিনেমা মাত্রই কেন তাকে morally superior বা শিক্ষামূলক কিছু হতে হবে? সমাজ উদ্ধার করার দায় কি তার একার? Why can’t we take it as a plain fun/comedy film like Masti, Grand Masti or GolMaal?
শিল্পমূল্য বিচারে ভিরে দি ওয়েডিং এর মত ছবি হয়ত ধোপে টিকবে না। কিন্তু কিছু প্রগতিশীলতার ট্যাবু ভাঙ্গার জন্যে এধরনের সিনেমার প্রয়োজন আছে। নইলে নারীমুক্তির আন্দোলন গুটিকয়েক NGO’র মত-বিনিময় সভায় আটকে থাকতে পারে।
১৬.৬.২০১৮

কোন মন্তব্য নেই: