আবার দেখা যদি হল সখা, প্রাণের মাঝে আয়



"হই-চই টিভি"-র সুবাদে Hello দেখা হল। আসলে দেখতে বসেছিলাম দুপুর ঠাকুরপো। কিন্তু এমন বাজে স্ক্রিপ্ট যে তিন-চার এপিসোডের পরেই আগ্রহ হারালাম। বাজেটের বড় অংশ মনে হয় স্বস্তিকা মুখার্জীর জন্যে বরাদ্দ ছিল। তাই মাঝারি মানের স্ক্রিপ্ট রাইটার দিয়ে কোন মতে কাজ চালাতে হয়েছে। 

Hello এর স্ক্রিপ্ট যে খুব আহামরি তা বলবো না। কিন্তু গল্পটা বেশ জমিয়েছে বলতে হবে। বিশেষ করে বাংলা ভাষায় এমন সাহসী লেসবিয়ান প্রেমের গল্প আগে কখনো দেখিনি। শেষ্ঠাংশে- রাইমা সেন এবং প্রিয়াঙ্কা সরকার। 

শুরুটা অবশ্য আর দশটা কলকাতার ছবির মতই। ইনফ্যাক্ট কলকাতার একটা গৎবাঁধা গল্প দাঁড় করাতে যা যা লাগে তার সবটাই এতে আছে- দুর্গা পূজা, বনেদি হিন্দু বাড়ি, পূজার ছুটিতে সবার বেড়াতে আসা, ঢাকের আওয়াজ, ষষ্ঠী পূজা, উৎসব, সিঁড়ি ঘরে চুমু খাওয়া, বৌদি-ননদ খুনসুটি,  খিটখিটে মেজাজের শাশুড়ি, ছোটদের বায়না, বউদের সিঁদুর খেলা এবং অতি অবশ্যই পরকীয়া প্রেম। একটা সময় কলকাতায় আর্ট ফিল্মের নাম করে শুধু পরকীয়া গল্পের নাটক/সিনেমা বানানো হত। এমনকি সত্যজিত রায়ও বুড়ো বয়সে এই পথে হেঁটেছেন। তারপর ঋতুপর্ণ ঘোষ তো আছেনই। না, আমি বলছি না- পরকীয়া গল্প খারাপ। কিন্তু সব ছবি একই ধরনের হয়ে গেলে কিছুটা হলেও বিরক্তি আসে। তার উপর বিষয়টা ট্যাবু বলে সাধারন দর্শকের বাড়তি এটেনশন পাওয়া যায়। বিনা খরচায় ভালো মার্কেটিং, পাবলিসিটি হয়ে যায়। যেমন- YouTube এ সত্যজিৎ রায়ের এত ভালো ভালো ছবি থাকার পরেও, পিকুর ভিউ সবথেকে বেশি।  

তো শুরুর কয়েক এপিসোড দেখে ভাবলাম সেরকম কিছু একটাই হতে চলেছে- ইয়েট এনাদার পরকীয়া লাভ স্টোরি। কিন্তু কিছুদূর এগোতেই যখন গল্পটা আন্দাজ করতে পারলাম তখন নড়ে চড়ে বসতে হল। পরিচালকের অবশ্য কিছুটা 'শ্রীজিত সিন্ড্রোম' আছে- সবকিছুর মধ্যে সাসপেন্স ঢুকিয়ে দেয়ার ব্যারাম। সাদামাটা প্রেমের গল্প বলবে; তার মধ্যেও অযথা টুইস্ট, সাসপেন্স- যেন গোয়েন্দা গল্প! সাধারনত গল্প বলায় কনফিডেন্সের অভাব হলে, ডিরেক্টর এসব সস্তা ছল-চাতুরীর আশ্রয় নেয়, যাতে শেষ দৃশ্য পর্যন্ত দর্শককে আটকে রাখা যায়।  

Hello এর গল্প নন্দিতাকে (রাইমা সেন) নিয়ে। নন্দিতা বনেদি চৌধুরী বাড়ির বড় বউ। স্বামী, এক ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে তার সুখের সংসার। বড় বউ বলে পুরো সংসারের দায়িত্ব তার কাঁধে। পূজার সময় হওয়ায় ব্যস্ততা যেন আরো বেশি। আমেরিকা থেকে দেবর, জা ও তাদের বাচ্চাকাচ্চা এসেছে। ননদ ও তার স্বামী এসেছে। বাড়ি ভর্তি আত্মীয় স্বজন ও নানান লোকজন। একদিকে পূজার আয়োজন, রান্না বান্না আরেক দিকে মেহমানদারি, - সব মিলিয়ে হিমশিম খাবার অবস্থা। এদিকে ষষ্ঠীর দিনেও স্বামীর দেখা নেই। অফিসের কাজের চাপে তিনি কয়েকরাত বাড়ি ফিরেন নি।  

মূল ঘটনার সূত্রপাত হল যখন অপরিচিত নাম্বার থেকে নন্দিতার মোবাইলে একটা ভিডিও মেসেজ আসে। ভিডিওতে দেখা যায় তার স্বামী একজন সুন্দরী যুবতীর সঙ্গে বিছানায় প্রেম করছেন। নন্দিতা যথারীতি শকড হলো- যেন নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছে না। পূজার ভিড় বাট্টার মধ্যে কাউকে কিছু বলতেও পারছে না। স্বামী বাড়ী ফেরার পর তাকে জিজ্ঞেস করা হল। পিঠে লিপস্টিকের দাগ দেখে নিশ্চিত হল যে ভিডিওর কোন কিছুই এক বর্ণ মিথ্যে নয়। বাড়ি ভর্তি লোকজন থাকায় নিচু স্বরে কথা কাটাকাটি হল। কিন্তু মেসেজটি কে পাঠাল এ ব্যাপারে ধোঁয়াশা থেকেই গেল।


নন্দিতা নিরুপায় হয়ে তার জা'কে সব খুলে বললো। মোবাইল কোম্পানিতে চাকুরীরত জা'র এক বন্ধুর সাহায্যে জানা গেল সেই নাম্বারের হদিস। ভদ্রলোকের নাম- দেবল সোম। কিন্তু তিনি কিভাবে এই অন্তরঙ্গ মুহূর্ত ভিডিও করলেন, কেনই বা তাকে পাঠালেন তার কিছুই জানা গেল না। এদিকে স্বামী আর কোন অজুহাত না পেয়ে নন্দিতাকে দোষারোপ করলেন যে নন্দিতা তার পিছনে স্বপ্রনোদিত হয়ে গোয়েন্দা লাগিয়েছে। এবং সেই লোকই দেবল সোম যার সাথে নন্দিতার বিয়ের আগে থেকে জানা শোনা ছিল। 

পূজার ঢামাডোলের মধ্যেও এই অশান্তি আর চাপা থাকলো না। আস্তে আস্তে সবার পাঁচকান হলো। ননদ, শাশুড়ি, দেবর কারুরই অগোচর রইলো না যে বাড়ির গৃহকর্তী ও কর্তার মধ্যে মনোমালিন্য চলছে। শাশুড়ি ভীষণ অসন্তুষ্ট।বড় ছেলে মিথ্যে অজুহাত দেখিয়ে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে গেল। গিয়ে উঠলো তার প্রেমিকার বাসায়। প্রেমিকার নাম - নীনা (প্রিয়াঙ্কা সরকার)। 

ইতিমধ্যে নন্দিতার মোবাইলে আরো ভিডিও আসতে থাকে। কিছু ভিডিও দেখে মনে হয় যেন সেখানে কোন মেসেজ আছে। নীনার পিঠে ট্যাটু, কুশন কাভারের এম্ব্রয়ডারি ইত্যাদি দেখে মনে হয় যেন কিছু একটা বলতে চাইছে সে এই ভিডিওর মাধ্যমে। এ পর্যায়ে মনে হতে থাকে নীনার সাথে বুঝি নন্দিতার কোন পূর্ব শত্রুতা ছিল এবং সে এটার প্রতিশোধ নিচ্ছে। নীনার বিভিন্ন আলাপ চারিতায় নন্দিতার প্রসঙ্গ আসে। নন্দিতার রূপে গুনে সে একপ্রকার মুগ্ধ। তবু সে চায় নন্দিতার স্বামী যেন তাকে ডিভোর্স দেয়। 

দশমীর দিন আবার টেক্সট আসে নন্দিতার মোবাইলে। এবার প্রেরক তার সাথে দেখা করতে চায়- শহরের এক পরিচিত পাবে (Pub)। দেবী বিসর্জনের সময় সবাই যখন প্রতিমা নিয়ে মিছিল করে বাড়ি থেকে বেরোচ্ছে তখন পিরিয়ড আর পেট ব্যাথার অজুহাত দেখিয়ে নন্দিতা সটকে পড়ে। লোকজন ভর্তি পাবে গিয়ে দেখে শাখা সিঁদুর আর লাল পাড়ের সাদা শাড়ী পড়ে ভিডিওর সেই মেয়েটি পটের রানী সেজে বসে আছে। 

পরবর্তিতে সংসারের অশান্তি আরো চরমে উঠলে, নন্দিতা বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে বাধ্য হয়। তার স্বামীও তাকে মৌখিকভাবে ডিভোর্সের কথা জানিয়ে দেয়। অসহায়ের মত দিগ্বিদিক জ্ঞান শূন্য হয়ে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় অন্যদিক থেকে আসা একটা গাড়ি তাকে ধাক্কা দেয়। এমন সময় ঘটনাস্থলে ত্রাণকর্তা রূপে আবির্ভূত হয় নীনা। নন্দিতাকে কোলে তুলে নিজের বাসায় নিয়ে এসে সেবা শুশ্রূষা করে। 

নন্দিতার জ্ঞান ফিরে এলে, নীনা নিজের পরিচয় দেয়। সে আসলে নন্দিতার স্কুলের বেস্ট ফ্রেন্ড দেবলীনা। বাবার ট্রান্সফারের কারণে দুজনের ছাড়াছাড়ি হয়ে গিয়েছিল। তাই অনেকদিন যোগাযোগ ছিল না। কিন্তু দেবলীনা নন্দিতাকে ভুলতে পারে নি; তাই ছোটবেলায় দেয়া কথা রাখতে সে আবার ফিরে এসেছে। নন্দিতার স্বামীর সাথে মিথ্যে প্রেমের অভিনয় করে তাকে বাড়ি থেকে মুক্ত করে এনেছে। অতঃপর মধুরেণ সমাপয়েৎ এবং নেপথ্যে রবীন্দ্রনাথের গানঃ 

'মোরা ভোরের বেলা ফুল তুলেছি, দুলেছি দোলায়
বাজিয়ে বাঁশি গান গেয়েছি বকুলের তলায়।
হায় মাঝে হল ছাড়াছাড়ি, গেলেম কে কোথায়
আবার দেখা যদি হল, সখা, প্রাণের মাঝে আয়।' 



অফটপিকঃ 
রবীন্দ্রনাথ যেন কিভাবে কিভাবে সব কিছুতেই খাপ খাইয়ে যায়। এই যেমন শেষের দিকে এই গানটা শোনার সময় কেবল মনে হতে থাকে এর চেয়ে সুন্দর লেসবিয়ান প্রেমের গান আরেকটি হতে পারে না!

-- 

      
   

1 টি মন্তব্য:

Hasib Ibne Rafique বলেছেন...

চমৎকার উদ্দীপক রিভিউ। একবার চেখে দেখে যেতে সাধ হচ্ছে। শেষের গানটি আবার একটু পড়ে মনে হলো রবীন্দ্রনাথ হয়তো সবার জন্যেই উদাত্ত আহবান জানিয়ে রেখেছেন। সখা কে পুরুষ পদবাচ্য জ্ঞান করে মনে হলো। যদিও ভোরের বেলা ফুল তুলতে কয়জন বঙ্গপুঙ্গবের দেখা পাওয়া যাবে সেটি একটি পালটা যুক্তির জায়গা হতে পারে।