আসগর ফরহাদি’র যত সিনেমা
আসগার ফরহাদি তৃতীয় প্রজন্মের ইরানি পরিচালকদের মধ্যে একজন যারা মেইন স্ট্রিম সিনেমা থেকে বের হয়ে অভিনব-নতুন ধারার সূত্রপাত করেছিলেন; প্রায় চল্লিশ বছরেরও অধিক সময় ধরে যে ধারাটি সমৃদ্ধ থেকে সমৃদ্ধতর হয়েছে এবং উৎকর্ষতার গুনে ইউরোপিয়ান সিনেমাকেও প্রভাবিত করেছে। অথচ, পৃথিবীর সবচে’ বড় কলেবরের (যশ ও প্রতিপত্তি অর্থে) পুরস্কারটি তাদের ঘরে উঠে মাত্র ক’দিন আগে। আসগার ফরহাদি’র A Separation ২০১২ সালের অস্কারে প্রথম বারের মত ইরানি সিনেমা হিসেবে সেরা ভিনদেশির স্বীকৃতি পায়। আজকের লেখাটা এই আসগার ফরহাদি’র সিনেমা নিয়ে।
একটা সময়ে আমার ধারনা ছিলো (এখনও যে নাই তা বলবো না) – ইরানি রেভোলিউসন পরবর্তী সময়ে, মানে ১৯৮০’র দশক থেকে ইরানে যে এন্টি-আমেরিকান মনোভাব এবং কট্টর সেন্সরসিপ চালু হয়, ইরানি সিনেমার উপর তার একটা পজিটিভ ইমপ্যাক্ট আছে। হ্যাঁ, যে কোন ধরনের সেন্সরসিপ কিংবা নিষেধাজ্ঞা সিনেমার’র জন্যে খারাপ – এ ব্যাপারে কোন দ্বিমত নেই। কিন্তু, এই নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়ে ইরানি সিনেমায় একটা অদ্ভুত স্বাতন্ত্র্য তৈরী হয়েছে বলে আমি মনে করি। আর কিছু না পেয়ে তারা তখন স্কুল বালকের জুতো নিয়ে সিনেমা বানানো শুরু করে। অত্যন্ত ছোটখাট বিষয় যেগুলো হয়তো আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের একান্ত অনুষঙ্গ সেগুলোকে তারা নতুন ভাবে আবিস্কার করে এবং সিনেমার দর্শককে নিবিড় ভাবিয়ে তোলে। আমার ধারনা- অবাধ আকাশ সংস্কৃতির উপর খোমেনি’র টেনে দেয়া সামিয়ানা ইরানি পরিচালকদের এত গভীরে ভাবতে বাধ্য করেছে, যার ফলশ্রুতিতে আমরা-আমদর্শক পেয়েছি অনন্য কিছু সিনেমা যেগুলো পৃথিবীর আর কোথাও তৈরী হওয়া অসম্ভব ছিলো। এই বিষয়টা অবশ্য নিশ্চিতভাবে আরো পড়ালেখার দাবী রাখে।
দিনের শেষে একজন দর্শক হিসেবে আমার কাছে বৈচিত্র্যটা খুব জরুরী। আমি চাই – বাংলা সিনেমা, বাংলা সিনেমা’র মত থাকুক; হিন্দী সিনেমা হিন্দী সিনেমার মত থাকুক, মেক্সিকান সিনেমা মেক্সিকান সিনেমার মত থাকুক। তথ্য প্রযুক্তির অবাধ জোয়ারের কারনে এরা যেন মিলে মিশে না যায়; বৈচিত্র্য না হারায়। এখনো দেখা যায়- ইরানি সিনেমার অভিনেত্রীরা সিনেমায় ঘুমানোর দৃশ্যেও মাথায় কাপড় পেঁচিয়ে রাখেন। ক’দিন আগেও কিয়ারোস্তামি’র ছবিতে জুলিয়েট বিনোশের সামান্য চুম্বন দৃশ্য বিপুল সমালোচনার ঝড় তোলে। সাম্প্রতিককালে, জাফর পানহি’র This is not a Film দেখে অবশ্য মনে হয়েছে তাদের দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। তারা এখান থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছেন। সৃষ্টিশীল মানুষদের চিন্তার শেকল পড়ানোর বিরোধিতা করি। কিন্তু, একই সাথে, আমার খুব একটা ভালো লাগবে না যদি দেখি আজ থেকে দশ বছর পর, ইরানি সিনেমাতে অবাধ যৌনতা ঢুকে গেছে; হলিউডি কিংবা বলিউডি আগ্রাসনে পড়ে তার স্বাতন্ত্র্য হারাতে বসেছে।
যাই হোক, কথা হচ্ছিলো আসগার ফরহাদি’র সিনেমা নিয়ে। Fireworks Wednesday, About Elly এবং A Separation – এই তিনটি সিনেমা ২০০৬ থেকে ২০১১ এর মধ্যে বানানো। সব পরিচালকের নিজস্ব একটা স্টাইল থাকে, সিগনেচার থাকে। সেটা হিচকক-ই হোক কিংবা অনন্ত জলিল-ই হোক। এটলিস্ট, দুটো সিনেমা দেখলেই একটা আন্দাজ করা যায়। স্পিলবার্গ অবশ্য দাবী করেছেন – তার কোন স্টাইল নেই। জানি না এটা কিভাবে সম্ভব? ঋতু’দা হয়তো এব্যাপারে একটু আলোকপাত করবেন। স্যরি, আবার টপিক থেকে দূরে সরে যাচ্ছি।
একটু আগে যেমন বলছিলাম ইরানি পরিচালকরা খুব ছোটখাট বিষয় নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করেন, তেমনি আসগার ফরহাদি’র সিনেমার মূল উপজীব্য হলো – ‘ডিলেমা’; অবচেতনে করা সামান্য ভুল থেকে এই ডিলেমা’র সূত্রপাত ঘটে এবং এক পর্যায়ে তা একটা বিশাল অনর্থের জন্ম দেয়। এই ভুল এতোই পরিহার্য যে এর জন্য নির্দিষ্ট কাউকে দায়ীও করা যায় না, আবার মেনেও নেয়া যায় না। তখন একটা অদ্ভূত, বিব্রতকর সিচুইয়েশন তৈরী হয়, মনে হয় যেন এর থেকে মুক্তি পেলেই বাঁচি।
ফরহাদি’র সিনেমায় দুই বা ততোধিক দম্পতি থাকে যাদের মধ্যে খিটমিট লেগেই থাকে। এই খিটমিট প্রয়োজনে ডিভোর্স পর্যন্ত গড়ায় (A Separation)। অধিকাংশ চরিত্রকে দেখা যায় সবসময় শশব্যস্ত। কেউ একটু বিশ্রাম করছে কিংবা আয়েশী ভঙ্গিমায় ডায়ালগ দিচ্ছে – এরকম দৃশ্য ফরহাদি’র সিনেমাতে দেখা যাবে না। ক্যামেরার মুভমেন্টেও বিষয়টা বোঝা যায় – সবাই খুব অস্থির, যেন একটা বিশাল ঝামেলার মধ্যে আছে। অবশ্য ঝামেলা না থাকলেও, খুব যে ডিফারেন্ট তা নয়। যেমন – About Elly তে শুরুতে সবাই যখন সমুদ্রের পাড়ে বেড়াতে যায় তখন কোন ঝামেলা ছিল না। কিন্তু তাও দেখা যাবে, কোন স্টিল শট নাই আর যথারীতি সবাই খুব মুভিং। ব্যক্তিগতভাবে আমি স্টিল, সুন্দর, লং শটের ভক্ত। তাই, এই অস্থিরতা আমার ভালো লাগে না। তবে, এর ভালো দিকটা হলো ওই ক্যজুয়াল মুভমেন্টের কারনে খুব অনায়াসে দৃশ্যগুলোর সাথে রিলেটেড হওয়া যায়। মনে হয় যেন আমার চোখ-ই ক্যামেরা।
ফরহাদির পুরুষ চরিত্রগুলো বেশ অস্থির, রাগী আর আনপ্রেডিকেটবল। তারা চান্স পেলেই বউ পিটায় (About Elly, Fireworks Wednesday) আবার পরক্ষণেই ভুল বুঝতে পেরে ক্ষমা-টমা চায়। আমি ফরহাদি’র বায়োগ্রাফি পড়ি নাই। খুব একটা অবাক হবো না যদি দেখি ছোটবেলাতেই তার বাবা-মা সেপারেটেড হয়েছিলেন। ফরহাদি’র মেয়ে চরিত্রগুলো মাঝেমধ্যে মিথ্যে বলে কিংবা আরো স্পষ্ট করে বললে সত্যটা আড়াল করে। যখন মিথ্যেটা বলে তখন মনে হয় যেন – ভালো’র জন্যই বলেছে। মাঝে মাঝে আরেকজনের ভালো’র জন্যে মিথ্যে তো বলতেই হয়। কিন্তু, একটু পরে দেখা যায় ঐ সত্যটা আড়াল করার জন্য আরো মিথ্যে বলতে হচ্ছে এবং এভাবে, একটা পর্যায়ে ঘটনা তার নিয়ন্ত্রনের বাইরে চলে যায়। তখন মনে হবে যেন – হারামজাদি, প্রথমেই সত্যি কথাটা বলে দিলে কি হতো? আবার, তার উপর পুরো দোষও চাপানো যায় না। তখন একটা সাইকোলজিক্যাল ডিলেমার মধ্যে পড়ে দর্শক হাঁস-ফাঁস করতে থাকে। “ভালো”-”মন্দ” -এর নিপাতনে সিদ্ধ সংজ্ঞা নিয়ে একবারের জন্য হলেও তার মনে ?-চিহ্ন উঁকি দেয়।
ফরহাদি’র আরো পেইন আছে। কোন ছবিই সে ঠিকমত শেষ করে না। মানলাম, এটা কুল! কিন্তু বেশি কুল করতে গিয়ে, শেষে আর কোন ক্লু-ই সে দেয় না। যার কারনে সিনেমা শেষে নিজেকে কেমন বোকা বোকা লাগে। মনে হতে পারে, কিছু একটা বোধহয় মিস করেছি কিংবা বুঝতে পারি নাই। একমাত্র Fireworks Wednesday ছাড়া বাকি দুটোর ক্ষেত্রেই আমার এরকম হয়েছে। Fireworks Wednesday দু’জন প্রতিবেশীর মধ্যে পরকীয়া প্রেমের গল্প। অথচ পুরো সিনেমাতে কোন গোপন অভিসারের দৃশ্য নেই, নেই কোন অগোছালো, তাড়াহুড়ো চুম্বন। ভাবা যায়!
তিনটা সিনেমার মধ্যে আমার সবচে’ প্রিয় About Elly. কয়েক’টি কারনে – ১) ফরহাদি’র টিপিক্যাল তিল’কে তাল করার স্টাইল ২) একদল ভয়ংকর রূপসী রমনী ৩) টেনশন-টেনশন ৪) কনফিউশান ইত্যাদি।
তারপর Fireworks Wednesday এবং তারপর A Separation. ভালো লাগার কারনগুলো বাকি দুটো’র ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। পরিমানে একটু কম-বেশী হতে পারে এই আর কি।
তারপর Fireworks Wednesday এবং তারপর A Separation. ভালো লাগার কারনগুলো বাকি দুটো’র ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। পরিমানে একটু কম-বেশী হতে পারে এই আর কি।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন