জন পেট্রিক শেনলির চলচ্চিত্র "দ্য ডাউট" এবং মেরিলের ঝুলিতে প্রায় তৃতীয়-অস্কার

কি ভেবে আজকে হিসেব কষে দেখলাম, ইহ-জীবনের একটা বৃহৎ অংশ জুড়ে আমি একটা ১৫ ইঞ্চি এলজি মনিটরের দিকে তাকিয়ে থেকেছি।
ভাবতেই কেমন এক বিষন্নতা গ্রাস করলো।আহা! পরিবর্তে কোন রূপসীর পানে এতো দীর্ঘ সময় নিবিষ্ট হলে হয়তো এই ভয়াবহ প্রতিযোগিতামূলক জগৎসংসারে এতো দিনে আমার একটা গতি(কিংবা দুর্গতি) হয়ে যেতো।ফিবছর ভবসংসারের নানাবিধ টানাপোড়েনে পেন্ডুলামের মতো ঝুলে থাকতুম না মোটেও। তো এই হতচ্ছাড়া ক্লীব পদার্থের সান্নিধ্যে আমার প্রিয়তম মূহুর্তগুলো কেটেছে কোন না কোন মুভি দেখে, বিটিভির ভাষায় যাকে বলে পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র।প্রথমেই আমি বলে নিচ্ছি পাঠক আমি আসলে একজন দ্বিতীয় শ্রেনীর সিনেমা দর্শক,যে কিনা এখনো প্রাণপনে প্রথম শ্রেনীতে উঠার চেষ্টা করে যাচ্ছে এবং বার বার ব্যর্থ হচ্ছে তার সাবকন্টিনেন্টাল ইমোশনের কারনে যা হয়তো পুরোটাই জেনেটিক বিদ্যার আশীর্বাদ।দ্বিতীয় শ্রেনীর দর্শক আমি তাদেরকে বলি যারা এখনো প্রিয় অভিনেতা-অভিনেত্রীর লিস্ট ধরে ছবি দেখেন এবং হরহামেশাই ভুলে থাকেন যে ছবিতে "ডিরেক্টর" বা "পরিচালক" বলে একটা মানুষ থাকে।পুরো ছবি জুড়ে যার আসা যাওয়া, পুরো রিল জুড়ে যে পুরোধার কষ্টের ঘাম লেগে থাকে।আমি নিজেও হরহর করে শ খানেক অভিনেতা অভিনেত্রীর নাম বলে দিতে পারি,কিন্তু ডিরেক্টরের বেলায় বারবার হাতের
কর গুনি।সাবকন্টিনেন্টাল ইমোশন হলো আমাদের এই এলাকার জনগোষ্ঠির একটা সানক্তকারী বৈশিষ্ট্য যার কারনে আমরা পর্দার মানুষগুলোকে খুব আপনার লোকজন বলে ভাবতে শুরু করি সে খেলোয়াড়ই হোক কিংবা অভিনেতা-অভিনেত্রীই হোক।পর্দায় ভালো লাগছে ব্যস!যথেষ্ট।তো আমিও নিজেকে এই দোষে দুষ্ট বলে মনে করি এবং প্রায় ঘুম থেকে চোখ মেলে দেখি কেট উইন্সলেট মাথায় ঘোমটা দিয়ে হাসি হাসি মুখ করে আমার সামনে চা হাতে দাঁড়িয়ে আছে।কিংবা আমার সারা ঘরময় গুন গুন করে রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইছে এলিসিয়া সিলভারস্টোন------"আমার মল্লিকা বনে যখন প্রথম ধরেছে কলি আমার মল্লিকা বনে......."ঠোঁটে লেগে থাকে সেই খুনী হাসি!!অথবা অদ্রে তুঁত আপাত দুর্বোধ্য ভাষায় আমার চুলে বিলি কেটে দিচ্ছে,হয়তো বলছে "কি দাড়ি কাটো না কেনো?"


যে ছবি নিয়ে লিখতে বসা তার নাম "দ্য ডাউট"।পাঁচটি বিভিন্ন নমিনেশন আছে এ ছবির নামে এবারের অস্কারে।এটা অবশ্য কোন কাজের কথা না কারন আমি রেফারেন্স ধরে ছবি দেখি না কখনোই।তার উপর এসব পুরস্কারদাতা এবং গ্রহীতাদেরকে প্রায় আমি বাঁকা চোখে দেখি,যেমন এবারো দেখবো চোখের সামনে দিয়ে "স্লামডগ মিলিনিয়ার" ঝুলি ভরে একগাদা অস্কার নিয়ে যাবার পর।কিংবা সেভেন পাউন্ডসের মতো ছবি যেখানে কোন নমিনেশনই পায়না।

"দ্য ডাউট" দেখতে বসা সুন্দর নাকের মানুষ মেরিল স্ট্রিপের খাতিরে যার অভিনয় দেখে প্রথম যৌবনেই মনে হয়েছিলো "কেনো আরো আগে পৃথিবীতে আসলাম না?" কিংবা "আমি যদি বেনজামিন বাটনের মতো সুদীপজামিন বাটন হতাম"।
"জন পেট্রিক শেনলি" এই নামটা আমার পিতৃদেব যেমন কোনদিন শোনেন নাই তেমনি ছবি দেখার আগে আমিও কোনদিন শুনি নাই।অথচ কি ভয়াবহ সুন্দর একটা ছবি উপহার দিলেন!গভীরতম অনুভূতি নিয়ে কি চুলচেরা চলচ্চিত্র!মূল উপন্যাসটা আমার পড়া নাই তারপরেও এরকম মাস্টারপিসের জন্য একটা জোরদার হাততালি পেতেই পারেন।আশাকরি অস্কার কমিটি তাকে নিরাশ করবে না।যদিও এ অভিজ্ঞতা তার নতুন নয়।

আফসোস লাগছে অপরাহ উইনফ্রের জন্য যিনি অনেক চেষ্টা তদবির করেও শেনলির মন গলাতে পারেন নি।মিসেস মিলার সত্যিকার অর্থেই তার জন্য লোভনীয় চরিত্র ছিলো।শেনলি নাকি তাকে স্ক্রিপ্টই পড়তে দেন নি।বেচারি উইনফ্রে!ভাইওলা ডেভিস অবশ্য মাত্র দুই দৃশ্যে অভিনয় করেই মাতিয়ে দিয়েছেন।বোঝেন তাইলে রোলটা কি ছিলো?

"ভেবে ভেবে কুল পেলাম না" অবস্হা হয়েছে নাটালি পোর্টম্যানের কথা চিন্তা করে ,কেন তিনি সিস্টার জেমস হতে রাজি হলেন না?যেখানে অ্যামি এডামস এইবেলা একটা নমিনেশনও জুটিয়ে ফেললেন।

হফমেনের ব্যাপারে আমার একটু এলার্জি আছে আগে থেকেই যেটা এই ছবির পরেও রয়ে গেছে।

আর অনবদ্য মেরিল স্ট্রিপ!বয়সের সাথে পাল্লা দিয়ে অভিনয় করছেন।"বৃদ্ধ বয়সে সৌন্দর্য্যে ভাটা পড়ে"----যতসব গাঁজাখুরি গপ্পো!!পুরো ছবিতে তার ব্যক্তিত্ব যেন ধারালো ছুরির মতো এফোঁড় ওফোঁড় করে দর্শক হৃদয়।শেষ দৃশ্যে তার অসহায় স্বীকারোক্তি----দাগ কেটে থাকবে বহুদিন।

আমি যদি অস্কার কমিটিতে থাকতাম এইবার (কী ছাইপাশ খেয়েছিস বল!!) এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতাম নির্ঘাত।আমার দুইজন প্রিয় মানুষ একই ক্যাটাগরিতে বেস্ট একট্রেস নমিনি।দ্বিতীয় শ্রেনীর দর্শক হিসেবে এক সাংঘাতিক কঠিন কাজ বটে!যদিও রিডারে কেটের পুরনো বদঅভ্যেস বশত: অবলীলায় বস্ত্রবিসর্জন আমাকে বরাবরের মতো বিব্রত করেছে।তদুপরি মন-খারাপ হই পরপর দুটো ছবিতে এমনতর স্যুসাইড দেখবার পর।কিন্তু অভিনয়ে আবারও ঘোর লাগে।আবারও মোহে পড়ি খুব সানন্দ্যে!

কোন মন্তব্য নেই: