মূল গল্পঃ Drive My Car
বইঃ Men Without Women
বইঃ Men Without Women
(১)
পৃথিবীর সব মেয়ে-ড্রাইভারদের আসলে দুইটা গ্রুপে ভাগ করা যায়ঃ এক দল হলেন ওভার কনফিডেন্ট; 'গাঁয়ে-মানে-না-আপনি-মোড়ল' প্রকৃতির - যারা আশপাশের কোনকিছুর তোয়াক্কা না করে সবসময় বেপরোয়া গাড়ি চালান এবং যথারীতি নানা ধরনের বিপত্তি ঘটান। রাস্তাঘাটের সাধারন পথচারী কিংবা অন্য যানবাহনের যাত্রী অথবা চালকদের তীব্র (অশ্লীল?) কটাক্ষেও এদের মোটেই বিচলিত হতে দেখা যায় না। ভাবখানা এমন যে রাস্তাটা তাদের পৈতৃক সম্পত্তি। আর অন্য দল হলেন ভীষণ ভীতু প্রকৃতির - খুব দেখেশুনে, যত্ন করে, ধীরে সুস্থে, অনেক সময় নিয়ে ড্রাইভ করেন। যেন আরেকটু স্পীড বাড়ালেই গাড়িটা টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙ্গে পড়বে।
সঙ্গত কারণেই প্রথম দলের সাথে গাড়িতে ওঠাটা বিপ্পজনক আর দ্বিতীয় দলের সাথে ওঠাটা রীতিমত বিরক্তিকর।
অন্ততঃ মি. কাফুকু'র (Kafuku) তাই ধারণা। ছেলে-ড্রাইভারদের মধ্যেও যে ভাল খারাপ থাকে না তা না। কিন্তু ব্যবধানটা কখনো এত প্রকট হয়ে চোখে পড়ে না হয়তো। কাফুকু সাহেব অবশ্য ব্যক্তিজীবনে মোটেই সেক্সিস্ট নন। নারী-পুরুষ সবার সাথেই কাজ করে অভ্যস্ত। বরং বেশিরভাগক্ষেত্রে মেয়েদের সাথেই কাজ করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। কাজের ক্ষেত্রে মেয়েরা পুরুষদের চেয়ে বেশি আন্তরিক এবং যত্নবান হয়ে থাকে।
কিন্তু, কেন যেন, মেয়ে ড্রাইভারের গাড়িতে উঠলেই তার ব্লাড প্রেসার বেড়ে যায়। সারাটা পথ কেমন একটা অস্বস্তি হতে থাকে। এই সম-অধিকারের যুগে কাউকে যে বিষয়টা একটু খোলাসা করে বলবেন তারও সাহস পান না। তাই, ওবা (Oba) যখন জানাল সে কাফুকু'র জন্যে একজন মেয়ে ড্রাইভার খুঁজে পেয়েছে, তিনি বেশ অবাক হলেন, বলা বাহুল্য কিঞ্চিত ভয়ও পেলেন।
ওবা বুঝতে পেরে হাসি হাসি মুখ করে বললোঃ এইবার একটু ভরসা রাখেন, বস। এই মেয়ে আমার চেয়ে ভালো চালায়। আপনি অন্তত একবার কথা বলে দেখেন। ভালো না লাগলে না করে দিয়েন। আমার কোন সমস্যা নাই।
কাফুকু কিছুটা দ্বিধার সুরে বলেঃ আচ্ছা ঠিক আছে, এত করে যখন বলছো..
আসলে একজন ড্রাইভারের খুব আর্জেন্ট দরকার। গত পনের বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি ওবা'র গ্যারেজে গাড়ি ঠিক করান। এই লাইনে ওবার মত এক্সপার্ট লোক খুব একটা নাই। অতএব তার কথার উপর ভরসা করা যায়।
ওবাঃ আশাকরি কালকের মধ্যেই আপনার কাজটা শেষ হয়ে যাবে। তাও আমি সামনের চাকার এলাইনমেন্টটা আরেকবার চেক করে দেখবো। আপনি কি পরশুদিন দুইটার দিকে একটু আসতে পারবেন? তাহলে ওই মেয়েকেও এই সময়ে আসতে বলতাম। গাড়ি এর মধ্যে ঠিক হয়ে গেলে সে আপনাকে একটু আশে পাশে টেস্ট ড্রাইভ করে দেখালো... না কি?
কাফুকু মিরর-গ্লাসটা এডজাস্ট করতে করতে বলেঃ ওর বয়স কেমন হবে আন্দাজ?
ওবাঃ সেভাবেতো জিজ্ঞেস করা হয়নি। হবে হয়তো চব্বিশ-পঁচিশ। তবে ভালো ড্রাইভার এতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু..
কাফুকুঃ কিন্তু কী?
ওবা একটু কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলেঃ কিভাবে যে বলি... মানে একটু কম কথা বলে আর কি।
কাফুকুঃ মানে?
ওবাঃ আমি তাকে কখনো হাসতে দেখি নাই। একটু ঠোঁট-কাটা টাইপের আছে। আর দশটা মেয়ের তুলনায় একটু বেশি সাদাসিধে। আর... চেইন স্মোকার। সত্যিকথা বলতে একটু পাগল কিসিমের আছে। তবে গাড়ীটা সে ভালোই চালায়। পুরোপুরি প্রফেশনাল যাকে বলে।
কাফুকুঃ কম কথা বলাই ভাল। তাতে আমার অসুবিধা নাই। সুন্দরী হলেই বরং ঝামেলা বাড়ত।
ওবাঃ ওহ, তাইলে তো ঠিকই আছে।
কাফুকুঃ এর আগে কোথায় কাজ করতো জানো কিছু?
ওবাঃ শুনেছি সুপার শপে ছিল বেশ কিছু দিন। এখন কুরিয়ার সার্ভিসের ডেলিভারির কাজ করে। আমার কাছে এসছিল একটা চাকরির জন্যে- আমারই এক বন্ধুর রেফারেন্সে। আপনি তো জানেন আমার অবস্থা। পুরনো যারা আছে তাদের বেতন দিতেই হিমশিম খাচ্ছি। নতুন লোক রাখি কি করে; মাঝে অবশ্য কিছু দিন পার্ট-টাইম করেছে এখানে। তাই বলছি - মেয়েটা বিশ্বস্ত। আর কোনও বদভ্যেস নাই - মদ টদের ব্যাপারে কোন..
কথা শেষ করতে না দিয়েই, কাফুকু বেরিয়ে যেতে যেতে বলেঃ আচ্ছা ঠিক আছে। তাহলে পরশু দেখা হচ্ছে। দেখো ওইদিন যেন গাড়িটা ঠিকঠাক নিয়ে যেতে পারি।
(২)
কথামত একদিন পর কাফুকু সাহেব গাড়ি নিতে হাজির হলেন ওবা'র গ্যারেজে। মোটামুটি সব ঠিকঠাক - নতুন ব্রেক প্যাড লাগানো হয়েছে, ওয়াইপার ব্লেডগুলো চেঞ্জ করা হয়েছে, সামনের ডানদিকের ফেন্ডারটা ঠিক জায়গায় ফিরিয়ে আনা গেছে, ট্রান্সমিশনটাও রিএডজাস্ট করা হয়েছে। রঙ করার পর মনেই হচ্ছে না এই সাব-৯০০ কনভার্টিবলের বয়েস ১২ বছরের বেশি। ক্যানভাস রুফটা এখানে সেখানে ক্ষয়ে গেছে। বৃষ্টির সময় এক আধটু পানিও পড়ে। কিন্তু আজ পর্যন্ত কখনো নতুন গাড়ী কেনার প্রয়োজন বোধ করেননি কাফুকু। কেমন যেন একটা অদ্ভুত মায়ায় পড়ে গেছেন গাড়িটার।
কানভার্টিবলের এই একটা সুবিধা - যখন খুশি ছাদটা নামিয়ে চারপাশটা দেখতে দেখতে চালানো যায় - আকাশে ছুটে বেড়ানো মেঘ, দূরে ঘন সবুজ পাহাড়ের সারি, ইলেক্ট্রিকের তারে বসা পাখি - কাফুকুর এইসব ভালো লাগে।এমনকি কনকনে শীতের মধ্যেও ভারী জাম্পার আর গলায় মাফলার জড়িয়ে দিব্যি ছাদ নামিয়ে গাড়ি চালিয়েছেন; গরমের দিনে সানগ্লাস আর ক্যাপ।
কাফুকু বনেটের উপর ধীরে ধীরে হাত বুলিয়ে দেখেন সব ঠিকঠাক আছে কিনা। যেন কোন অভিজ্ঞ অশ্বারোহী রেসের আগে তার প্রিয় ঘোড়ার গায়ে আদর করছেন।
গাড়িটা কেনার সময় তার স্ত্রী বেঁচে ছিলেন। হলুদ রঙটা তারই পচ্ছন্দ করে দেয়া। প্রথম প্রথম দু'জন মিলে হুটহাট করে শহরের বাইরে, দূরে কোথাও চলে যেতেন। কয়েকদিন বাইরে কাটিয়ে তারপর শহরে ফিরতেন। তার স্ত্রীর ড্রাইভিং লাইসেন্স ছিল না। তাই কাফুকুকেই চালাতে হত।
অবশ্য গত বছর দশেক ধরে একাই ড্রাইভ করছেন। স্ত্রী মারা যাবার পরে, বেশ ক'জনের সাথে আলাপ হয়েছিল বটে, কিন্তু কেন যেন কারো সাথেই সে রকম ভ্রমণের সুযোগ হয়ে ওঠেনি আর। আসলে তিনি নিজেও দরকার ছাড়া খুব একটা শহরের বাইরে যান নি।
ওবাঃ কি বুঝলেন? এখানে সেখানে কিছু আবছা দাগ আছে বটে, তবে ঠিকমত যত্ন আত্তি নিলে এখনো অনেকদিন টিকে যাবে। সুইডিশ ব্র্যান্ড বলে কথা।
কাফুকু বিলের টাকা দিতে দিতে ড্রাইভার মেয়েটি এসে হাজির হল। দোহারা শক্ত গড়ন। ৫ ফুট ৫ এর মত হবে; প্রশস্ত কাঁধ। কাঁধের পেছনে বাঁ দিকটায় একটা গোলাপি আঁচিলের মত দাগ - জন্মদাগ হবে হয়তো। ওবার কথাই ঠিক - মেয়েটাকে প্রচলিত অর্থে আর যাই হোক ঠিক সুন্দরী বলা যায় না। কিশোরী বয়সের ব্রণের দাগ এখনো স্পষ্ট। বড় বড় চোখ দুটিতে খুব তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। ছেলেদের একটা হেরিংবোন জ্যাকেট পড়ে আছে- যদিও এখনো শীত আসতে ঢের দেরি। সাথে ব্রাউন কটন প্যান্ট, পায়ে কালো কনভার্স স্নিকার্স। জ্যাকেটের নিচে ফুলহাতা সাদা টিশার্ট; তার নিচে সুডৌল স্তন আবছা প্রতীয়মান।
ওবা পরিচয় করিয়ে দিল। ও হল মিসাকি ওয়াতারি।
মিসাকিঃ মিসাকির কোন কানজি শব্দ নেই কিন্তু। হিরাগানাতে লেখা। আপনার যদি কোন CV এর প্রয়োজন হয়, তাহলে বলবেন পাঠিয়ে দেব।
(কানজি = চীনা অক্ষর প্রণালী যা জাপানিরা প্রাচীনকাল থেকে ব্যবহার করে; হিরাগানা = ফোনেটিক জাপানি অক্ষর প্রণালী- আমরা যেভাবে রোমান হরফে বাংলা লিখি)
মিসাকির কথার টোনে ঔদ্ধত্য স্পষ্ট।
কাফুকু মাথা নেড়ে সায় দিল- না, এই মুহূর্তে CV এর প্রয়োজন নাই। তুমি তো ম্যানুয়াল গিয়ারে অভ্যস্ত, না কি?
আমি ম্যানুয়ালই প্রেফার করি - মিসাকি প্রায় শীতল কণ্ঠে জবাব দিল।
কাফুকুঃ দেখতেই পাচ্ছো বেশ পুরনো গাড়ি; সো কোন GPS নাই।
মিসাকিঃ আমার দরকার পড়ে না। দীর্ঘদিন কুরিয়ার সার্ভিসের ডেলিভারির কাজ করেছি। মাথার ভেতরেই ম্যাপ ঢুকে গেছে।
কাফুকুঃ বেশ। তাহলে চল ছোটখাট একটা টেস্ট ড্রাইভ করা যাক। বাইরে তো দেখছি রোদ আছে আজকে, ছাদটা নামানোই থাক।
মিসাকিঃ কোথায় যেতে যান?
কাফুকুঃ সামনে Tengenji মোড় থেকে ডানদিকে গিয়ে Meijiya সুপার মার্কেটের আন্ডারগ্রাউন্ড পার্কিংয়ে যাও। আমার কিছু জিনিস শপিং করার আছে। তারপর Arisugawa পার্ক পেরিয়ে, ফ্রেঞ্চ এমব্যাসি আর Gaien Nishi Dori পেরিয়ে আবার এখানে ফিরে আসতে পার।
আর কোন প্রশ্ন না করে, ওবার কাছ থেকে গাড়ির চাবিটা নিয়ে মিসাকি শীতল কণ্ঠে বললোঃ ঠিক আছে, যাওয়া যাক তাহলে।
খুব দ্রুততার সাথে গিয়ার, সাইড-ভিউ মিরর আর সিট ঠিক করে নিল। বোঝাই যাচ্ছে আগে থেকেই তৈরি হয়ে ছিল সে। জ্যাকেটের পকেট থেকে একটা সবুজ সানগ্লাস পড়ে নিয়ে কাফুকুকে ইঙ্গিতে জানালো সে প্রস্তুত।
মিসাকি গাড়ি স্টার্ট নিতে নিতে অবাক কণ্ঠে বলল- আহ! ক্যাসেট প্লেয়ার?
কাফুকুঃ হুম, আমি ক্যাসেট পচ্ছন্দ করি; রিহার্সেলে হেল্প করে।
মিসাকিঃ অনেকদিন পর দেখলাম।
কাফুকুঃ আমি যখন ড্রাইভিং শিখি তখনতো ক্যাসেটও ছিল না; সব গাড়িতে এইট-ট্র্যাক চলতো।
মিসাকি চুপচাপ ড্রাইভ করে চলল। এইট-ট্র্যাক প্লেয়ার যে কি বস্তু এটা অবশ্য মিসাকি'র জেনারেশানের ছেলে-মেয়েদের জানার কথা না।
ওবা'র কথাই ঠিক- মেয়েটা আসলেই ভাল ড্রাইভ করে। অন্যদিনের তুলনায় রাস্তায় আজকে একটু ভিড় বেশি মনে হচ্ছে। প্রায় সব সিগন্যালেই দাঁড়াতে হচ্ছে। কিন্তু মিসাকি এত স্মুথলি গিয়ার শিফট করছে যে কোন ঝাঁকিই গায়ে লাগছে না। অনেকদিন পর প্যাসেঞ্জার সিটে বসে কাফুকু'র একটু অন্যরকম লাগে। এই সুযোগে চারপাশের শহরের রাস্তায় চোখ বুলিয়ে নিলেন। প্যসেঞ্জার সিটের জানলা থেকে বাইরের জগত একটু হলেও অন্যরকম লাগে। কাফুকু অনেকক্ষণ কথা না বলে থাকতে পারে। স্মল-টকে মোটামুটি আনাড়িই বলা যায়। প্রয়োজন ছাড়া বক-বক করার চেয়ে চুপচাপ থাকতেই বেশি পছন্দ।
সিগন্যালে আটকে পড়লে মিসাকি সিগারেট ধরালো- মার্লবোরো - মনে হচ্ছে তার প্রিয় ব্র্যান্ড। অবশ্য সিগন্যাল ছেড়ে দেয়া মাত্র নিভিয়ে ফেলল। কাফুকু লক্ষ্য করে দেখল- ফেলে দেয়া ফিলটার গুলোতে লিপস্টিকের দাগ নেই। নখে নেইলপলিশ ইউস করে না; মেনিকিউর দূরে থাক। মেয়েটা মনে হয় মেকআপ পচ্ছন্দ করে না।
শপিং শেষ করার পর Arisugawa পার্কের দিকে যেতে যেতে কাফুকু মুখ খুললোঃ যদি কিছু মনে না কর, একটা প্রশ্ন করি?
মিসাকিঃ শিউর, গো এহেড।
কাফুকুঃ তুমি ড্রাইভিং শিখলে কোথায়?
মিসাকিঃ আমার ছোটবেলা কেটেছে পাহাড়ে। Hokkaido তে। বেশ দুর্গম জায়গা বলে পাবলিক ট্রান্সপোর্ট প্রায় ছিল না বললেই চলে। তাই এলাকার সবাই নিজেরা ড্রাইভ করত। আমিও ছোটবেলাতেই গাড়ি চালানো শিখেছি।
কাফুকুঃ কিন্তু একটু আগে তুমি যে শপিং মলে প্যারালাল পার্কিং করলে, ওটা কোথায় শিখলে? পাহাড়ি রাস্তায় নিশ্চয় প্যারালাল পার্কিং করা যেত না?
মিসাকি একমনে গাড়ি চালাচ্ছে। উত্তর দেবার প্রয়োজন বোধ করল না।
কাফুকুঃ ওবা কি তোমাকে কিছু বলেছে - কেন আমার হঠাত ড্রাইভারের দরকার পড়ল?
সামনের ট্র্যাফিকের উপর চোখ রেখে প্রায় মুখস্থের মত মিসাকি উত্তর দিলঃ আপনি একজন মঞ্চ অভিনেতা। সপ্তাহের প্রায় ছয়দিনই শো থাকে। সবসময় নিজেই ড্রাইভ করতেন। ট্যাক্সি বা সাবওয়ে পচ্ছন্দ করেন না। কারণ গাড়িতে যেতে যেতে আপনি স্ক্রিপ্ট রিহার্স করেন। গত সপ্তাহে ড্রাঙ্ক অবস্থায় গাড়ি চালানোর সময় ছোটখাট একটা এক্সিডেন্ট হয়। তাছাড়া চোখেরও কিছু সমস্যা ধরা পড়েছে রিসেন্টলি।
কাফুকু মাথা নেড়ে সায় দিলঃ এলকোহলের মাত্রা অত বেশি ছিল না। তাই কোনমতে ধামাচাপা দেয়া গেছে। কিন্তু অন্যান্য টেস্ট করার সময় ডান চোখের কোনায় একটা ব্লাইন্ড স্পট ধরা পড়েছে। মনে হচ্ছে গ্লুকোমা। তাই থিয়েটার থেকে বলল আর নিজে ড্রাইভ করা যাবে না; এখন থেকে ড্রাইভার রাখতে হবে।
"মি. কাফুকু?" - মিসাকি জিজ্ঞেস করল - "আমি কি আপনাকে এই নামেই ডাকব? নাকি এটা আপনার স্টেজ-নেম?
কাফুকু মৃদু হেসে জানালঃ আমি জানি নামটা একটু অদ্ভুত শোনায়, কিন্তু এটাই আমার আসল নাম। এর কানজি অর্থ হল - "লক্ষ্মীর বর"। যদিও এখন পর্যন্ত নামের কোন সুবিচার পাই নি। আমাদের বংশে কেউ কোনদিন বিশেষ পয়সা-কড়ি করতে পারে নি।
কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর কাফুকু ড্রাইভারের বেতন ইত্যাদি নিয়ে কথা বলল। থিয়েটারে কাজ করে যে টাকা পায়, তাতে এর চেয়ে বেশি বেতন দেয়া ওর পক্ষে সম্ভব না। ওর লাইনে কারুরই নিজেদের ড্রাইভার নেই। নেহাত বিপদে পড়ে রাখতে হচ্ছে।
কাফুকুঃ আমার কাজের কোন ঠিক ঠিকানা নাই। রাত-বিরাতে রিহারসেল, শ্যুটিং, শো। তবে সাধারণত সকালের দিকটাই প্রেসার কম থাকে। তাই তুমি একটু দেরি করেই আসতে পার। আমি চেষ্টা করব রাত এগারোটার আগে তোমাকে ছেড়ে দিতে। এর চেয়ে দেরি হলে আমি ট্যাক্সি নিয়ে নেব। আর সপ্তাহে একদিন মাত্র ছুটি।
মিসাকিঃ আমার কোন সমস্যা নেই।
কাফুকুঃ বুঝতেই পারছ কাজটা অত কঠিন কিছু না। সবচেয়ে কষ্টকর হবে হয়তো গাড়িতে বসে অপেক্ষা করাটা।
মিসাকি চুপচাপ ড্রাইভ করে চলল।
কাফুকুঃ ছাদ নামানো অবস্থায় স্মোক করলে আমার প্রবলেম হবে না। কিন্তু প্লিজ, ছাদ তোলা অবস্থায় কর না।
মিসাকিঃ ওকে।
কাফুকুঃ তোমার দিক থেকে কি কিছু বলার আছে?
মিসাকিঃ আ...নাহ। গাড়িটা আমার পছন্দ হয়েছে।
বাকিটা পথ কেউ আর কোন কথা বলল না। গ্যারেজে ফিরে কাফুকু ওবাকে ডেকে জানাল তার ড্রাইভার পছন্দ হয়েছে।
(৩)
পরের দিন থেকেই মিসাকির নতুন চাকরি শুরু হল- দুপুরের দিকে কাফুকুর Ebisu এপার্টমেন্টের গ্যারেজ থেকে গাড়ি বের করে কাফুকুকে Ginza এর থিয়েটারে নামিয়ে দেয়া, অন্য কোথাও শ্যুটিং থাকলে সেখানে নিয়ে যাওয়া; সপ্তাহে একদিন আবার কাফুকু একটা ইউনিভার্সিটিতে ক্লাস নিতে যান - সেখানে নিয়ে যাওয়া, তারপর দিনশেষে আবার বাসায় পৌঁছে দেয়া।
অধিকাংশ সময় কনভারটিবলের ছাদ নামানোই থাকে। যেতে যেতে ক্যাসেট ছেড়ে দিয়ে কাফুকু নাটকের সংলাপ মুখস্থ করেন। নাটকের নাম - Uncle Vanya। চেখভের নাটক। মূল চরিত্রটা কাফুকু ই করছেন। যদিও সব লাইন তার মুখস্থ, তারপরও শো'র আগে নার্ভাসনেস কাটানোর জন্যে গাড়িতে বসে সংলাপ আওড়ানোটা একটা অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। আর না হলে হাই-ভলিউমে বিটোফেনের স্ট্রিং-কোয়ার্টেট শোনা। এতে নাকি কনসেনট্রেট করতে সুবিধা হয়।
একটু হালকা মেজাজে থাকলে, মাঝে মাঝে পুরনো দিনের আমেরিকান রকও শোনা হয়- Beach Boys, the Rascals, CCR, the Tempteation প্রভৃতি। বোঝাই যায় তরুণ বয়সে ভালোই ফ্যান ছিলেন।
গাড়ি চালানোর সময় মিসাকি পারতপক্ষে কথা বলে না। একটা ভাবলেশহীন মুখ নিয়ে সামনে তাকিয়ে থাকে। এতে অবশ্য কাফুকুর সুবিধাই হয়েছে। আগে অন্য লোকজনের সামনে নাটকের সংলাপ মুখস্ত করতে কিছুটা হলেও অস্বস্তি হত। কিন্তু মিসাকি এতই চুপচাপ থাকে, এখন সেই সংকোচ কেটে গেছে। মাঝে মাঝে মনে হয় সে বুঝি কিছুই শুনছে না। গাড়ি চালাতে চালাতে একটা ঘোরের মধ্যে চলে গেছে। একটু গরম পড়লে মিসাকি হেরিংবোন জ্যাকেট ছেড়ে একটা সামার-জ্যাকেট পড়া শুরু করল। জ্যাকেটটাকে সে এক প্রকার ইউনিফর্ম বানিয়ে ফেলেছে বলা যায়। শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা সমসময় একই পোশাক তার।
নাটকের শো শেষ হলেই মেক-আপ খুলে কাফুকু ফোন করে গাড়ি বের করতে বলেন। অন্যান্য সহ-অভিনেতা, অভিনেত্রীরা নাটক শেষে আড্ডা-টাড্ডা দেয়। কাফুকু এর মধ্যে নাই। ইনফেক্ট প্রফেশনাল সম্পর্কের বাইরে কারুর সাথেই তেমন বন্ধুত্বও হয়নি তার। শো ঠিক সময়ে শেষ হলে, সাধারণত রাত সাড়ে দশটার মধ্যেই বাসায় পৌঁছে যান।
মাঝখানে একটা টিভি-শোতে কাজ করেছিলেন- চরিত্রটা ছিল একজন জ্যোতিষীর। নিজেকে তৈরি করতে কিছুদিন রাস্তায় ছদ্মবেশ নিয়ে লোকজনের হাত দেখে বেরিয়েছেন। এর মধ্যে কয়েকজন পরে এসে হাসিমুখে ধন্যবাদও দিয়ে গেছে, বলেছে - তার ভবিষ্যৎ বানী নাকি সত্যি হয়েছে! রাতে ক্লাস থাকলে অবশ্য ফিরতে একটু দেরি হয়ে যায়। যদিও নতুন জেনারেশনের ছেলেমেয়েদের সাথে সময় কাটাতে তার ভালই লাগে। আর এই সমস্ত পর্যটনে মিসাকি তার নির্বাক সারথি। তিনিও ক্রমে এতটাই অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন যে ইদানীং প্রায় প্যাসেঞ্জার সিটে নাক ডেকে ঘুমিয়েও পড়েন।
যেহেতু এখন আর নিজে ড্রাইভ করেন না, গাড়িতে অধিকাংশ সময় অলস বসে থাকতে হয়। মিসাকিও খুব একটা আলাপে না। বাইয়ে তাকিয়ে থাকতে থাকতে রাজ্যের ভাবনা ভিড় করে মাথায়। সম্প্রতি মৃত স্ত্রীর কথা খুব মনে পড়ে। কাফুকু'র স্ত্রীও সু-অভিনেত্রী ছিলেন। তার চেয়ে দু'বছরের ছোট। অভিনয়ের সূত্রেই তাদের প্রথম আলাপ। সিনেমা পাড়ায় ডাকসাইটে সুন্দরী হিসেবে বেশ সুনাম ছিল। ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে কাফুকু লিড রোলগুলো কখনো পেতেন না। এটা হয়তোবা তার সাদামাটা গড়নের কারণে। তার উপর অল্প বয়সেই মাথায় টাক পড়ে যায়। কিন্তু অধিকাংশ নায়িকা-চরিত্র গুলো তার স্ত্রীর জন্যেই বাঁধা থাকত। স্বভাবতই তার জনপ্রিয়তাও ছিল বেশি। বয়সের সাথে সাথে অবশ্য অভিনেতা হিসেবে কাফুকুর সুনাম বৃদ্ধি পেতে থাকে। অনেক জটিল চরিত্র মঞ্চস্থ করে তার বেশ নাম ডাক হয়। উল্টোদিকে তার স্ত্রী নায়িকা চরিত্র থেকে বাদ পড়ার পর হঠাত করেই যেন জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়ে। কিন্তু নিজেদের ক্যারিয়ারের এই উত্থান-পতন কখনো তাদের দাম্পত্য সম্পর্কে প্রভাব ফেলেনি।
কাফুকু স্ত্রীকে ভীষণ ভালবাসতেন। বলা যায় প্রথম দেখাতেই গভীর প্রেম! তার বয়স তখন ২৯। স্ত্রী মারা যাওয়ার আগ পর্যন্ত (কাফুকুর বয়স তখন ৪৯) এই প্রেমে কোন প্রকার ভাটা পড়ে নি। কুড়ি বছরের বিবাহিত জীবনে অনেকবার সুযোগ থাকা স্বত্বেও কখনোই অন্য নারীতে আসক্ত হন নি। যদিও কাফুকু জানতেন তার স্ত্রী বিভিন্ন সময়ে অন্য পুরুষের সাথে রাত কাটিয়েছেন। তার আন্দাজ অনুযায়ী এরকম হয়তো চারজন পুরুষ ছিলেন। তার স্ত্রী অবশ্য কখনোই তাকে ঘুণাক্ষরে বুঝতে দেননি। কিন্তু কাফুকু'র একটা সিক্সথ সেন্স কাজ করত এইসব ব্যাপারে। স্ত্রীকে এতই ভালবাসতেন যে কথা বলার ধরন, হাসি-ঠাট্টা, ছোটখাট খুনসুটি থেকেই বুঝতে পারতেন তার মনের কথা। সেই চারজনই ছিল বিভিন্ন সিনেমায় তার স্ত্রীর জুনিয়র সহ-অভিনেতা। প্রায় সবকটা সম্পর্কই বড়জোড় মাস খানেক টিকত - হয়তো যতদিন সিনেমার শ্যুটিং চলত ততদিন। তারপর আবার সব ঠিকঠাক আগের মত।
শুরু থেকেই তাদের দাম্পত্য জীবনে প্রেম-ভালবাসার কোন ঘাটতি ছিল না। অবসরে দু'জন মিলে ঘনিষ্ঠ বন্ধুর মত চুটিয়ে আড্ডা দিয়েছেন- হেন কোন বিষয় নেই যা নিয়ে তাদের আলাপ হত না। শরীর, মন- সব বিচারেই তারা পরিপূর্ণ সুখী ছিলেন। পরিচিত মহলে সবাই তাদের পারফেক্ট কাপল হিসেবেই জানত। তাই কাফুকু কখনোই ঠিক বুঝে উঠতে পারেন নি - তার স্ত্রী কেন অন্য পুরুষের সাথে রাত কাটানোর প্রয়োজন বোধ করেছিলেন।
"তুমি ওদের মধ্যে কী খুঁজতে গিয়েছিলে যা আমার মধ্যে নেই?" - এই প্রশ্ন অনেকবার জিজ্ঞেস করব করব করেও আর করা হয়ে ওঠেনি। এ নিয়ে অনুশোচনাও করেছেন পরে। স্ত্রী তখন প্রায় মৃত্যু শয্যায়। জরায়ুর ক্যান্সার ধরা পড়েছে প্রায় লাস্ট স্টেজে। মৃত্যুপথ যাত্রী প্রিয় মানুষকে এই প্রশ্ন করে আর বিব্রত করতে চান নি।
কিন্তু, বিভিন্ন সময়ে চোখ বন্ধ করতেই যখন তার স্ত্রীর মুখ ভেসে উঠত সামনে, সাথে আলিঙ্গনরত সেইসব পুরুষ - তখন ভীষণ কষ্ট হত। নিজেকে বোঝানোর মত কোন অজুহাতই খুঁজে পেতেন না। যতই চাইতেন ভুলে যেতে, ততই সেইসব দৃশ্য বার বার দুঃস্বপ্নের মত ফিরে ফিরে আসত। মাঝে মাঝে মনে হত না জানলেই বোধহয় ভাল হত। জানার মধ্যেই বুঝি সব বেদনার ভার লুকিয়ে আছে।
সবচে' অস্বস্তিকর ছিল সব জেনে-শুনেও না জানার ভান করাটা। কাফুকু যতই দক্ষ অভিনেতা হন না কেন, নিজের বাসায় প্রিয় মানুষের সাথে এই অভিনয় নিদারুণ পীড়াদায়ক ছিল। হৃদয়ের ক্ষত লুকিয়ে রেখে দিনের পর দিন সংসারের দ্বায়িত্ব পালন করে গেছেন, হাসি ঠাট্টা করেছেন, চুমু খেয়েছেন, আদর করেছেন। কখনোই স্ত্রীর মনে সন্দেহ দানা বাঁধতে দেন নি।
স্ত্রী মারা যাবার পর বিভিন্ন সময়ে, বেশ ক'জন মহিলার সাথে তার ঘনিষ্ঠতা হয়েছে; কারো কারো সাথে রাতও কাটিয়েছেন। কিন্তু কখনোই সেই আগের মত শরীর ও মনের চিরতৃপ্তি খুঁজে পান নি। (চলবে)
৩১/১০/২০১৭
--
দোহাইঃ
টেড গুসেন যিনি জাপানিজ থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন