মাঠের এক কোনায় দেখি একটা প্রকান্ড আম গাছ কয়েকটা বিল্ডিং এর দোতলা,তিনতলা আর খানিকটা আকাশ আড়াল করে দাঁড়িয়ে আছে।পাশ ঘেঁষে যে আস্তরহীন দেয়ালটা চলে গেছে তার কিয়দংশ এই মহীরুহের প্রতাপে যেন আরো জরাজীর্ণ হয়ে উঠেছে।এমনিতেই সারা গায়ে তার কানা ঘুপচির ঘাটতি নেই,তার উপর প্রতিবেশীর শিকড়ের ক্যাপিটালিস্ট মনোভাবের কারনে বেচারা বড় ভগ্ন হৃদয়।এই দেয়ালের সমান্তরালে অনেক গুলো মাঝারী থেকে ছোট হাইটের ফুল গাছ,তার মধ্যে একটা বোধ হয় রক্তজবা,সনাক্তকারী চিহ্ন হিসেবে কয়েকটা ঢাউস সাইজের লাল রঙা ফুল দেখে বিজ্ঞের মত সিদ্ধান্ত নিলাম।এতো বড় জবা ফুল আমি দেখিনি আগে।বাকি গুলোর ব্যাপারে খুব একটা নিশ্চিত হওয়া গেলো না।তাছাড়া বেশ কিছু পাতাবাহারী মনে হলো।খুব সুন্দর পাতা ওয়ালা গাছে নাকি কখনো ফুল হয় না।অথচ এই পড়ন্ত বিকেলের আবছায়ায় ঐ গাছগুলোকে কি ফুলেল দেখাচ্ছে!প্রতিটা পাতাই যেন একেকটা ফুল।ফুলবাহারী সব গাছের আলাদা ডাক নাম থাকে কিন্তু এই সুন্দর পাতার গাছগুলোর নিজেদের কোন নাম নেই।সবারই একই পদবী-পাতাবাহারী।ফুলঘটিত এই বায়াসড নামকরন প্রথা মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে বেশ।অন্তত: কিছু গাছের পাতার নামে নাম দেয়া উচিত ছিলো। তো এই ফুল আর পাতা নিয়েই একটা ছোটখাটো লম্বা বাগানের মতো।চারপাশে ইট জড়ো করে তার সীমানা নির্ধারন করে দেয়া হয়েছে।ধারনা করা যায় খানিকটা-আকাশ-আড়াল- করা প্রকান্ড আম গাছটাও কোন এক কালে এই বাগানেরই বাসিন্দা ছিলো।যদিও সীমানালঙ্ঘী স্পর্ধায় এখন সে নিজেই একটা গ্লোবালাইজেশনের মডেল হয়ে উঠেছে।
সীমানার এপারে এক চিলতে মাঠ।কোথাও ঘাসের চিহ্ন মাত্র নেই,শুধু ধূলো আর বালি।বালিতে অনেক আসা যাওয়ার ছাপ।একটু আগেও যেন ধূলো উড়ানো খুব ব্যস্ত সময় গেছে তার।তবুও ঐ বেড়ার ঘরগুলো আর খানিকটা-আকাশ-আড়াল-করা আম গাছটার শেষ বিকেলের ছায়ায় মাঠটাকে কেমন যেন বিষন্ন মনে হচ্ছিল।ফ্রকে মুখ গোঁজা "মন ভালো নেই" কিশোরীর মতো একরাশ ধূলো-মলিন বিষন্নতা!
দূরে তাকিয়ে দেখি বিপুল সংখ্যক কাক বাসা বেঁধেছে গাছটাতে।ওদের বিস্তর ডাকাডাকিতে আর সশব্দ পয়: নিষ্কাশনে মাঠের বিষন্ন নীরবতা ভেঙ্গে খান খান হচ্ছে।বেড়া দেওয়া ঘরগুলোর টিনের চালে থেমে থেমে শুকনো ডাল পালা আর কচি আম পড়ার শব্দ শুনছি।টিনের চালের নিচে যারা বসে ছবি আঁকছে ওরাও নিশ্চয়ই খুব বিরক্ত হচ্ছে।নামেই শুধু আম গাছ,কাজেকর্মে তো দেখি আস্ত একটা কাকগাছ!
আজ বহুদিনপর আমার আর্টের স্কুলের একটা বিকেলকে ধরতে গিয়ে এমনি কিছু বিচ্ছিন্ন পুলক জাগছে মনে।সেদিন অবশ্য এই অলস বালকের কোন ভাবেই পুলকিত হবার অবকাশ ছিলো না।বরং সেচ্ছাচারী শুক্রবারের বিকেলগুলোকে এভাবে অফিসিয়ালি মৃত ঘোষনা করার মৌন প্রতিবাদ হিসেবে হাঁড়ি মুখ করে বসেছিলাম দারোয়ানের বেঞ্চিতে।এই শেষকৃত্য অনুষ্ঠানের মূল পুরোহিত যিনি,আমার মা এই হাঁড়ি ভর্তি তীব্র প্রতিবাদকে দিব্যি রসমলাই বানিয়ে দিয়ে হাসিমুখে এক আন্টির সাথে খোশ গল্পে মেতে উঠেছিলেন।খানিক বাদে ঐ আন্টিও দেখি আমার দিকে তাকিয়ে রহস্যময় হাসি দিলেন।বলাবাহুল্য সেই হাসিতে আমি কোন স্বপক্ষ সমর্থন খুঁজে পাইনি,পেয়েছি "কাঁদে না খোকা সব ঠিক হয়ে যাবে" টাইপের সমবেদনা।
আমি যেখানটাই বসে ছিলাম তার বাঁ পাশেই খুব নিচু একটা গেইট।বড়রা সবাই অসহায়ের মত মাথা নিচু করে ঢুকছে কিংবা বেরুচ্ছে।হয়তো ছোটদের স্কুল বলে এই বিশেষ ব্যবস্হা।বড়দের স্কুলে যেমন বড় বড় গেইট, ছোটদের স্কুলে তেমন ছোট ছোট গেইট।পাশে বসা দাড়িঅলা বৃদ্ধ লোকটা কয়েকবার আমার সাথে খাতির জমানোর চেষ্টা করে এখন চুপ মেরে গেছে।কী বাবু?তোমার নাম কি?কোন কেলাসে পড়ো?
এই সব হাবিজাবি সবাই যা বলে আর কি!এমনতেই একটা প্রতিকী অনশনের মত চলছে।এর মধ্যে উটকো ঝামেলা!তাই আমি না শোনার ভান করে খানিকটা-আকাশ- আড়াল-করা আম গাছটার দিকে তাকিয়ে থাকলাম।বেশির ভাগ লোকজনই দেখি আমার নাম আগে থেকে বলে দেয়।যেমন এই দাড়িঅলা কি সুন্দর আমার নাম ধরে ডাকছে-বাবু। জানোই যদি আমার নাম "বাবু",তাহলে আবার জিজ্ঞেস করার মানে কি?লোকটা একটা পাতা কুড়িয়ে আমার সামনে ধরে বলল,
--"কন তো দেহি এইডার রঙ এমন হলুদ হইছে ক্যা?আগে তো সবুজ আছিলো? নাকি?"
--"বুড়ো হয়ে গেছে তো ,তাই হলুদ হয়ে মরে গেছে"
দাড়ির ফাঁকে মৃদু হেসে,
--"আমি তো বুড়া।আমার রঙ হলুদ হয় না ক্যা?"
--"আপনি তো পাতা না।তাছাড়া মরে গেলে আপনিও হয়তো হলুদ হয়ে যাবেন"
লোকটা দেখি এবার শব্দ করে হেসে উঠলো।দাড়ির ফাঁকে পান খাওয়া দাঁত দেখা যাচ্ছে।আমার দিদার দাঁতগুলোও এরকম দেখতে।লোকটার তারপরও শব্দ করে হাসতে থাকে।তার চোখের কোনে বিন্দু বিন্দু পানি জমছে।এ হাসি কান্নার মানে কি?
সশব্দ হাসির লোকগুলোকে আমার বিশেষ পচ্ছন্দ না।এ ব্যাপারে আমার কিছু ভয়ংকর অভিজ্ঞতাও আছে।আমি তাই একটা উঠি উঠি ভাব নিতে যাচ্ছি,এমন সময় দেখি মা বেরিয়ে আসলেন ভিতর থেকে,হাতে একটা খাতা আর রঙের বাক্স।পরে জেনেছি এ লাইনে এটাকে পেস্টেল কালার বলা হয়।তো বিবিধ উপায়ে এই রঙের বক্সের প্রতি আমার আগ্রহ তৈরী করার একটা সাময়িক এবং স্হানীয় প্রচেষ্টা চলল কিছুক্ষণ,এই প্রচেষ্টায় কিছু আগে চোখে পানি জমা হওয়া বৃদ্ধ এবং রহস্যময়ী হাসি-আন্টিও হেসে যোগ দিলেন।তাদের তীব্র চাপের মুখে আমি হাঁড়ি মুখ নিয়েই একটা ক্লাসরুমে প্রবেশ করলাম।এই ক্লাসের নাম নাকি "হাসিখুশি"।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন